ঝলসে যাওয়া শরীর নিয়ে এভাবেই হাসপাতালের বেডে নিথর পড়ে আছে নির্যাতিত মানবতা!

স্টাফ রিপোর্টার, সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা-
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের শিশু ওয়ার্ডে থামছেনা গৃহকর্মী এক শিশু ও তার অসহায় পরিবারের আহাজারি । ক্ষুব্ধ গৃহকর্ত্রীর ঢেলে দেওয়া গরম পানিতে ঝলসানো শরীর আর দুই হাত ব্যান্ডেজে বাঁধা অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় নিথর পড়ে আছে ১১ বছর বয়সী মনি আক্তার। পাষণ্ড গৃহকত্রীর ঢেলে দেয়া গরম পানিতে শুধু হাত ও শরীরই নয় পুড়ে গেছে নিস্পাপ শিশুটির ডান গালটিও ।
মনির বাবা আব্দুল আজিজ পেশায় একজন রিকশাচালক। সংসারের বেহাল দশায় অসহায় রিকশাচালক বাবা ভেবেছিলেন, যেহেতু গৃহকত্রী পেশায় একজন শিক্ষিকা অন্যদিকে বাড়ির কর্তা একজন ব্যাংকার মানুষ সেখানে নিশ্চয়ই তার মেয়ে ভালো থাকবে। মনিকে নেবার সময় ঐ পরিবার আব্দুল আজিজকে কথাও দিয়েছিলেন তারা মনিকে লেখাপড়াও করাবে।

ঘুর্নাক্ষরেও অসহায় ঐ বাবা ভাবেননি তার মেয়ের উপর এমন শিক্ষিত মানুষেরাই অকথ্য নির্যাতন চালাবে!

গত ১৭ জানুয়ারি নরসিংদীতে ছোট্ট শিশু মনির গায়ে গরম পানি ঢেলে দিয়েছিলেন গৃহকর্ত্রী কলেজ শিক্ষিকা মাহামুদা ইয়াসমিন নাজমা। গায়ে গরম পানি ঢেলে দেওয়ায় মনির মুখের ডানপাশ, দুই হাত ও বুকের এক পাশ ঝলসে যায়। পরে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টায় প্রায় একসপ্তাহ স্থানিয় চিকিতসকের কাছে লুকিয়ে শরীরের পোড়া অংশ সারানোর অপচেস্টা চালায় ঐ পরিবার।
এরপর গৃহকর্তা লোক মারফত মনিকে তাদের বাড়িতে ফেরত পাঠায়। এসময় বিষয়টি পুলিশকে না জানানোর জন্য হুমকিও দেয়।

মেয়েকে ফেরত পাবার পর স্থানীয় ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে মনিকে ভর্তি করে পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু সেখানকার চিকিতসকেরা মনির শরীরের ক্ষত অংশের ভয়াবহতা দেখে তাকে সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। গত ২৪ জানুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় মনিকে ।

নাজমার স্বামী হাসান সারোয়ার সোহেল জনতা ব্যাংকের অফিসার। ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকে স্বামী-স্ত্রী পলাতক রয়েছে।

আব্দুল আজিজ জানান, ঘটনার পর কয়েকদিন কোনও চিকিৎসা হয়নি মনির। তিনি বলেন, ‘মাইয়ারে একমাস আগে কাজে দিই। ওর বেতন ধরেছিল দুই হাজার টাকা।’ সেই টাকাও তারা পাননি।

হাসপাতালের বেডে যন্ত্রনায় কাতর মনি সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানালেন, ঘটনার দিন ‘গরম পানি নিয়ে যেতে পারবো না বলায় হে (গৃহকর্তী) আমার গায়ে গরম পানি ঢাইল্যা দেয়।’“হেদিন আমি কইছিলাম, ‘আন্টি, আমি পাতিলটা তুলতে পারুম না। আপনি নিয়্যা যান।’ তারপরে আমারে থাপ্পড় মারছে। এরপর পাতিল ছুইড়্যা মারছে। এরপর আমার গায়ে গরম পানি ঢাইল্যা দিছে। তহন বেটি কয়: ‘তুই মর, তুই মর’। হের পর বেটি পলাইছে। ব্যাটা তহন ঘরে হুইয়্যা রইছে। পরে ব্যাটা আমারে ঠান্ডা পানি দিয়া মলম লাগায় দিছে।’

সে বলে, ‘হাসপাতালে যখন নিয়া আসছে তখন কইছে মা-বাবা কই? মা-বাবা না হইলে তো চিকিৎসা হইতো না। পরে ব্যাটায় আমার মারে খবর দিছে। আমার মায়ে তো জানেই না এই ঘটনা যে হইছে। বুধবার (১৭ জানুয়ারি) ৬টায় এই ঘটনা ঘটে। এর আগে মাছ ভুনা করছি। ডাল রানছি। এরপর পানি গরম হতে দিছিলাম।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা.পার্থ শংকর পাল সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানালেন, ‘মেয়েটির ১৫-১৬ শতাংশ বার্ন হয়েছে। এ ধরনের রোগী সাধারণত সেরে উঠতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে।’

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে, নরসিংদী সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘শিশুটির ঘটনা আমরা জানি। তাকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নীলক্ষেত থানাকে জানায়। এরপর নীলক্ষেত থানা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। শিশুটির বাবা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। বর্তমানে আমরা মামলাটির তদন্ত করছি। আসামিরা পলাতক রয়েছে। আসামিদের ধরার চেষ্টা করছি। মামলার অভিযুক্ত দুই আসামিকে আটক করা গেলে আমরা মামলার চার্জশিট দেবো।’

Leave a Reply