গাইবান্ধায় তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত: শীতবস্ত্র পায়নি ছিন্নমুল মানুষেরা

মোঃ ফরহাদ আকন্দ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি- টানা কয়েক দিনের শৈত্যপ্রবাহে চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে গাইবান্ধার খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষদের মধ্যে। গত কয়েক দিন থেকে অব্যাহত রয়েছে শৈত্যপ্রবাহ। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা এই শীতে দুর্বিষহ দিনাপাতিত করছে। শুধু মানুষই নয় গৃহপালিত পশু-পাখিসহ প্রাণীকুলও পড়েছে বিপর্যস্ত অবস্থায়।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দেখা পাওয়া যায় না সূর্যের। কোন কোন দিন আবার দেখায় মেলে না। ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতে প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে কেউ বাইরে বের হচ্ছেন না। প্রচন্ড শীতের কারণে খড়কুটা জ্বালিয়ে শীত নিবারন করেছেন অসহায় শীতার্থরা।

অপরদিকে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়ে গেছে শীতবস্ত্রের দাম। রাস্তার ফুটপাতের দোকানগুলোত ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা যায়।তীব্র শীতের কারণে মৌসুমী রোগের পাশাপাশি নানা ধরণের রোগব্যাধিও বেড়ে গেছে অনেক।

গাইবান্ধার সাত উপজেলার হাসপাতালগুলো ঘুরে দেখা গেছে শীতের তীব্রতার কারণে শীতজনিত নানা রোগ বিশেষ করে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। এসব রোগে আক্রান্তদের মধ্যে শিশু-বৃদ্ধের সংখ্যাই বেশি। আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে প্রতিদিন ভিড় করছেন সদর হাসপাতালসহ ছয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে। এছাড়া অনেকে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। এপর্যন্ত শীত জনিত কারণে গাইবার সাত উপজেলা মিলে পাঁচজন মারা গেছেন বলে স্বজনদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আ. কা. মো. রুহুল আমীন বলেন, শুধু মানুষ আর পশু পাখি নয় শীতের প্রভাব পড়েছে মৌসুমি ফসলের উপরেও টানা শৈত্যপ্রবাহের কারণে আলু, সরিষা ও বীজতলাসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এভাবে শৈত্যপ্রবাহ আর কয়েকদিন চললে এসব ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হবে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কৃষক বাড়ী মিয়া বলেন, কয়েদিন আগেই শীতের কোন আমেজ ছিলনা কিন্তু হঠাৎ করে গত সপ্তাহ থেকে প্রচন্ড শীতের তীব্রতা দেখা দিয়েছ। এতে করে আমার মত চাষী মানুষেরা মৌসুমী ফসল নিয়ে খুবই বিপাকে পড়েছে। দুই তিন দিন থেকে বেলা উঠে না আর ঘন কুয়াশার কারণে আমার বীজতলার অবস্থা খুবই খারাপ। চারাগুলো কেমন জানি মরা মরার মত হয়ে গেছে। পরে উপজেলা কৃষি অফিসে গিয়ে পরামর্শ নিয়ে স্প্রে করেও কোন লাভ হয়নি।

গাইববান্ধার সদর উপজেলার ডিসি অফিস এলাকার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র মো. সাকিব মিয়া বলেন, সকালে ঠান্ডা বাতাশ আর কুশায়ার কারণে স্কুলে যেতে ইচ্ছে করেনা। কারণ জানতে চাইলে বলে বাসা থেকে বেড় হলে রাস্তায় গিয়ে খুব ঠান্ডা লাগে। রাস্তায় খুব বাতাশ আর কুশায়াশা বাসায় থাকলে ঠান্ডা কিছুটা কম লাগে।

সাদুল্যাপুর উপজেলার রিকশা চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, পৌষ মাসের মাঝ সময়ে এসে হঠাৎ করে খুব শীত নামার কারণে রিকশা চালকদের খুব সমস্যা হয়েছে। সকালে ঠান্ডা বাতাশের কারণে হাত দিয়ে রিকশার হাতা ধরে থাকা যায় না। আর পশ্চিমা বাতাশ বয় তার কারণে গায়ে কাপড় দিয়েও রিকশা চালানো যায় না। ঠান্ডা আর বাতাশ বেশি হওয়ায় আবার অনেকই রিকশায় না উঠে হেটে যায় গন্তব্যে। তাছারা প্রচন্ড শীতের কারণে ইদানিং রাস্তায় লোকজনও কম তাই আমাদের রোজগারও কম। সন্ধ্যার পড়ে আর রিকশা চালানো যায় না। কয়েকদিনের শীতের কারণে রোজগার কম হওয়ায় পরিবারকে নিয়ে খুব সমস্যার মধ্যে আছি।

পলাশবাড়ী উপজেলার রেজিয়া খাতুন (৫০) নামের এক বৃদ্ধা বলেন, এই শীতে গায়ে দেওয়ার মত কিছুই নাই। এখন খোজ খবর নেওয়ার কোন লোক নাই। আর যখন ভোট আসে তখন একদিনের মধ্যে চৌদ্দবার করে আসে কিছু নিবার না চালে তাও জোড় করি দিয়া যায়। এখন যে হামাক শীত নাগে এখন হামাক কেউ কিচু দেয় না। গত বছরে একান পুরেনা কম্বল গাওত দিয়া থাকা নাগে। এবছর এলাও কারো কাছ থাকি কম্বল পাইনাই।

ফুলছড়ি উপজেলার মকবুল হোসেন বলেন, চরাঞ্চলে শীত একটু বেশি লাগে। নদীর কারণে ঠান্ডা বাতাশ বয় আর ঘন কুয়াশার কারলে মাঠে কাজ করা যায় না। এই শীতের মধ্যে খুব সমস্যার মধ্যে আছি। কাজ কর্ম করতে পারিনা ছেলে-মেয়েদের শীতের কাপড় কিনে দেই কিভাবে। আর কুশায়ার কারণে কিছু চোখে দেখা যায় না তাই নদীর মধ্যে নৌকা নিয়া চলাচলের খুব অসুবিধা হয়েছে।

এছাড়াও গাইবান্ধার সাত উপজেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে গ্রামের মানুষেরা শীত নিবারনের জন্য বাড়ীর পুরাতন আসবাবপত্র, খড়-কুটা বা পুরাতন কাপড়ে আগুন জ্বালিয়ে অনেকটা শীত নিবারন করছেন তারা। বাতা আর ঘন কুয়াশার কারণে অনেকই ঘর থেকে বেড় হতে পারে ফলে কোন কাজ কর্ম করতে পারে না সে কারণে পরিবার নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। অনেকেরই আবার শীতের কাপড় কেনার স্বার্থ নেই তাই আগের যা আছে তা দিয়েই শীত দমন করছেন।

অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে অসহায় গরীব শীতার্থদের জন্য কম্বল বিতরণ করার কথা থাকলেও তারা কম্বল পায় না। কম্বল পায় চেয়ারম্যান মেম্বরের লোকজন আর মধ্যবৃত্তরা। তাই তাদের দাবি এসব পর্যবেক্ষণ করে সৎ লোকের মাধ্যমে সঠিক ভাবে অসহায় গরীবদের মাঝে বিতরণ করার দাবি জানিয়েছেন।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল বলেন, সরকারি ভাবে এই তীব্র শীতে এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে গরম কাপড় ও সাহায্য সহযোগিতা করা সম্ভব নয়। তাই তিনি এনজিও সংস্থা, ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে গাইবান্ধার জেলার সাত উপজেলার ৮২ ইউনিয়নের শীতার্র্থ মানুষের মধ্যে প্রায় ৬০,০০০ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আরও বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে গরিব-অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষসহ নিম্ন আয়ের মানুষদের মধ্যে এসব কম্বল বিতরণ করা হবে।

সময়ের কণ্ঠস্বর/রবি