লক্ষ্মীপুরে উল্লাস লটারী, শুষে খাচ্ছে হত-দরিদ্র মানুষকে!

মো:ইমাম উদ্দিন সুমন,স্টাফ রিপোর্টার: লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের চর লরেন্স সংলগ্ন কমলনগর কলেজ প্রাঙ্গনে চলছে মাসব্যাপী আনন্দ মেলা। এর মাধ্যমেই “উল্লাস” একটি কোম্পানি র্যাফেল ড্র দিয়ে লটারীর টিকেট বিক্রি করে দৈনিক হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

যেখানে মেঘনার ভাঙনের শিকার হত-দরিদ্র মানুষকে মোটর সাইকেল, গরু, সিএনজি চালিত অটোরিকসা, হ্যান্ডসেটের মতো এসব আকর্ষণীয় কিছু পুরস্কারের লোভ দেখানো হচ্ছে। যাতে নিরক্ষর জনগোষ্ঠী সহজেই সচেতনতার অভাবে কর্তৃপক্ষের প্রলোভনে লটারীর টিকেট কিনে প্রতারিত হয়।

জানা যায়, এটির আয়োজন করছে কমলনগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ! ৮৪টি সিএনজি বা অটোরিকসা দিয়ে মাইকিং করে জোর প্রচারণার মাধ্যমে চলছে এ আয়োজন। বুধবার (১০জানুয়ারি) সকালে তোরাবগঞ্জ মহাসড়কের ওপর দেখা যায়, দু’টি প্রচারণা মাইক দিয়ে লটারীর টিকেট বিক্রি করা হচ্ছে।

যেখানে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি টিকেট কিনতে ভিড় জমিয়েছে স্কুলের কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরাও। দুপুরে মিয়াবেড়ী বাজারে মাইকিং টিকেট বিক্রিকালে কথা হয়, ক্রেতা মোঃ হোসেনের সাথে(২০)। টিকেট কিনে ফেরার পথে কেন কিনলো তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলছিলেন, “বাজারের সেলুন দোআনদার লটারীর কিনার হর এক্কান ফোন হাইছে। ইয়ারলাই আঁইও ৫টা লটারী কিনছি। দেহি কলে কী আসে। এক্কান টিকেটের দাম বিশ টিয়া।”

স্থানীয় তোরাবগঞ্জের আবদুল ওহাব সেলিম (৪৫) বলেন, “আমার সম্পর্কিত নুরুল ইসলাম ২০টি, বেল্লাল দশটি আর খোকন পাঁচটি লটারী কিনেছে। এর মধ্যে বেল্লাল দেখলাম, তার লটারীর টিকেটগুলোকে ছয় বার পায়ের নিচে ছাপা দিয়েছে। সে এও বলেছে যে, এভাবে চড়লে ভাগ্যে ধরে। আমি বললাম, ভাগ্যতো সৃষ্টিকর্তাই নির্ধারণ করার মালিক। এগুলো ঠিক না।” এ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সোচ্চার রয়েছেন তরুণ সমাজকর্মী মো. ফারুক।

তিনি বলেন, “মানুষকে কীভাবে ফাঁদে ফেলা যায়, এরা ঠিকই বোঝে। যার কারণে, এরা একেক বার একেক কৌশল অবলম্বন করে। দেখেন ভাই (এ প্রতিবেদক), এ এলাকার মানুষ নদী ভাঙনের শিকার হয়ে এখনো অসহায়, মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

এ অঞ্চলের রাস্তা-ঘাটগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। ঠিক মতো দু’বেলা খাবার জোটেনা অনেকের ভাগ্যে। অথচ এ এলাকা থেকে এভাবে লটারীর বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে শোষণ করা কী ঠিক হচ্ছে?” লটারী বিক্রেতা নয়ন হোসেন (২৬) নামের এক জনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, “আমাদের মোট প্রচারণা গাড়ি ৮৪টি। প্রতিদিন আমরা আট-দশ হাজার টাকার লটারীর টিকেট বিক্রি করতে পারি। মোটামুটি জাকজমকভাবেই চলছে মেলা।

স্থানীয় একটি ডিশ লাইনও আমাদের মেলা প্রচার করে।” আনোয়ার হোসেন মঞ্জু (২৪) নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, “এভাবে সচেতন মানুষদের চোখের সামনেই মেহেরপুর থেকে উল্লাস কোম্পানি এসে গরীব মানুষদের শুষে নিচ্ছে। অথচ আমরা চুপ করে আছি! আমি একটি প্রচারণা গাড়িতে থাকা লোকদের কাছে জানতে চাইলে তারা আমাকে জানান, গাড়ি ভাড়া ১১’শ টাকা আর অপারেটরের ৬’শ টাকাসহ অন্যান্য আনুসাঙ্গিক মিলিয়ে ২হাজার টাকা খরচ হয় একটি গাড়িতে।

যেখানে লটারীর টিকেট বিক্রি হয় আট থেকে দশ হাজার টাকার। নিম্মে যদি আট হাজার টাকারও বিক্রি করা হয়, তবে প্রতিদিন ৮৪টি প্রচারণার টিকেট বিক্রির গাড়ি থেকে ৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা।

এভাবে এক মাস চলতে থাকলে কত কোটি টাকা চলে যায় বোঝেন এবার!” স্থানীয় উপকূল ডিগ্রী কলেজের শিক্ষার্থী আবু তাহের বলেন, “সময় যত বাড়ে ততই আকর্ষণীয় পুরস্কারের লোভ দেখানো হয়। প্রচার মাইকের সংখ্যাও বাড়ে। ১৩জানুয়ারি(শনিবার) তাদের প্রচার মাইকের সংখ্যা হবে ১’শটি। পুরস্কার পাওয়ার আশায় আমার কলেজের অনেক শিক্ষার্থীও এজুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে।”

এ প্রসঙ্গে উল্লাস কোম্পানির দায়িত্বে থাকা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং উপজেলা প্রশাসনের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কল সংযোগ মিলেনি। তবে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক অঞ্জন কুমার পাল এ প্রতিবেদককে জানান, “মেলার নামে হত-দরিদ্র মানুষকে শোষণের অভিযোগ এসেছে।

এজন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি তা যেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু তা এখনো বন্ধ না হওয়াতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে আইনগত ব্যবস্থা নেবো।”