ভুল কার? ত্রিভুবন, না ইউএস বাংলার? দায় এড়াতে চলছে ‘দোষ চাপানোর প্রতিযোগিতা’!

সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা-
ঢাকা থেকে ৬৭ আরোহী ও চার ক্রু নিয়ে উড্ডয়নের পর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (টিআইএ) ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটিতে আগুন ধরে যায় বিধ্বস্ত হওয়ার আগেই। সোমবার নেপালের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।

ভয়াবহ ও মর্মান্তিক এই বিমান দুর্ঘটনায় সর্বশেষ পাওয়া খবরে প্রায় ৫০ জন যাত্রী হতাহতের পর ইউএস বাংলা কতৃপক্ষ ও নেপালের ত্রিভুবন বিমান বন্দর কতৃপক্ষের মধ্যে একে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা চলছে!

নেপালের কাঠমুন্ডুতে বিধ্বস্ত বিমানটি ভুল বার্তার কারণে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে বলে দাবি করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে “পাইলট বিমানবন্দর কন্ট্রোল রুমের ওই নির্দেশনা পালন করেননি” এমনটাই দাবী করেছেন, নেপালের বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক সানজিব গৌতম।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (টিআইএ) ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটির পাইলটকে বিমানবন্দরের দক্ষিণ-প্রান্ত থেকে রানওয়েতে অবতরণের অনুমতি দেয়া হয়েছিল উল্লেখ করে নেপালের বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক সানজিব গৌতম বলেন, কিন্তু বিমানবন্দরের উত্তর অংশ থেকে বিমানটি অবতরণের চেষ্টা করে পাইলট। এসময় হঠাৎ বিমানটিতে আগুন ধরে যায়।

তিনি জানিয়েছেন, তবে কী কারণে পাইলট বিমানবন্দর কন্ট্রোল রুমের ওই নির্দেশনা পালন করেননি তা জানা যায়নি। তবে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।

দেশটির এই কর্মকর্তা বলেন, রানওয়ের উত্তর অংশ দিয়ে অবতরণের চেষ্টার সময় বিমানটির পাইলট নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ফলে বিমানবন্দরের পাশের একটি ফুটবল মাঠে আছড়ে পড়ে বিমানটি।

এদিকে, সর্বশেষ কথোপকথনের পাওয়া অডিও থেকে জানা যায়, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিধ্বস্ত বিমানের পাইলটকে অবতরণের ভুল নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম থেকে। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার আগ মুহূর্তে বিমানের পাইলটের সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ কথোপকথনে এমনটাই আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

নেপালের ইংরেজি দৈনিক নেপালি টাইমস কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে পাইলটের সর্বশেষ কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেছে । নেপালি এ দৈনিক বলছে, কন্ট্রোল রুম থেকে ভুল বার্তা দেয়ার কারণেই ককপিটে দ্বিধায় পড়েন পাইলট।

অডিও রেকর্ডের শুরুতে শোনা যায়, কন্ট্রোল রুম থেকে বিমানের পাইলটকে বিমানবন্দরের ডানদিকের দুই নাম্বার রানওয়েতে অবতরণের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। পরে পাইলট বলেন, ঠিক আছে স্যার। নির্দেশনা অনুযায়ী পাইলট বিমানটি বিমানবন্দরের ডানদিকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান কন্ট্রোল রুমে।

কিন্তু ডানদিকে রানওয়ে ফ্রি না থাকায় তিনি আবারো কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় তাকে ভিন্ন বার্তা দেয়া হয়। এবারে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি বর্তমান অবস্থানে থাকতে পারবেন?

এ সময় পাইলট দুই নাম্বার রানওয়ে ফ্রি করার জন্য কন্ট্রোল রুমের কাছে অনুরোধ জানান। কিন্তু তাকে আবারো ভিন্ন বার্তা দেয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর পাইলট বলেন, স্যার আমি আবারো অনুরোধ করছি রানওয়ে ফ্রি করুন। এই ছিলো শেষ কথা । পরমুহুর্তেই বিমানটি বিকট শব্দ করতে শুরু করে। কিছুমুহুর্ত পরেই বিমানটি ত্রিভুবণ বিমানবন্দরের পাশের একটি ফুটবল মাঠে আঁছড়ে পড়ে।

কথোপকথনের অডিও

এর আগে ইউএস-বাংলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আসিফ জানান, নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে দেয়া ভুল বার্তার কারণে সোমবার বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকাস্থ ইউএস বাংলার কার্যালয়ের সামনে সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এ তথ্য জানান।

