কাপাসিয়ায় সরকারি গাছ লুটের মহোৎসব চলছে!

পলাশ মল্লিক,স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পল্লী বিদ্যুতের তার ও খুঁটির আশেপাশের সরকারি গাছ কেটে মহোৎসব চলছে। পল্লী বিদ্যুতের ‘রাইট অব ওয়ে ক্লিয়ারিং’ কাজের আওতায় গাছের ডালপালা কেটে ফেলার পর সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন জাতের কয়েক হাজার ফলজ ও কাঠ গাছ কেটে নিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ও সড়ক বিভাগের নিয়ন্ত্রনাধীন এসব গাছ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কেটে বিক্রি করে নিজেদের মধ্যে টাকা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন তারা।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ-২ এর কাপাসিয়া কার্যালয়ের এজিএম (অপারেশন এন্ড মেইনটেনেন্স) প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল হাদী জানান, ঝড়ের সময় বাতাসে গাছের ডালপালা ভেঙে যাতে বিদ্যুতের তারের কোন ক্ষতি না হয়, সেজন্য প্রতি বছরের মতো এবছরও বৈদ্যুতিক তার হতে নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখে গাছ ও গাছের ডালপালা কাটা হচ্ছে। গ্রাহকদের নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যেই এ কার্যক্রম চলছে।

তবে এ কার্যক্রম শুরুর আগে এলাকায় মাইকিং করে গাছ কাটার বিষয়টি জানানো হয়। এছাড়াও স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের চিঠি দিয়েও বিষয়টি অবহিত করা হয়।

তিনি জানান, বিভিন্ন এলাকার ১২ কিলোমিটারের বেশী বিদ্যুৎ লাইনের আশপাশে কাঁঠাল, তাল, আম, জাম, লিচু, গজারী, মেহগনি, আকাশী, শিশুসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৩৬ হাজার বড় গাছ রয়েছে। এর মধ্যে বেশীরভাগই কাঁঠাল গাছ। নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ লাইনের তার থেকে ডানে ১০ ফিট এবং বামে ১০ ফিট দূরত্ব রেখে গাছ কাটতে হবে। পরে ৪৫ ডিগ্রি কৌণিকভাবে গাছের ডালপালা কেটে ছেঁটে দিতে হবে।

এ লক্ষ্যে পল্লী বিদ্যুতের পক্ষ থেকে দৈনিক মজুরীর ভিত্তিতে শ্রমিকদের দিয়ে শুধুমাত্র মেইন লাইন সংলগ্ন গাছগুলোর ডালপালা কেটে ছেঁটে পরিষ্কার করানো হচ্ছে। কোন গাছের গুড়ি (কান্ড) কাটা হচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, পল্লী বিদ্যুতের শ্রমিকরা গাছের ডালপালা কেটে ফেলার পর কিছু লোকজন নির্ধারিত দূরত্বের চেয়ে বেশী দূরের, এমনকি সড়কের পাশ থেকেও সরকারি গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এসব গাছ কাটার সঙ্গে পল্লী বিদ্যুতের লোকজন জড়িত নয় বলে দাবি এই কর্মকর্তার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাপাসিয়া উপজেলার আমরাইদ, বড়হর, হাইলজোরসহ কয়েকটি এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে পল্লী বিদ্যুতের লোকজন শুধুমাত্র গাছের ডালপালা কেটে বিদ্যুতের লাইন পরিষ্কার করছে। তবে তারা গাছের কান্ড কাটছে না।

ডালপালা কাটার এ সুযোগে কোন ধরনের অনুমতি না নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা ও সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের নাম ভাঙিয়ে একাধিক মহল এসব গাছের অবশিষ্টাংশ (কান্ড) কেটে নিয়ে যাচ্ছে। প্রভাবশালীরা বিদ্যুতের মেইন লাইনের নির্ধারিত দূরত্বের চেয়ে বেশী দূরের সরকারি গাছ গোড়া থেকে কেটে নিয়ে যাচ্ছে।

