কারাবন্দী যুবকের সাথে প্রেমিকার বিয়ে! চট্টগ্রাম কারাগারে পুর্নতা পেলো অনবদ্য এক প্রেমের গল্প!

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি, সময়ের কণ্ঠস্বর-
আদালতের নির্দেশে কারাগারের অভ্যন্তরেই এক প্রেমিক জুটির ব্যতিক্রমি বিয়ের গল্প এখন সাড়া ফেলেছে পুরো এলাকায়। গল্পের নায়ক কারাবন্দী রাসেল (২৩) আর কনে তানিয়া (২০)।

কোন জমকালো কমিউনিটি সেন্টার নয়, নয় কোন বিশাল প্রাসাদ, বিয়ে হলো কারাগারে! এমনই এক ব্যতিক্রমি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম কারাগারে। এ ঘটনার মধ্যদিয়ে যেন, সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পেল নীড়। রাসেল আর তানিয়া যেন কারাগারের নোনা দেয়ালেই তুলতে সক্ষম হলেন প্রেমের সুদৃঢ় স্তম্ভ।

এক অনাড়ম্বর আয়োজনে কারাগারের অভ্যন্তরেই এই বিয়ে ভালোবাসা দিবসের আগের দিন সম্পন্ন হলেও আইনি বাধ্যবাধকতা ও বিধিনিষেধের কারনে তা প্রকাশ পায় একটু দেরিতেই। দু’পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে অনাড়ম্বর পরিবেশে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। ব্যতিক্রমি এই বিয়ে উপলক্ষে কারাবন্দীদের জন্য মিষ্টির ব্যবস্থাও করেন কারা কতৃপক্ষ।

অনবদ্য এই প্রেমের গল্পের শুরু আজ থেকে প্রায় তিনবছর আগে। এরপর নানা চড়াই উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে তানিয়ার পরিবার রাসেলের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ এনে বাকলিয়া থানায় মামলা করেন আজ থেকে প্রায় দুবছর আগে । ওই মামলায় সে সময় রাসেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারপর থেকেই জেলহাজতে অভিযোগের ঘানি টানছেন রাসেল।

রাসেল-তানিয়ার পারিবারিক সুত্রমতে, রাসেল-তানিয়ার প্রেম শুরু প্রায় তিন বছর আগে। চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া থানার মাস্টারপোল এলাকার ইকবাল কলোনিতে এই জুটির বসবাস। রাসেলের বয়স ছিল তখন ২১, আর তানিয়ার বয়স ১৮। চিরায়ত নিয়মে রাসেল ও তানিয়ার সম্পর্কের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় দু’জনের পরিবার।

এ নিয়ে দু’পরিবারের বিরোধ চরমে পৌঁছে। একপর্যায়ে রাসেলের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করে তানিয়ার বাবা। অভিযোগের দায়ে জেলে যেতে হয় রাসেলকে। সেই থেকে প্রায় দু’বছর এক মাস ধরে জেলের ঘানি টানছেন রাসেল।

এতকিছুর পরেও হেরে যায়নি রাসেল-তানিয়ার সত্যিকারের ভালোবাসা। জেলের উচু পাচিল, পারিবারিক বাধা সব ডিঙিয়ে রাসেল জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছে তানিয়াকে। আদালতের নির্দেশে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বিয়ে হয়ে গেলো রাসেল-তানিয়া জুটির।

রাসেলের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. ইসহাক জানালেন, সম্প্রতি দু’পরিবারের সম্মতিতে মামলা তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করা হয়। কিন্তু চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত এ আবেদন নামঞ্জুর করলে হাইকোর্টে রিভিশন করেন তারা। পরে হাইকোর্ট জামিনের শর্ত হিসেবে রাসেল ও তানিয়ার বিয়ের আদেশ দেন।

আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক ইকবাল কবির চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ও বেসরকারি কারাপরিদর্শক আবদুল মান্নানের উপস্থিতেতে রাসেল ও তানিয়ার বিয়ে সম্পন্ন হয়। এখন বিয়ের সার্টিফাইট কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাইকোর্টে পৌঁছালে রাসেলের জামিন হবে বলে আশা করছেন তিনি।

ঘটনার বিবরনে রাসেলের বন্ধু সুমন জানালেন, রাসেলের জন্ম, ছোট থেকে বেড়ে উঠা সবই এই ইকবাল কলোনিতে। রাসেল -তানিয়া সবাই এক সঙ্গে এখানে বড় হয়েছে। বছর তিনেক আগে তাদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠে। প্রথম প্রথম আমরা কয়েকজন জানলেও পরিবারের কেউ জানতো না বিষয়টি।

কয়েকমাস পর বিষয়টি জানাজানি হলে দু’পরিবারের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। তানিয়ার পরিবার তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। কিন্তু তিনি রাসেলকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিলোনা।

২০১৬ সালের ৩০ রমজানে তানিয়া রাসেল ভাইয়ার সঙ্গে একবার দেখা করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তার মা-বাবার ভয়ে পারছিলনা। শেষমেশ রাত আড়াইটার দিকে পাড়ার গলিতে রাসেলের সঙ্গে দেখা করতে যান। কিন্তু বিধিবাম, তারা ধরা পড়ে যান তানিয়ার বাবার হাতে।

এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে তানিয়ার বাবা আবদুল শুক্কুর বাকলিয়া থানায় রাসেলের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা করেন। এরপর রাসেল গ্রেপ্তার হয়। মামলা যায় চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে। রাসেলের পরিবার বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও তার জামিন করাতে পারেনি।

এদিকে, তানিয়ার পরিবার বাকলিয়া ছেড়ে চলে যায় জামালখানে। তানিয়াকে গ্রামের বাড়ি নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার অমতে তা কোনোভাবেই হচ্ছিল না। শেষমেশ কয়েকমাস আগে সমস্ত বিরোধে জল ঢেলে নিজের ভালোবাসা জয় করে নিতে সক্ষম হয় তানিয়া। তানিয়ার অনুরোধ আর ভালোবাসার প্রবলতার কাছে হার মেনে তার পরিবার মামলা তুলে নিতে সম্মত হয়।

রাসেলের আইনজীবী জানালেন, আইনি বাধ্যবাধকতা আর জটিলতার কারনে আদালত তা নামঞ্জুর করেন। পরে তারা হাইকোর্টে রিভিশন করেন। এ সময় হাইকোর্ট জামিনের শর্ত হিসেবে রাসেল ও তানিয়ার বিয়ের আদেশ দেন। পরে দু’পরিবারের সম্মতিতে কারাগারে রাসেল ও তানিয়ার বিয়ে হয়।

বিয়ের প্রায় এক সপ্তাহ পর প্রেমিক জুটির প্রেমের অনাড়ম্বর বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক (জেল সুপার) ইকবাল কবির চৌধুরী সাংবাদিকদের কাছে বিয়ের সত্যতা স্বীকার করে জানান, এ বিষয়ে কথা বলতে আদালতের নির্দেশ লাগবে।

Leave a Reply