SOMOYERKONTHOSOR

এরশাদ শিকদারকেও হার মানিয়েছে নোয়াখালীর ইউপি সদস্য মোজাম্মেল

স্টাফ রিপোর্টার, সময়ের কণ্ঠস্বর-: কুখ্যাত এরশাদ শিকদারকেও হার মানিয়েছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৮নং চরএলাহীর ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোজাজ্জেল হোসেন। তার বিরুদ্ধে এলাকায় দখলবাজী ,চাঁদাবাজী,খুন,গুম,নারী ধর্ষন ও অগ্নিসযোগের মত এই কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে। মোজাম্মেলর এই সব অপকর্মের বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জ থানা ও নোয়াখালী জেলা জজ আদালতে অর্ধ ডজন মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।

চুরির মাধ্যমে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন মো: হোসেনের পুত্র মো: মোজাম্মেল হোসেন। তার অপকর্ম খুলনার কুখ্যাত এরশাদ শিকদারকেও হারমানিয়েছে। তার বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার সকালে কুখ্যাত এই ইউপি সদস্যের শাস্তি দাবী করে স্থানীয় হাসেম বাজারে মানববন্ধন করেন কয়েকশ গ্রামবাসী।

জানা যায়, স্থানীয়ভাবে দলীয় রাজনীতিতে কিছুটা প্রভাব থাকলেও নেই আদর্শগত রাজনীতি। গত ৬/৭ বছর ধরে চলছে দলীয় সাইনবোডের আড়ালে তার ব্যক্তিগত প্রভাব, আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসের রাজনীতি। এক সময়ের শান্ত এ এলাকাটি এখন অশান্ত। খুন, গুম, নারী ধর্ষন, চাঁদাবাজি, হামলা, অগ্নিসংযোগ, সাধারণ মানুষকে নির্যাতন সবমিলিয়ে মোজাম্মেল মেম্বারের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ দিশেহারা।

তার সন্ত্রাসের রাজনীতির যাঁতাকলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মী ও সমথকরাও আজ জিম্মি। অভিযোগ রয়েছে, গত ইউপি নির্বাচনের পর এখানে সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

বেপরোয়া হয়ে পড়ে মোজাম্মেল। তার চাঁদাবাজি, সরকারী খাস জমি দখল করে বিক্রি এবং সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন এখন চরমে পৌছে গেছে। গত এক বছরে মোজাম্মেল মেম্বার ও তার বাহিনীর অত্যাচারে অনেকে আহত হয়েছে আবার অনেকে ঘর ছাড়া হয়েছে। আর এসকল অপকমের মাধ্যমে মোজাম্মেল রাতারাতি হয়ে যান কোটিপতি। হত্যা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় বেশ কয়েকটি মামলাও হয়েছে। ঐসকল মামলার প্রত্যেকটিরই প্রধান আসামী ছিল এ মোজাম্মেল মেম্বার।

সরেজমিন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহী ইউনিয়নের গাংচীলে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে আলাপ করলে তারা গোপনীয়তা রক্ষা করে এ প্রতিবেদককে জানায়, মোজাম্মেল মেম্বারের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ গুলো হল, সে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সরকারী খাস জমি দখল করে তা বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সে নিয়মিতই শালিস বানিজ্য করে যাচ্ছে।

স্থানীয় অধিবাসীদেরকে বিদ্যুত দেয়ার নাম করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় লোকজন তাকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হচ্ছে। তাছাড়া অত্যাচার নির্যাতন, চাঁদাবাজি, নারী ধর্ষনতো আছেই। সে ও তার বাহিনীর ভয়ে মানুষ মুখ খুলতেও রাজী নয়।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে জানা যায়, গাংচীল বাজারে মার্কেট করার সময় স্থানীয় আবু তাহের সওদাগরকে বাধ্য করে তার কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা নেয়া হয়। স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী আকাশকে ধরে এনে টর্চার সেলে আটক করে নির্যাতন চালিয়ে তার কাছে ২লক্ষ টাকা চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। গাংচীলে মৎস্য প্রজেক্ট করার সময় মাঈন উদ্দিন নামে নোয়াখালী সদরের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা নেয়া হয়েছিল। এভাবে অসংখ্য চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে এ মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে।

এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানাযায়, মোজাম্মেল মেম্বারের রয়েছে একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্যরা হল, আলী আহাম্মদের ছেলে লেংড়া সিরাজ, ফকির মাঝির ছেলে সেলিম, আ: শহীদ সর্দ্দারের ছেলে জামাত ক্যাডার করিম, মনু মিয়ার ছেলে সিরাজ ডাকাত ও বাসু, আ: খালেকের ছেলে রফিক, আ: সাত্তারের ছেলে সাহাব উদ্দিন, হারুন অর রশিদের ছেলে মাসুদ, সূবর্ণ চর উপজেলার চরলক্ষী ইউনিয়নের চরক্লার্কের বোরহান ডাক্তারের ছেলে আঙ্গুল কাটা মাঈনুদ্দিন অন্যতম। প্রতিরাতে এদের সশস্ত্র মহড়ায় আতঙ্কিত গাংচীলবাসী ঘুমাতেও পারেনা। নিয়মিতই তারা বোমা বিস্ফোরন করে থাকে এলাকায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ তাদের কাছে বেশ পরিমান আগ্নেয়াস্ত্র আছে।