এমনকি সড়কের একপাশে বিদ্যুতের লাইন থাকলেও অন্য পাশ থেকেও তারা অবৈধভাবে গাছ কেটে নিচ্ছে। তাদের হুমকির প্রেক্ষিতে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। এসব গাছ স্থানীয় বিভিন্ন সমিল (করাত কল) বা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। এ যেন চলছে সরকারী গাছ লুটপাটের মহোৎসব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, কাপাসিয়ার বড়হড় নতুন বাজার থেকে আড়ালজুড়ি ব্রিজ পর্যন্ত ১ কিলোমিটার জায়গার গাছ কেটে নিয়েছে স্থানীয় সরকার দলীয় নেতা বাবুল মুন্সি। অবৈধভাবে সরকারি গাছ কাটতে বাঁধা দেওয়ায় পল্লী বিদ্যুতের লোকজনসহ স্থানীয় কয়েক ব্যক্তিকে তিনি হুমকি দেন।

এছাড়া বানরখোলা, দেওড়া, গিয়াসপুর মোড় থেকে দুলালপুর বাজার পর্যন্ত এলাকার গাছ কেটে নিয়েছে স্থানীয় বারিষাব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবলু ও ইউপি সদস্য সেলিম মেম্বার।

অন্যদিকে আমরাইদ বাজারের পশ্চিম অংশের বড় বড় শিশু গাছ ও আমরাইদ বাজার থেকে নরসিংহপুর ব্রিজ পর্যন্ত ৬টি মেহগনি গাছ কেটে নিয়েছে স্থানীয় রায়েদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও আমরাইদ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোস্তফা কামাল বাদল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি স্থানীয় এমপির লোক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে নানাভাবে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন। তার লোকজন দিয়ে এসব গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।

এমনিভাবে স্থানীয় প্রভাবশালীরা কয়েক লাখ টাকা মূল্যের সরকারি সহস্রাধিক গাছ অবৈধভাবে কেটে নিয়ে গেছেন। ফলে অন্য বছরের তুলনায় এবছর ওই এলাকার মৌসুমী ফল কাঁঠাল ও লিচুর উৎপাদন কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ দেশের মোট উৎপাদিত মৌসুমী ফল কাঁঠাল ও লিচুর একটি বড় অংশ এখান থেকে সরবরাহ হয়ে থাকে।

সরকারি এসব গাছ লুটপাটের বিষয়ে পল্লী বিদ্যুতের আমরাইদ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামালউদ্দিন জানান, বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করার কথা রয়েছে।

গাছ লুটের বিষয়ে রায়েদ ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের সদস্য মোশারফ হোসেন সরকার টিটু বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসের কথা বলে গাছ কেটে নিয়েছে মোস্তফা কামাল বাদল। তবে তিনি দলীয় কার্যালয়ে তা দিয়েছেন কি না- আমি বলতে পারবো না।

এ ব্যাপারে মোস্তফা কামাল বাদল বলেন, আমি কোন গাছ নেইনি। তবে পল্লী বিদ্যুতের লোকজন আমার কাছে সহযোগিতা চেয়েছিল। এ কারণে আমি কয়েকটি স্পটে গিয়েছি। স্থানীয় লোকজন আমার নামে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে। তবে এবার নয়, বেশ কিছুদিন আগে আমি একটি সরকারী গাছ কেটে দলীয় কার্যালয়ের জন্য ৫টি চেয়ার তৈরী করেছি। অন্যদিকে বারিষাব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবলুর সঙ্গে মুঠোফোনে অনেকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি।

গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী কেবিএম সাদ্দাম হোসেন বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। সরকারি সম্পদ এভাবে কেউ লুট করতে পারে না। আমি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

এ বিষয়ে কাপাসিয়া উপজেলা প্রকৌশলী আহম্মেদ আবদুল্লাহ জানান, গাছ চুরির বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরী করেছি। আরও তদন্ত করে এর সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।