ইমরান আসিফ বলেন, বিমানের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ভুল বার্তা দেয়া হয়েছিল।

বিধ্বস্ত বিমানটি  থেকে বেঁচে যাওয়া নেপালি এক যাত্রীও বলেছেন, ঢাকা থেকে স্বাভাবিকভাবেই বিমানটি উড্ডয়ন করে। কিন্তু কাঠমান্ডুতে অবতরণের সময় এটি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে।

‘হঠাৎ বিমানটি ঝাঁকুনি দিতে শুরু করে এবং এরপরই উচ্চ শব্দ হয়। আমি জানালার পাশেই বসে ছিলাম। জানালার কাঁচ ভেঙে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই।’

সোমবার নেপালের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে ৪ ক্রু ও ৬৭ আরোহীবাহী বাংলাদেশি বেসরকারি এ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এতে সর্বশেষ ৫০ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে আরো ২১ যাত্রী।

বাড়ি ফেরা হল না সিলেটের ১৩ মেডিকেল শিক্ষার্থীর!

নেপালে বিধ্বস্ত বিমানটিতে ছিল ১৩ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী। যার মধ্যে ১১ জন মেয়ে ও ২ জন ছেলে। তারা নেপালের নাগরিক ছিলেন। বাংলাদেশের সিলেটের জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।

পরীক্ষা শেষে নিজ দেশ নেপালে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। কিন্তু তার আগেই নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটে।

জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল আবেদ হোসেন জানান, ওই বিধ্বস্ত বিমানে তাদের ১৩ শিক্ষার্থী ছিলেন। এদের সবারই মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পেয়েছেন তিনি। এদের মধ্যে ১১ জন মেয়ে শিক্ষার্থী ও ২ জন ছেলে শিক্ষার্থী।

আবেদ হোসেন জানান, নিহতরা সবাই ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ করে নিজেদের দেশ নেপালে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। নেপাল পৌঁছার পরই এ দুর্ঘটনার স্বীকার হন তারা।

এদিকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের উপ-পরিচালক ডা. আরমান আহমদ শিপলু।

উল্লেখ্য, ইউএস বাংলার বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। ইউএস বাংলার ওই বিমানে ৬৭ জন যাত্রী এবং ৪জন ক্রু ছিলেন।

পাইলট আবিদকে আহত অবস্থায় উদ্ধার, সহকারী পাইলট প্রিথিলা নিহত

নেপালে দুর্ঘটনার শিকার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের পাইলট ক্যাপ্টেন আবিদকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সহকারী পাইলট প্রিথিলা রশিদ নিহত হয়েছেন।
রাজধানীর বারিধারায় ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রধান কার্যালয় থেকে জানানো হয়, নেপালের কাঠমুন্ডু এয়ারপোর্টের কাছাকাছি বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। বিমানটির ফ্লাইট নম্বর ছিল BS-211।

বেলা ১২টা ৫১মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬৭জন যাত্রী নিয়ে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। বিমানটি দুপুর ২টা ২০মিনিটে বিধ্বস্ত হয়।

ইতোমধ্যে নেপালের ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের কাছে দুর্ঘটনার শিকার ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের যাত্রীদের মৃতদেহের ছবি প্রকাশ করতে শুরু করেছে নেপালি গণমাধ্যম।

সম্পর্কিত সংবাদ

বিধ্বস্ত হবার মুহুর্তে বিমানের জানালা ভেঙ্গে লাফিয়ে প্রাণ বাঁচানো এক ‘ভাগ্যবান’ যাত্রী!

বিধ্বস্ত বিমানে থাকা সব যাত্রীদের তালিকাসহ সর্বশেষ আপডেট 

কেন এ দুর্ঘটনা, খুঁজে বের করার আহ্বান ত্রাণমন্ত্রীর

নেপালের কাঠমুন্ডুতে বিধ্বস্ত বিমানটির যাত্রীদের শতভাগ ইন্স্যুরেন্স করা আছে জানিয়ে দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। এ সময় তিনি বিমানবন্দরের এটিসি টাওয়ারের ভুল, নাকি বাংলাদেশের কোনো ভুলে এ দুর্ঘটনা, তা খুঁজে বের করতে বিমানমন্ত্রীর (এ কে এম শাহজাহান কামাল) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

আজ সন্ধ্যায় রাজধানীর বারিধারায় ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষের সাথে সাক্ষাতের পর মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, যাত্রীদের শতভাগ ইন্স্যুরেন্স করা আছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমার মন্ত্রণালয়ের কাছে যদি ক্ষতিগ্রস্ত বা তার পরিবারের কেউ সহায়তা চান সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।

Leave a Reply