জেনে নিন, সুখি হওয়ার উপায়

লাইফ স্টাইল ডেক্সঃ সম্পাদনায় মোঃ ইমাম উদ্দিন সুমন,স্টাফ করেসপন্ডেন্টঃ “বিজ্ঞানে এটা প্রমাণ হয়েছে যে সুখি হতে হলে সচেতন প্রচেষ্টার প্রয়োজন,” বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান এবং কগনিটিভ বিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক লরি স্যান্টোস।

তিনি বলেছেন, “এটা খুব একটা সহজ কাজ নয়, এজন্যে সময় লাগবে।” তবে তিনি হয়তো জানেন যে সুখি হতে হলে কি করতে হবে? কারণ তিনি পড়ান ‘মনোবিজ্ঞান ও সুন্দর জীবন’ বিষয়ে।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১৬ বছরের ইতিহাসে তার ক্লাস শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১২,০০। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি রেকর্ড।

ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে এই কোর্সটি পরিচালনা করেন অধ্যাপক স্যান্টোস। এটা মনোবিজ্ঞানেরই একটি শাখা যেখানে সুখ এবং আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়ে পড়ানো হয়।

তিন্তু এসব তত্ত্ব আমরা কিভাবে আমাদের প্রতিদিনের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারবো?

“সুখি হওয়া বিষয়টি এমন নয় যে এটা আপনা আপনি হয়ে যায়। সুখি হওয়ার জন্যে আপনাকে এটা চর্চা করতে হবে,” বলেন অধ্যাপক স্যান্টোস, “এটা অনেকটা ভালো সঙ্গীত শিল্পী বা ক্রীড়াবিদ হয়ে উঠার মতোই, সাফল্যের জন্যে তাদেরকে যেমন চর্চ্চা করতে হয় সুখি হওয়ার ব্যাপারেও আপনাকে সেটা করতে হবে।”

কিভাবে সুখি হতে হবে তার কিছু কলাকৌশল তিনি শিক্ষার্থীদের শেখান সপ্তাহে দুদিন।

আপনি সুখি হতে চান কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আপনি তো আর ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছেন না? এখান তার দেওয়া পাঁচটি টিপস তুলে ধরা হলো। চর্চ্চা করার চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

১. কৃতজ্ঞতার একটি তালিকা তৈরি করুন
অধ্যাপক স্যান্টোস তার শিক্ষার্থীদের বলেন, প্রত্যেক রাতে তারা যাদের কাছে বা যেসব জিনিসের কাছে কৃতজ্ঞ তার একটি তালিকা তৈরি করতে।

“এটা শুনতে খুব সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু আমরা দেখেছি যেসব শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে এটা চর্চা করেন তাদের সুখি মনে হয়,” বলেন অধ্যাপক স্যান্টোস।

২. আরো বেশি করে ও নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চেষ্টা করুন
এই কাজটা করা সবচেয়ে সহজ বলে মনে হয় কিন্তু আসলে এই কাজটা করা খুব কঠিন, বলেন তিনি।এখানে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতি রাতে আট ঘণ্টা করে ঘুমানো। এবং এই কাজটা করতে হবে এক সপ্তাহ ধরে।

অধ্যাপক স্যান্টোস বলেন, “আমরা সবাই জানি যে বেশি ঘুমাতে পারলে এবং নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারলে বিষণ্নতায় ভোগার সম্ভাবনা কম থাকে। এর ফলে ইতিবাচক মনোভাবও তৈরি হয়।”

৩. ধ্যান করুন
আপনার কাজ হবে প্রত্যেকদিন ১০ মিনিট করে মেডিটেট বা ধ্যান করা। অধ্যাপক স্যান্টোস বলেন, তিনি যখন ছাত্রী ছিলেন তখন তিনি নিয়মিত ধ্যান করতেন এবং দেখেছেন সেটা করলে মন ভালো থাকে।

এখন তিনি একজন অধ্যাপক, এখন তিনি তার শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছেন কিভাবে ধ্যান করতে হয়। তিনি বলেন, এধরনের কাজে পূর্ন মনোযোগ দিতে হয় যা মানুষকে সুখি হতে সাহায্য করতে পারে।

৪. পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আরো সময় কাটান
অধ্যাপক স্যান্টোস বলেছেন, গবেষণায় পরিষ্কার একটি বিষয় দেখা গেছে- পরিবার ও বন্ধুদের সাথে ভালো সময় কাটালে আপনি সুখি হবেন। আপনার যদি ভালো বন্ধুত্ব থাকে এবং সামাজিক যোগাযোগ থাকে এবং তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ হয় তখন তারা উল্লেখযোগ্য রকমের ভালো বোধ করেন।

এজন্যে যে খুব বেশি কিছু করতে হবে তা নয়, স্যান্টোস বলেন, “শুধু এটা নিশ্চিত করুন যে আপনি এই সময়ে বেঁচে আছে, মনে করুন যে আপনারা একসাথে বর্তমান সময় কাটাচ্ছেন এবং আপনি কিভাবে আপনার সময় কাটাচ্ছেন সেবিষয়ে একটু সচেতন থাকুন।”

তিনি বলেন, আপনার সুখি হওয়ার জন্যে সময় সম্পর্কে আপনার ধারণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

“আমাদের কতো অর্থ আছে সেটা দিয়ে আমরা প্রায়শই আমাদের সম্পদের হিসাব করি। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পদ হচ্ছে আসলে আমাদের হাতে কতো সময় আছে সেটার সাথে সম্পর্কিত,” বলেন তিনি।