গাংচীলের আলোচিত জোৎস্না হত্যা মামলার ২জন আসামী অভিযোগ করে বলেন, মামলা থেকে বাদ দেয়ার নাম করে আমরা ৫জন আসামীর প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে চাঁদা নিয়েছিল মোজাম্মেল।

অনুসন্ধানে জানাযায়, তার এসকল অপকর্মের কারনে ২০১৫ সালে জসীম উদ্দিন বাদী হয়ে একটি মামলা করে। মামলা নং-০৬, তারিখ-৩/৭/২০১৫, জিআর নং-১০৮৭/১৫, ধারা ১৪৩/৪৪৮/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৩৮৫/ ৩৭৯/৫০৬দ:বি, এ মামলার ১নং আসামী মোজাম্মেল মেম্বার। ২০১৬ সালে শোকর বানু বাদী হয়ে একটি মামলা করে। মামলা নং-১১, তারিখ-১৫/১/২০১৬, জিআর নং-১৫৬/১৬, ধারা-৪৪৭/৩২৩/৩৮৫/৩৮৭/
১১৪/দ:বি, এ মামলার ১নং আসামী মোজাম্মেল মেম্বার।

একই বছর ৩০/১/১৬ তারিখে রোকেয়া বেগম বাদী হয়ে একটি মামলা করে, মামলা নং-০৩, জিআর নং-১৭০/১৬, আয়েশা বেগম বাদী হয়ে একটি মামলা করে, মামলা নং-১০, জিআর নং-১৫৫/১৬। ছেমনা খাতুন বাদী হয়ে একটি মামলা করে, মামলা নং-০২, জিআর নং-১৬৯/১৬। হাছিনা আক্তার বাদী হয়ে একটি মামলা করে, মামলা নং-০১, জিআর নং-১৬২/১৬। এ সকল মামলায় সে বেশ কয়েকবার হাজত বাসও করেছিল।

উল্লেখ্য কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৮নং চরএলাহী ইউনিয়নের ৮নং ওয়াডের মো: হোসেনের ছেলে মো: মোজাম্মেল হোসেনই আজকের কোটিপতি মোজাম্মেল হোসেন। জীবনের শুরুতে যে ছিল একজন দিন মজুর পরে শ্রমিক সর্দার। পড়ালেখার গন্ডি প্রাথমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, ২০০৭সালে সে নূর ইসলাম হত্যা মামলায় আসামী হওয়ার পর আ’লীগে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন পরিপূর্ণভাবে শুরু হয়। হয়ে যান চরএলাহী ইউনিয়ন যুবলীগের উপ-কমিটির সভাপতি(৭,৮ ও ৯নং ওয়ার্ড)।

ক্ষমতার দাপটে হয়ে যান, গাংচীল কবি নজরুল উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি, আশার হাট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি ও গাংচিল রহমানীয়া দাখিল মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। যদিও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল। বৈবাহিক অবস্থা সম্পর্কে স্থানীয় লোকজন জানায়, ব্যক্তিগত জীবনে মোজাম্মেল মেম্বার দুইটি বিয়ে করেন।

দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে এলাকায় একটি গুঞ্জন রয়েছে যে, সে কবি নজরুল উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি ছাত্রীকে জোরপূর্বক বিয়ে করেছে। এক কথায় বলতে গেলে চরএলাহীর গাংচীলে মোজাম্মেল মেম্বার ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। তার অপকর্ম খূনলার কুখ্যাত এরশাদ শিকদারকেও হার মানিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনিয়ন আ’লীগের দক্ষিন শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো: বাকের হোসেন ওরফে বাকের সর্দার জানান, মোজাম্মেল মেম্বারের অত্যাচার নির্যাতনের ফলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীরাও আজ অতীষ্ট। তার বাহিনীর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়না।

বাকের সর্দারের বক্তব্যকে তখনই সত্য বলে এ প্রতিবেদকের কাছে প্রতীয়মান হল যখন দেখা গেল, সাধারণ মানুষ তার সম্পর্কে তথ্য দেয়ার পর বাজারের দোকানদারগণ একে একে দোকান বন্ধ করে ভয়ে চলে যাচ্ছে। দোকান বন্ধ করার কারন জিজ্ঞাসা করলে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানদার বলেন, আপনারা চলে গেলে মেম্বারের বাহিনী আমাদের উপর হামলা করতে পারে।

ইউনিয়ন যুবলীগের উপ-কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলী মোহন জানান,মোজাম্মেলের অত্যাচার নির্যাতন সীমা অতিক্রম করে গেছে। হেন কাজ নেই যা সে করতে পারেনা। অনতি বিলম্বে তাকে আইনের আওতায় এনে এলাকাকে সন্ত্রাস মুক্ত করার জন্য তিনি মন্ত্রী মহোদয় ও বসুরহাট পৌর মেয়রের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। অন্যথায় আগামী সংসদ নির্বাচনে সাধারণ মানুষের মাঝে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে মোজাম্মেল মেম্বারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সে জানায়, আমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। এসকল অভিযোগ সত্য নয় বলে তিনি জানান। তবে তার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা রয়েছে বলে স্বীকার করেন।

বিষয়টি নিয়ে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাকের সাথে আলাপ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি।