থার্টি ফার্স্ট নাইট উৎযাপনে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর বিকৃতি

রাজু আহমেদ- আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই ইংরেজী ক্যালেন্ডার থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছে ২০১৭ সাল। নতুন চিন্তা, গতি, আশা-ভরসা নিয়ে নতুন উদ্যমে নতুন সালকে বরণ করে নিতেও রাজধানীসহ দেশব্যাপী বর্ণাঢ্য নানা আয়োজনও করা হয়েছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব আয়োজনে অপ্রীতিকর কোন ঘটনা রোধে নানা নির্দেশনাসহ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মহলের দাবি, একটি জাতি ধ্বংস করতে আর কোন মরণাস্ত্র লাগে না; তার সংস্কৃতি ধ্বংস করলে সে এমনিতেই বিজিত হয়ে যায়। বাংলাদেশ আজ ভিনদেশী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার। এই সেদিনও নববর্ষ ছিল একান্ত মেলা উৎসব। বাংলা নববর্ষে আমাদের চিরায়ত ঐতিহ্যকে কালিমা লেপন করে মঙ্গল শোভাযাত্রার মত কলকাতার হিন্দু কালচার। মুসলিম সামাজিক ঐতিহ্যে যা কোন যুগেই ছিল না তা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে জোর করে।

ঢাবির চারুকলা ১৯৮৯ সাল থেকে যে তথাকথিত মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা করে তার সাথে বাঙালী জাতির নববর্ষ উৎসবের ইতিহাস মেলে না। সম্রাট আকবর যে বাংলা সনের শুরু করেন সে বাংলা সনের প্রথম দিনের প্রথা ছিল মহাজন ও দোকানীদের হালখাতা শুরু করা। ছিল নবান্ন উৎসবের ঘনঘটা। ফতেহউল্লাহ সিরাজীদের ইতিহাস তাই বলে। আর থাটি ফাস্ট নাইট ঘটা করে শুরু হল গত বছর ১৫ ধরে; নগরায়ন যখন তুঙ্গে। আকাশ সংস্কৃতি দেখে দেখে শহুরে লোকজন জড়াতে চাইল পশ্চিমা লেবাস। শুরু হল পশ্চিমা কায়দায় বারে যাওয়া, নর্তকী দিয়ে কনসার্ট, মেলার আসর বসানো, ছেলেমেয়ের অবাধ মেলামেশার সুযোগে কর্পারেট কোম্পানী গুলো তাতে ইন্দন যোগায়। প্রশ্ন হল-শহুরে অভিজাত পাড়ার এ হেয়ালী উৎযাপন কি করে পুরো বাংলাদেশের থার্টি ফাস্ট বা নববর্ষ উৎসব বলে বিবেচিত হবে?

এবার দেখা যাক পশ্চিমা পণ্য থার্টি ফাস্ট নাইটে আসল চেহারা। যে দার্শনিকের চিন্তাধারা থার্টি ফাস্ট নাইটের উৎসবে প্রভাব ফেলেছে তার নাম ফ্রয়েডে। তিনি মানুষের চিন্তা-ভাবনা,ইচ্ছা কামনা, অনিচ্ছাসৃষ্টি সবকিছুকে যৌনধারনা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। সবকিছুর মূলে যৌনতাকে দেখিয়েছেন। ফ্রয়েডের এ ধারনা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ বলেই জানি, তবে আজকাল আমাদের সবকিছুই যে মানুষের এ যৌনচিন্তাকে কেন্দ্র করে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আপনি যদি আজকালকার যুব সমাজের আড্ডা, কৌতুক এগুলোর দিকে লক্ষ্য করেন সবকিছুর মূলই যেন সেক্স।

আর কিছু মিডিয়া যে মানুষের এ যৌনসত্ত্বাকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ফায়দা লুটতে চায় সেটা বুঝার জন্য আপনাকে মিডিয়া বিশেষজ্ঞ হতে হবেনা। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় আজকাল সব অনুষ্ঠানই যেন এ সেক্সকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠা। তাছাড়া বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের ঝুঁকিপূর্ণ ও বেসামাল ব্যবহার ছাড়া আজকাল এই দিনটি উৎযাপন স্বয়ংসম্পুর্ণ হয়না বলেও মনে করেন এদেশের বিশেষ আয়োজক মহল। অতিতে এই দিবসটির আয়োজনে অংশ নিয়ে অনেক রমনীকেই হারাতে হয়েছে সঙ্গম।

এদেশে বিজাতীয় সংস্কৃতি যত অশ্লীল চর্চার আবির্ভাব ঘটেছে তার অন্যতম হচ্ছে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’। যার মাধ্যমে যুব সমাজকে বিপথগামী করার জন্য আয়োজন করা হচ্ছে বিভিন্ন চাকচিক্যময় ও নোংরা অনুষ্ঠান। এ রাতেই রাজধানীসহ বড় বড় মহানগরী ও পর্যটন নগরীগুলোতে চলে থার্টি ফার্স্ট নাইটের নামে নানাবিধ আনন্দ ফূর্তি ও রাতভর হৈ-হুল্লোর আর মাইকবাজির অত্যাচার। অসংখ্য নর-নারী সারারাত বিভিন্ন রাস্তায় ও বাসার ছাদে উঠে যা করেন, তা ভদ্রলোকের ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। এ রাত এখন আনন্দ-ফুর্তির রাতে পরিণত হয়েছে।

রাজধানীর সব জায়গায়, অলিগলি রাজপথে রাত ১২টা থেকে অধিক রাত পর্যন্ত কান ফাটানো বোমাবাজির আওয়াজে প্রকম্পিত করে তোলে। এ অবস্থায় কী কোন শিশু বা অসুস্থ মানুষের পক্ষে ঘুমানো সম্ভব? বাপের পাঠানো টাকায় যারা নিশ্চিন্তে কলেজ-ভার্সিটিতে লেখা-পড়া করে, তাদেরই অনেকে এ রাতে নেচে-গেয়ে ফূর্তি করে এমন পর্যায়ে চলে যায়, যা মনুষ্যত্বের সীমানা পেরিয়ে জন্তু-জানোয়ারকেও হার মানায়।

লেখক- রাজু আহমেদ, সংবাদকর্মী।

(মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত মতামত একান্তই লেখকের, তার জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়)

সময়ের কণ্ঠস্বর/রবি