৫. সোশাল মিডিয়ায় যোগাযোগের পরিবর্তে বাস্তবে এই যোগাযোগ বৃদ্ধি করুন
অধ্যাপক স্যান্টোস মনে করেন, সোশাল মিডিয়া থেকে সুখের বিষয়ে মিথ্যা যেসব ধারণা পাওয়া যায় সেসবে ভেসে যাওয়া উচিত নয়।

“সবশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ইন্সটাগ্রামের মতো সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যম ব্যবহার করেন তারা, যারা এটা খুব বেশি ব্যবহার করেন না তাদের চাইতে কম সুখি,” বলেন তিনি।

তো, এখন তো সব জানা হয়ে গেল। আপনি যদি সত্যিই জীবনে সুখি হতে চান, তাহলে কৃতজ্ঞ হতে শুরু করুন, পরিবারের সাথে আরো বেশি সময় কাটান, বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করুন, দিনের একটা সময়ে কিছুক্ষণের জন্যে নিজেকে সবকিছু থেকে সরিয়ে ধ্যানে মগ্ন হউন, সোশাল মিডিয়া থেকে দূরে সরে এসে আরো একট বেশি ঘুমাতে চেষ্টা করুন। ইয়েলের শিক্ষার্থীদের জন্যে যদি এটা কাজ করে, তাহলে এসব পরামর্শ আপনার ক্ষেত্রেও নিশ্চয় কাজ করবে।

সুখি জীবনের জন্য ২৪ টি টিপস

১. প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন৷
২. নির্জন কোন স্থানে একাকী অন্তত ১০
মিনিট কাটান ও নিজেকে নিয়ে ভাবুন৷
৩. ঘুম থেকে উঠেই প্রকৃতির নির্মল
পরিবেশে থাকার চেষ্টা করুন। সারা
দিনের করণীয় গুলো সম্পর্কে মনস্থির
করুন।
৪. নির্ভরযোগ্য প্রাকৃতিক উপাদানে ঘরে
তৈরি খাবার বেশি খাবেন আর
প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাবেন।
৫. সবুজ চা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
৬. প্রতিদিন অন্তত ৩ জনের মুখে হাসি
ফোটানোর চেষ্টা করুন।
৭. গালগপ্প, অতীতের স্মৃতি, বাজে
চিন্তা করে আপনার মূল্যবান সময় এবং
শক্তি অপচয় করবেন না। ভাল কাজে সময়
ও শক্তি ব্যয় করুন।
৮. সকালের নাস্তা রাজার মত, দুপুরের
খাবার প্রজার মত এবং রাতের খাবার
খাবেন ভিক্ষুকের মত।
৯. জীবন সব সময় সমান যায় না, তবুও ভাল
কিছুর অপেক্ষা করতে শিখুন।
১০. অন্যকে ঘৃনা করে সময় নষ্ট করার জন্য
জীবন খুব ছোট, সকলকে ক্ষমা করে দিন সব
কিছুর জন্য।
১১. কঠিন করে কোন বিষয় ভাববেন না।
সকল বিষয়ের সহজ সমাধান চিন্তা করুন।
১২. সব তর্কে জিততে হবে এমন নয়, তবে
মতামত হিসাবে মেনে নিতে পারেন
আবার নাও মেনে নিতে পারেন।
১৩. আপনার অতীতকে শান্তভাবে চিন্তা
করুন, ভূলগুলো শুধরে নিন। অতীতের জন্য
বর্তমানকে নষ্ট করবেন না।
১৪. অন্যের জীবনের সাথে নিজের জীবন
তুলনা করবেন না।
১৫. কেউ আপনার সুখের দায়িত্ব নিয়ে
বসে নেই। আপনার কাজই আপনাকে সুখ
এনে দেবে।
১৬. প্রতি ৫ বছরমেয়াদী পরিকল্পনা করুন
এবং ওই সময়ের মধ্যেই তা বাস্তবায়ন
করুন।
১৭. গরীবকে সাহায্য করুন। দাতা হোন,
গ্রহীতা নয়।
১৮. অন্য লোকে আপনাকে কি ভাবছে তা
নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই বরং
অাপনি অাপনাকে কি ভাবছেন সেটা
মুল্যায়ন করুন ও সঠিক কাজটি করুন।
১৯. কষ্ট পুষে রাখবেন না। কারণ সময়ের
স্রোতে সব কষ্ট ভেসে যায় তাই কষ্টের
ব্যাপারে খোলামেলা অালাপ করুন ও
ঘনিষ্টদের সাথে শেয়ার করুন।
২০. মনে রাখবেন সময় যতই ভাল বা
খারাপ হোক তা বদলাবেই।
২১. অসুস্থ হলে আপনার ব্যবসা বা চাকুরী
অন্য কেউ দেখভাল করবে না। করবে বন্ধু
কিংবা নিকটাত্মীয়রা, তাদের সাথে
সম্পর্ক বজায় রাখুন।
২২. ফেইসবুক অনেক সময় নষ্ট করে।
পোষ্টটি পড়তে পড়তেই অনেক খানি সময়
নষ্ট করেছেন। ফেইসবুকে আপনার সময়
নির্দিষ্ট করুন। কতক্ষণ সময় থাকবেন
এখানে।
২৩. প্রতি রাত ঘুমানোর আগে আপনার
জীবনের জন্য বাবা মাকে মনে মনে
ধন্যবাদ দিন।
২৪. মনে রাখুন জীবনের কোন কোন ভুলের
জন্য আপনি ক্ষমা পেয়েছেন। সেসব ভুল
আর যেন না হয় তার জন্য সতর্ক থাকুন।