নেপালের পথে বিমানে ওঠার আগে …

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিতি রয়েছে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের। তবুও পাইলটদের উড়োজাহাজ চালিয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়।

হিমালয় পর্বতমালার কারণে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় একটি দেশ নেপাল। তাই প্রতিদিন প্রচুর যাত্রীও আসা-যাওয়া করেন এখানে। পর্বত ছাড়াও প্রায়ই ঘন কুয়াশা ঘিরে ফেলে ত্রিভুবন বিমানবন্দরকে। এ কারণে ফ্লাইট পরিচালনায় বিপত্তিতে পড়তে হয় পাইলটদের। কিন্তু বিমান সংস্থাগুলো লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ এই বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা করে।

ত্রিভুবন বিমানবন্দরের ভৌগোলিক অবস্থা বর্ণনা করে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেছেন, রানওয়ের এক প্রান্তে রয়েছে পাহাড়। ফলে অবতরণের সময় প্রত্যেক বিমানকে খুব সতর্ক হয়ে পাহাড় এড়িয়ে বিমানবন্দরের কাছে পৌঁছাতে হয়। আর তারপরে খুব অল্প সময়ের ভেতর অনেকটা নিচে নেমে আসতে হয় রানওয়েতে পৌঁছাতে। বিমানচালকদের জন্য তা অনেকটাই কষ্টসাধ্য। আবার রানওয়ের বাম দিকে কিছুটা সমতল ভূমি থাকলেও ডান দিকে গভীর খাঁদ। ফলে বিমান যদি পিছলে যায়, তাহলে তা ওই খাদে পড়ে যাওয়ার বড় সম্ভাবনা থাকে।

ত্রিভুবন বিমানবন্দরে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার পর নেপালের বিমান পরিবহন নিরাপত্তা রেকর্ড নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পাহাড়ঘেরা দেশটির দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং উড়োজাহাজ ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগের অভাবে কয়েক বছর ধরে বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই নেপালের পথে উড়োজাহাজে ওঠার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন:

জাতীয় রেকর্ড খারাপ
অ্যাভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্ক ডেটাবেইসের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে নেপালে ২৭টি মারাত্মক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা প্রতিবছর গড়ে একটি। এর মধ্যে শুধু গত এক দশকেই ২০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সাতটি দুর্ঘটনায় ১৮ জনের বেশি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। অবশ্য দেশটির সব এয়ারলাইনস ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমানবন্দরে নামতে পারে না। দেশটির বেশির ভাগ উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ঘটেছে অভ্যন্তরীণ পথে। তবে সবচেয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে একটি মাত্র রানওয়ের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে। ১৯৯২ সালে কাঠমান্ডুর নিকট দুই মাসের ব্যবধানে দুটি উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় ২৮০ জনের বেশি মারা যান।

জটিল ভূখণ্ড
বিমান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালের উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার উচ্চহারের কারণ এর চ্যালেঞ্জিং ভূখণ্ড। নেপালের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৩৩৮ মিটার উঁচু সংকীর্ণ উপত্যকার ওপর অবস্থিত। এতে প্লেন ঘোরাতে খুব কম জায়গা পাওয়া যায়। এ ছাড়া উন্নত রাডার প্রযুক্তির স্বল্পতা আছে, তাই চালককে চোখে দেখে বিমান চালাতে হয়। একে বলা হয় ‘নন-প্রিসিশন ল্যান্ডিং’। এ ছাড়া এখানে রানওয়ে মাত্র একটি। তাই উড়োজাহাজকে নিচে নামার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হয়, যা বর্তমানে জটিল সমস্যা তৈরি করেছে। নেপালের উড়োজাহাজ-চালকেরা বলছেন, বিমানজটে বিমানবন্দরটির বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বিনিয়োগের অভাব
আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ খাতে বাণিজ্যিকভাবে ফ্লাইট বাড়লেও নেপালের বিমান পরিবহন খাতের বিনিয়োগ তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। তিন কোটি মানুষের ছোট এ দেশে ১১টি অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনস রয়েছে। দেশটির প্রধান দুই পর্যটন স্থান পোখারা ও লুম্বিনিতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য বিমানবন্দরের উন্নয়নকাজ বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।

পাহাড়ে অবতরণ
যদিও অধিকাংশ দুর্ঘটনা কাঠমান্ডুর, তবে অধিকাংশ উড়োজাহাজ-চালক জানেন, নেপালের অধিকাংশ বিমানবন্দরে নামা বেশ জটিল হিসাব-নিকাশের বিষয়। লুকলাকে তো বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক বিমানবন্দর বলা হয়। এখানে নামতে চালককে পাহাড়ের সংকীর্ণ প্রবেশপথ পেরিয়ে ৫০০ মিটার দীর্ঘ এক রানওয়েতে নামতে হয়। ২০০৮ সালে লুকলাতে যাত্রীবাহী একটি উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ঘটে, যাতে চালক ছাড়া সব যাত্রী মারা যান। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সিভিল অ্যাভিয়েশন সংস্থার মতে, দেশটির সুন্দর কিন্তু অসমতল ভূখণ্ড উড়োজাহাজ পরিচালনায় নিরাপত্তাকে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের তুলনায় বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।

ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়া
কয়েকজন বিশেষজ্ঞ অভিযোগ করেন, নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ অতীতের তদন্ত প্রতিবেদনগুলোয় যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, তা থেকে শিক্ষা নেয়নি। লামা নামের এক বিমানচালক অভিযোগ করেন, তদন্ত দল তাদের কাজের বিস্তারিত সব সময় জানায় না। এতে এ খাতের লোকজন খুব বেশি শিখতে পারেন না। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু ব্ল্যাকি বলেন, ২০১৬ সালে নেপালের এক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার তদন্তে ছিলেন তিনি। এখানকার সম্পদ কোথায় খরচ হচ্ছে, তা একটি বিষয়। সরকার কোথায় খরচ করবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন। বেশি খরচ করে তদন্ত করা মানে অন্যান্য খাতের অর্থ বরাদ্দে টানাটানি। তথ্যসূত্র: এএফপি।

রবি

Leave a Reply