আজ কলঙ্কময় ‘পিলখানা হত্যা’ দিবস

সময়ের কণ্ঠস্বর- আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের ইতিহাসে শোকাবহ এক দিন। বিডিআর বিদ্রোহের নামে ২০০৯ সালের এ দিনে রাজধানীর পিলখানায় সেনাকর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের এক জঘন্য ঘটনা ঘটে।

এ দিন নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বিডিআরের তৎকালীন ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাকে। ডিজির স্ত্রীসহ সামরিক-বেসামরিক আরো ১৭ জন মানুষকে হত্যা করা হয় ওই দিন। অফিসারদের স্ত্রী-সন্তান এবং বাবা-মাকে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। তাদের বাড়ি-গাড়ি, আসবাবপত্র এবং অন্যান্য সম্পদ আগুনে পুড়ে ফেলে উচ্ছৃঙ্খল জওয়ানেরা।

সেনা কর্মকর্তাদের শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি ঘাতকেরা, আলামত নষ্ট করতে প্রথমে তাদের লাশগুলো পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করে তারা। তাতে ব্যর্থ হয়ে তারা লাশগুলো মাটিচাপা দেয় ও ম্যানহোলের মধ্যে ফেলে দেয়। উচ্ছৃঙ্খল জওয়ানেরা অস্ত্রাগার লুট করে সেই অস্ত্র দিয়ে সেনাকর্মকর্তাদের হত্যা করে।

বহুল আলোচিত এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় (পিলখানা হত্যা মামলা) ১৩৯ জনকে ফাঁসি, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মামলা হিসেবে পরিচিত।

কী ঘটেছিল সেদিন?

২০০৯ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি। বুধবার সকাল ৯ টা ২৭ মিনিট। পিলখানার ভেতর থেকে ভেসে আসে লাগাতার গুলির শব্দ। অনেকেই ভেবেছিলেন নিয়মিত মহড়া। কিন্ত ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই জানা যায় বিদ্রোহের ঘটনা।

সেদিন বিডিআর সদর দপ্তরে ছিল বার্ষিক দরবার। দরবার চলাকালীন একদল বিদ্রোহী বিডিআর সৈনিক ঢুকে পড়ে। এদের একজন বিডিআর মহাপরিচালকের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে। বিডিআরের বিদ্রোহী সৈনিকরা সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুখে লাল কাপড় বেঁধে, বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে বিডিআর জওয়ানরা ছড়িয়ে পড়ে পুরো পিলখানায়। তারা সেনাকর্মকর্তাদের হত্যা করে তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে। চারটি প্রবেশ গেট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আশেপাশের এলাকায় গুলি ছুড়তে থাকে বিদ্রোহী সৈনিকরা। তাদের গুলিতে একে একে লুটিয়ে পড়তে থাকে মেধাবী সেনা কর্মকর্তারা।

সকাল পৌনে ১১টার দিকে সেনাবাহিনীর প্রথম আর্মড পার্সোনাল ক্যারিয়ার বা এপিসি পৌঁছায় ধানমন্ডিতে। বিকেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীসহ দুইজন সংসদ সদস্য শান্তির পতাকা নিয়ে পিলখানায় ঢোকেন। বিদ্রোহী সদস্যরা তাদের দাবির কথা জানাতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যান। চলে বৈঠক। রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র সমর্পন করে কিছু বিডিআর সদস্য। জিম্মি দশা থেকে মুক্ত হয়ে আসেন কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা।

পরদিন রাতে রেডিও-টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে বিদ্রোহের পথ থেকে সরে আসার জন্য বিডিআর সদস্যদের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বিদ্রোহী জওয়ানেরা অস্ত্র সমর্পণে সাড়া দেয়ার পর ২৭শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পিলখানার ভেতরে ঢোকে পুলিশ। উদ্ধার করা সেনা কর্মকর্তাসহ অন্যদের মৃতদেহ। পাওয়া যায় গণকবর। একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় শ্বাসরুদ্ধকর তিনটি দিন।

এ হত্যাযজ্ঞে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা, ১ জন সৈনিক, দুই জন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ জন বিডিআর সদস্য ও পাঁচ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়। পিলখানায় এ বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় বিডিআরের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে যায়।

বিডিআরের নাম, পোষাক, লগো, সাংগঠনিক কাঠামো, পদোন্নতি ইত্যাদি ব্যাপারে পুনর্গঠন করা হয়। নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পরিবর্তন করা হয় বিডিআর বিদ্রোহের আইন। বর্ডার গার্ড আইনে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা রাখা হয় মৃত্যুদণ্ড।

সরকার বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনাটিকে ‘পিলখানা হত্যা দিবস’ হিসেবে প্রতি বছর পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দিবসটি পালন উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি।

রবি

Leave a Reply