SOMOYERKONTHOSOR

কেমন আছে এখন, জোড়া কোমর নিয়ে জন্মানো দেশব্যপি আলোচিত সেই তোফা-তহুরা ?

মা’র হাত ধরেই তোফা-তহুরা হাটছে। ওরা এখন একাই চেয়ারে বসে থাকতে পারে। হাটতে পারে, এভাবেই ধীরে ধীরে  স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে জোড়া কোমর নিয়ে জন্মানো আলোচিত দুই বোন তোফা-তহুরা ।

দেশব্যাপী আলোচিত কোমরে জোড়া লাগানো জমজ দুইবোন তোফা-তহুরার আজকের দিনের অবস্থা ও খুটিনাটি আপডেট ও ছবি নিয়ে ফরহাদ আকন্দ, সময়ের কণ্ঠস্বর, গাইবান্ধা প্রতিনিধির বিস্তারিত প্রতিবেদন :

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রামজীবন ইউনিয়নের কাশদহ গ্রামে নানার বাড়ীতে হাঁসি-কান্না ও খেলাধুলায় কেটে যাচ্ছে তাদের দিন। গত সাড়ে চার মাস ঢাকায় টানা চিকিৎসা শেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে গাইবান্ধা ফিরে আসে তোফা-তহুরা।

তোফা-তহুরার পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, আবারো ঢাকায় চিকিৎসা শেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে দুবোনকে বাড়িতে নিয়ে আসেন বাবা রাজু মিয়া ও মা শাহিদা বেগম। এখন পর্যন্ত তারা সুন্থ্য রয়েছে। তোফা-তহুরা গরমকে সহ্য না করতে পারায় কান্না করে। বাড়ীতে বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে কষ্ট পাচ্ছে তারা।

বাবা- মায়ের কোলে তোফা তহুরা

২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর গরমের কষ্ট থেকে রক্ষা পেতে তাদের জন্য নানা বাড়ীতে ৫০ ওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ লাগানো হয়। বর্তমানে বেশিক্ষণ চার্জ না থাকায় খুব কষ্ট হচ্ছে। তাই গরম লাগলে সব ছেড়ে কান্নাকাটি করে এই দুবোন। তারা একসাথে সব কিছু করতে পছন্দ করে। একজনকে আদর করলে অন্যজন আর চোখে তাকিয়ে থাকে। তবে তহুরার তুলনামূলক রাগ, জেদ একটু বেশি।

সরেজমিনে তোফা-তহুরার নানার বাড়িতে প্রবেশ করতেই দেখা গেল মা সাহিদা বেগমের কোলে তারা দুবোন। তারা একে অপরের সাথে খেলছিল। আশে পাশের বাড়ির মানুষগুলো তাদের ঘিরে রেখে, এতটুকু সংকোচ না করেই তারা তাদের খেলাধুলা ও বিভিন্ন আচরণে ব্যস্ত ছিল। ঘিরে থাকা আশেপাশের মানুষগুলো তাদের এসব দেখে আনন্দ উপভোগ করছিল। কারণ তারা সুস্থ্য-স্বাভাবিক আছে। আবার অপরিচিত মানুষ দেখলে লজ্জায় মুখ লুকুয়ে মা শাহিদা বেগমকে জাপটে ধরে থাকে। তারা এখন হাটতে পারে।

এভাবেই অস্বাভাবিক জোড়া লাগানো অবস্থায় জন্ম হয়েছিলো তাদের।

দেশব্যাপী আলোচিত এই জমজ শিশু তোফা-তহুরার এমন অস্ত্রপাচার দেশে এটাই প্রথম। তাই যে কোন উপায়ে তাদের দুইজনকে সুস্থ্য রাখা চিকিৎসকদের জন্যও ছিল এক ধরনের বিশ্বের কাছে বাজি। তাই বাড়ীতে ফিরলেও নিয়মিত তোফা-তহুরার খোঁজ-খবর নেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাহনূর ইসলাম। তাদের দুজনকে ভালো রাখতে প্রতিনিয়তই মুঠোফোনে যোগাযোগ করে মা শাহিদা বেগমকে পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

তাদেরকে সুস্থ্য রাখতে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক ও সুন্দরগঞ্জের ইউএনওসহ অনেকে বাড়ীতে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার কথা বলছিলেন। কিন্তু সাড়ে পাঁচ মাসেও তাদের নানা বাড়িতে দেয়া হয়নি এখনও সেই সংযোগ। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় বাড়ীতে এসে গরমে দুইবোনকে কষ্ট পেতে হচ্ছে। একটু গরম লাগলেই কান্না করছে তারা।

অস্ত্রোপাচারের পর আজকের দিনের আলোচিত দুই বোন

তোফা-তহুরার মা শাহিদা বেগম বলেন, তোফা-তহুরা পূর্বের অবস্থা থেকে আল্লাহর রহমতে এখন অনেক ভাল আছে। চিকিৎসকরা বলেছেন তোফা-তহুরার যেন কোন অযতœ না হয়। সবসময় যেন ভালো থাকে, সেভাবে রাখতে হবে। কিন্তু বাড়ীতে ফেরার পর ওরা দুবোন গরমে খুব কষ্ট পাচ্ছে। বাড়ীতে বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। পল্লী বিদ্যুতের কোন লোকও আর আসেনা এদিকে।

সুন্দরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী মো. সোলায়মান হোসেন সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, তোফা-তহুরার বাড়ীতে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে ডিজাইন ও টেন্ডার করা হয়েছে। এরপর ওয়ার্ক অর্ডার, কনস্ট্রাকশন, লাইন টানার কাজ করা হবে। তারপরই ওই বাড়ীতে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হবে। যা সম্পন্ন করতে তিন মাসেরও বেশি সময় লাগবে।

তোফা-তহুরার চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাহনূর ইসলাম মুঠোফোনে সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, তোফা-তহুরা এখন ভালো আছে। তহুরার প্রসাবে ইনফেকশন ছিল। তাকে চিকিৎসা দেয়া আছে এখন তা নিয়ন্ত্রণে আছে। এছাড়া তাদের দুজনকে ডেভেলপমেন্টাল থেরাপির জন্য সাভার পক্ষাঘাত গ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপিতে) পাঠানো হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসা শেষে তাদেরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এখন তাদের ওজন সাত কেজি করে হয়েছে। তাদের ওজন ১০ কেজি হওয়ার পর আর একটা অস্ত্রপাচার করতে হবে। আর তত দিন পর্যন্ত বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে প্রতিমাসে চেকআপের জন্য তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একবার আসতে হবে। এছাড়াও যখনি অসুস্থ্য হবে, তাৎক্ষনিক ঢাকায় নিয়ে আসতে হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কোমরে জোড়া লাগানো অবস্থায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রামজীবন ইউনিয়নের কাশদহ গ্রামে নানার বাড়িতে তোফা ও তহুরার জন্ম হয়। এরপর ৭ অক্টোবর তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। মলদ্বার একটি থাকায় পরে ১৬ অক্টোবর প্রথম অস্ত্রপাচার করা হয়।

আবার ২০১৭ সালের ১ আগষ্ট তাদেরকে আলাদা করার জন্য করা হয় দ্বিতীয় অস্ত্রপাচার। পরে সুস্থ হলে সে বছরেরই ১০ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় ফিরে আসে তোফা-তহুরা। পরে আবারও তহুরা অসুস্থ্য হলে গত বছরের ৮ অক্টোবর তহুরাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। দীর্ঘ সাড়ে চার মাস চিকিৎসা শেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নানার বাড়ীতে ফিরে আসে তারা।