ছাত্রলীগ নেত্রীকে ধর্ষণে অভিযুক্ত জেলা ছাত্রলীগের সেই বহিস্কৃত সহ-সভাপতি অবশেষে আটক

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি, সময়ের কণ্ঠস্বর- স্কুলছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে ব্যপক সমালোচিত সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সেই নেতা রিয়াদ হোসেনকে (৩০) গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

রবিবার (১১ মার্চ) সন্ধ্যায় গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতেই তাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে তার সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পিবিআই।

রিয়াদ হোসেনকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিআইবি)-এর সিরাজগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস.এম. তারেক রহমান সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানিয়েছেন, রিয়াদ হোসেন জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। ধর্ষণের অভিযোগে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। তার বাড়ি বেলকুচি উপজেলার চরচালা গ্রামে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস.এম. তারেক আরও জানান, স্কুলছাত্রী ধর্ষণ ছাড়াও বেলকুচি পৌরসভা কার্যালয়ে ভাঙচুর ও নারী মেয়রকে লাঞ্ছিত করা, বাসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্থানীয় এমপি আব্দুল মজিদ মণ্ডলকে নিয়ে কটূক্তিসহ বেশ ক’টি মামলার চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামি ছিলো রিয়াদ

এর আগে গত ১৩ অক্টোবর বেলকুচির কলাগাছি গ্রামের এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগ নেতা রিয়াদ হোসেনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ছাত্রীর মামা রিয়াদসহ পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে সিরাজগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলার তদন্তভার পিবিআই’কে দেয়। তবে তদন্ত নিয়ে পিবিআই শুরু থেকেই নানা টালবাহানা ও গড়িমসি করে। তদন্ত নিয়ে কালক্ষেপণের অভিযোগে দু’দফা তদন্ত কর্মকর্তাও বদল করা হয়।

এছাড়াও ধর্ষণের ঘটনায় ভিকটিম প্রথমে বেলকুচি থানায় অভিযোগ দিতে গেলে রিয়াদসহ অন্য আসামিদের যোগসাজশে মেয়েটিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা না করার জন্য ওসি সাজ্জাদ হোসেন সাদা কাগজে কৌশলে স্বাক্ষর নেন বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া গত ১৪ ডিসেম্বর বেলকুচি পৌরসভা কার্যালয়ে ভাঙচুর ও নারী মেয়রকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে দায়ের করা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিও রিয়াদ। সম্প্রতি যুবলীগ নেতা সাজ্জাদুল হক রেজা ও ফারুক হোসেনকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করার পর বাসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় বেলকুচি থানায় আরেকটি দ্রুত বিচার আইনে দায়ের হওয়া মামলায়ও রিয়াদ চার্জশিটভুক্ত আসামি।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্থানীয় এমপি আব্দুল মজিদ মণ্ডলকে নিয়ে কটূক্তি করায় তথ্য প্রযুক্তি আইনে আরেকটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে আলোচিত রিয়াদ হোসেনের বিরুদ্ধে।

প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১৭ সালের অক্টোবরে স্কুলছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করার অভিযোগে সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি রিয়াদ হোসেনকে প্রধান আসামি করে মামলা হয়।  ওই ছাত্রীর মামা মোজাম্মেল হক সরকার বাদী হয়ে সিরাজগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে এ মামলা করেন। মামলায় আরও পাঁচজনকে আসামি করা হয়।

ট্রাইব্যুনালের বিচারক শহিদুল ইসলাম শুনানি শেষে মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন সেসময় ।

ট্রাইব্যুনালের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) আনোয়ার পারভেজ এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, প্রধান আসামি রিয়াদ বেলকুচি উপজেলার চরখাসিয়া গ্রামের রকিব উদ্দিন মাস্টারের ছেলে। অন্য আসামিরা হলেন একই উপজেলার চরচালা গ্রামের মিন্টু কসাইয়ের ছেলে আরমান হোসেন (২৬), ফজলুল হকের ছেলে আল-আমিন হোসেন, মৃত সোনা উল্লার ছেলে রুবেল শেখ, কলাগাছি গ্রামের মমিন শেখের ছেলে রতন শেখ (২৪) এবং গাড়ামাসি গ্রামের নিমাই চন্দ্রের ছেলে পাপ্পু।

এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, সাত-আট মাস আগে ছাত্রলীগ নেতা রিয়াদ হোসেন স্কুল কমিটি গঠনের জন্য দৌলতপুর উচ্চবিদ্যালয়ে যান। তখন ওই ছাত্রীর সঙ্গে রিয়াদের পরিচয় হয়। ওই পরিচয় সূত্র ধরে মেয়েটিকে স্কুল কমিটিতে ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতির পদ দেওয়া হয়। এই সূত্র ধরেই উভয়ের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে  বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে রিয়াদ মেয়েটির সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে মেয়েটি রিয়াদকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে রিয়াদ টালবাহানা শুরু করেন। একপর্যায়ে রিয়াদ বন্ধুদের সহযোগিতায় ওই ছাত্রীকে মারধর করেন এবং ভয়ভীতি দেখান।

পরে ওই ছাত্রী বিষয়টি তার স্বজনদের জানায় এবং তার বাবাকে নিয়ে থানায় মামলা করতে যায়। এ খবর পেয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা থানায় গিয়ে পুলিশের সামনে আবারও ওই ছাত্রীকে মারধর করেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে সাদা কাগজে বাবা-মেয়ের স্বাক্ষর নিয়ে তাঁদের থানা থেকে বের করে দেন। থানায় মামলা করতে না পেরে অনেক দেরিতে শেষ পর্যন্ত তাঁরা আদালতে মামলা করেন।

সংযুক্ত
সংগঠনের স্কুল শাখার নেত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি রিয়াদ হোসেনকে বহিষ্কার করা হয় গত ২৬ অক্টোবর ২০১৭ সালে ।
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের জরুরি এক বৈঠকে রিয়াদকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত এই সিদ্ধান্তের একটি বিজ্ঞপ্তি সংগঠনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

রিয়াদকে বহিষ্কারের বিষয়ে সেসময় সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. একরামুল হক জানান, গতকাল রাত ১২টায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply