মেঘনার ভাঙনের শব্দে ঘুম ভাঙে বাসিন্দাদের

এস আই মুকুল, ভোলা প্রতিনিধিঃ বাড়িগুলো বিরাণ পড়ে আছে। সাজানো ভিটে থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে ঘর। ঘরের চুলোয় এখনও রান্নার দাগ স্পষ্ট। হয়তো একদিন আগেই পরিবারের সকলে শেষবারের মতো খেয়েছেন এই ঘরে বসে।

অল্প সময়ের ব্যবধানে সে ঘটনা এখন ‘অতীত’ হতে চলেছে। শান বাঁধানো পুকুর ঘাট, স্বজনের কবরস্থান, ঘরের প্রিয় আঙিনার সব স্মৃতি ফেলে মানুষগুলো ছুটছে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে। দ্বীপ জেলা ভোলার সর্বদক্ষিণে অন্যতম প্রাচীন দ্বীপ ঢালচরের অবস্থা এখন এমন।

ঘাটে ভেরার আগেই তীর ধরে যেতে যেতে ঢালচরের সব ধ্বংসের চিত্র চোখে ভাসে। নদীর স্রোতের তোড়ে গাছগুলো পড়ে আছে নদীতে। নদী তীরের বাড়িগুলো থেকে গাছপালা কেটে নেওয়া হয়েছে। ফসলি জমি নদীতে ডুবছে। সুপারি বাগান, নারিকেল বাগান, পুকুর, বাড়ি সবকিছু ল-ভ-, এলোমেলো। এক সময়ের বৃহৎ আয়তনের ঢালচর এখন একবেলায় ঘুরে আসা যায়। ট্রলার ঘাটে নেমে, মানুষের সাথে কথা বলতে বলতে সেই গল্পগুলোই জানা গেলো।

সরেজমিনে ঘুরে দেখ গেল, ঢালচরের ঐতিহাসিক মুজিবকিল্লায় এখন ২৫টি নিঃস্ব পরিবারের বাস। এককালে দ্বীপের মানুষের দুর্যোগে আশ্রয় নিতেন এই কিল্লায়। কিন্তু এখন তারা স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এখানে। মেঘনার ভাঙনের তীব্রতা ক্রমেই বেড়ে যাওয়ায় মুজিবকিল্লাও বর্তমানে হুমকির মুখে। ফলে এখানে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোকে আবার স্থান বদল করতে হবে, এমন আশঙ্কা বাসিন্দাদের। মুজিবকিল্লা, এর পাশে বিশাল দিঘি এবং দিঘিসংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সবই হুমকিতে। মেঘনার এই ভাঙনের শব্দে ঘুম ভাঙে এখানকার বাসিন্দাদের।

একজন নীরব মাঝি (৩৭)। মুজিবকিল্লার বাসিন্দা। পেশা মাছ ধরা। বাড়ি ছিল চার নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিনগরে। নদী ভাঙনে সব হারিয়ে প্রথমে ঘর বাঁধেন আট নম্বর ওয়ার্ডের শরীফ পাড়ায়। এরপর এসেছেন আদর্শপাড়ার এই মুজিবকিল্লায়।

নীরব মাঝিকে ৫ জনের সংসার চালাতে নদীতে মাছ ধরতে নামতে হয়েছে অনেক আগেই। অথচ এক সময় নিজের জমিতেই আবাদ করে সংসার চালাতেন। জমি কেনার সামর্থ্য নেই বলে বারবার স্থান বদল করে দ্বীপেই পড়ে আছেন।

আরেকজন মো. ইব্রাহিম। বয়স ৩০ ছুঁয়েছে। ৬ জনের সংসার চালাতে হয় অন্যের নৌকায় মাছ ধরে। তিন নম্বর ওয়ার্ডের টুমচরে বাড়ি ছিল এক সময়। এক সময় নিজের জমি আবাদ করেই সংসার চলতো। নদী ভাঙনে সব হারিয়ে এখন পথে বসেছেন। স্থান হয়েছে মুজিবকিল্লায়। আবি আবদুল্লাহ (৩৫), বাসু ফরাজী (৬৫), জেবল হক (৭৫), সোলায়মান মাঝি (৪৭)সহ এমন আরও অনেকের নিঃস্ব হওয়ার গল্প উঠে আসে মুজিবকিল্লার বাসিন্দাদের সাথে আলাপে।

নদী ভাঙনের কারণে দ্বীপের পাড়া-ওয়ার্ড টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। গাদাগাদি করে একই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন অনেক পরিবার। স্থান না পেয়ে অনেকের বসতি হয়েছে রাস্তার ধারে, বাজারের আশপাশে। গ্রামগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে। দ্বীপের পুরান বাজার ঘাটে ট্রলার থেকে উঠলেই টাওয়ার বাজার।

এ বাজারটি ছিল অনেক দূরে নদী তাড়া করে বাজারটিকে অনেক দূরে নিয়ে এসেছে। এই বাজারের খানিক দূরে আরেকটি বাজার। আরেকটু দূরে দ্বীপের প্রধান বাজার। এটি ‘চেয়ারম্যান বাজার’ নামে পরিচিত। প্রধান বাজার থেকে আদর্শ পাড়া, হাজীপুর, আনন্দবাজার এসব এলাকা এখন অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে আসা যায়।
দ্বীপের বাসিন্দারা জানালেন, এক সময় ঢালচরের অধিকাংশ মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল চাষাবাদ। কিন্তু নদী ভাঙনের কারণে সে অবস্থা বদলে গেছে। প্রধান পেশা কৃষি থেকে রূপান্তরিত হয়ে এখন মাছ ধরায় গিয়ে ঠেকেছে। কিছু অবস্থাপন্ন মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তারা মাটি আঁকড়ে দ্বীপেই পড়ে আছেন। নিঃস্ব দ্বীপবাসীর অনেকেই নতুন চরে বন্দোবস্তের আশায় বুক বেঁধে আছেন।

ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র বলেছে, এই দ্বীপ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শপাড়া, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিনগর, ১ নম্বর ওয়ার্ডের দালালপুর, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কেরামতগঞ্জ এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মহম্মদপুর ভাঙনের মুখে। এখন এসব এলাকার সামান্য অংশ অবশিষ্ট রয়েছে। ২০১১ সালের হিসাবে এখানে লোক সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৫০০ জন। এখন এই সংখ্যা ১৫ হাজারের কাছাকাছি।

স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে ঢালচরের বহু স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। ১টি সাইক্লোন শেলটার, ৫টি বনবিভাগের ভবন, ২টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন, ৩টি স্থানীয় সরকার বিভাগের ভবন, ৩টি বড় বাজার, ১টি হেলিপ্যাড, ৫টি পাকা মসজিদ, ৪ কিলোমিটার পাকা রাস্তা, ২ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা বিলীন হয়েছে।

দ্বীপ জেলা ভোলার সর্বদক্ষিণে চরফ্যাশন উপজেলার আওতাধীন স্বতন্ত্র ইউনিয়ন ঢালচরে যেতে হয় নৌপথে। কুকরি মুকরি আর চর পাতিলার পাশ দিয়ে মেঘনা পাড়ি দিয়ে ঢালচরে পথ। চারদিকে জলরাশি বেষ্টিত এই জনপদে হাজারো সংকটের ভেতরে বেঁচে আছেন মানুষগুলো।