চাটমোহর ঋষি পল্লীর ১০৫ পরিবারের মধ্যে এসএসসি পাশ মাত্র এক জন !

আব্দুল লতিফ রঞ্জু, পাবনা প্রতিনিধি- যুগ যুগ ধরে পাবনার চাটমোহরের নিমাইচড়া ইউনিয়নের করকোলা গ্রামে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ঋষি সম্প্রদায়ের বসবাস। মুসলমানদের পাশাপাশি এ গ্রামে বর্তমান ঋষি সম্প্রদায়ের ১০৫টি পরিবার বসবাস করছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য গত ৪৭ বছরে লেখাপড়ায় অনগ্রসর এ ঋষি পল্লীর কেউই এসএসসি পাশ করতে পারে নি। এ পল্লীর মৃত খগেন্দ্র নাথ দাস ওরফে খোকা’র ছেলে ক্ষিতিস চন্দ্র দাস (৬৮) সর্ব শেষ ১৯৭০ সালে এস এস সি পাশ করেন। এর পরে আর কেউ এই গ্রাম থেকে এস এস সি পাশ করে নি।

এ পল্লীর এক মাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি ক্ষিতিশ প্রধান জানান, “বৃটিশ আমল থেকে এ গ্রামে ঋষিদের বসবাস। ১৯৭০ সালে আমি মেট্রিক পাশ করি। এর পর আর কেউ মেট্রিক পাশ করে নি। এখন প্রায় সব শিশুই স্কুলে যায়। ফাইভ, সিক্স, সেভেন এসব ক্লাসে পড়ার সময় ঝরে পরছে তারা। ১২-১৩ বছর বয়সে এসে কিশোররা লেখা পড়া বাদ দিয়ে সেলুনের কাজ, জুতার কাজ, বেতের কাজ, দর্জির কাজসহ এরুপ বিভিন্ন কাজে লিপ্ত হচ্ছে। কেউ কেউ দোকান পাটের কর্মচারী হচ্ছে। মেয়েরা মায়েদের সাথে বাঁশের কুটির শিল্পের কাজে লিপ্ত হচ্ছে। মেয়েদের অপেক্ষাকৃত কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, মূলত অভিভাবকদের অসচেতনতা ও অর্থের অভাবে তারা আর পড়ালেখা করছে না। বর্তমান এ পল্লীতে ৬০ থেকে ৭০ জন স্কুল গমনোপযোগী ছেলে মেয়ে রয়েছে। এরা স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মন্দির ভিত্তিক শিশু শিক্ষা কেন্দ্র ও পাশের স্কুল গুলোতে পড়া লেখা করছে। অনেকেই পড়া লেখা শুরু করে কিন্তু কেউই টিকে থাকে না পড়া লেখায়”।
নর সুন্দর পেশায় নিয়োজিত এ পল্লীর নগেন চন্দ্র দাসের ছেলে শ্রীপদ দাস জানান, “নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া লেখা করে এখন চাটমোহর-মান্নাননগর সড়কের কুজোর মোড়ে সেলুন করেছি। আমাদের ছেলে মেয়েরা স্কুলে গেলেও কর্ম করার উপযোগি হলে সবাই কর্মে ঢুকছে। কেউ বেশি পড়া লেখা করছে না। মেয়েদেরকে অপেক্ষাকৃত কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয় অভিভাবকেরা। কিছু মহিলা দর্জির কাজ ও কুটির শিল্পের কাজ করেন। ছেলেদের বেশির ভাগই নর সুন্দর পেশায় সম্পৃক্ত হয়”।

নর সুন্দর পেশায় কর্মরত ষষ্ট শ্রেণী পাশ মানিক চন্দ্র দাস (২৮) বলেন, “এটা আমাদের দূর্ভাগ্য যে আমরা পড়া লেখায় অগ্রসর হতে পারি নি। তাই আমাদের কেউ কোথাও কোন চাকরী বাকরী ও করছে না। বছরের পর বছর আমাদের পূর্ব পুরুষদের মতো আমরা ও পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটছে না”।

অত্যন্ত ঘন বসতি পূর্ণ এলাকা করকোলা ঋষি পল্লী। ৬ বিঘার মতো জমিতে ১শ ৫ পরিবার গাদা গাদি করে বসবাস করছে কোন মতে। পল্লীর প্রায় চার পাশেই খাল। দক্ষিণ পাশে কাঁচা মাটির রাস্তা। রাস্তায় ওঠার জন্য সম্প্রতি পূর্ব উত্তর পাশের খালের উপর স্থানীয় চেয়ারম্যান কালভার্ট করে দিয়েছেন। কেউ এক শতক কেউ দুই শতক এরকম পরিমান জায়গার উপর বাড়ি করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। মাঠে কারো কোন জমা জমি নাই। জমি চাষ করেন না কেউই। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কিছু দিন পূর্বে ঋষি পল্লীর জন্য একটি কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করে দিয়েছেন। এখন কমিউনিটির মিটিং হয় এ সেন্টারে। কমিউনিটি সেন্টারের পাশেই অবস্থিত দক্ষিনেশ্বর কালী মন্দির। এখানেই কালী পূজা, দূর্গা পূজা, মহাদেব পূজা, স্বরস্বতী পূজাসহ অন্যান্য পূজা অর্চণার কাজ সারেন ঋষি পল্লীর নারী পুরুষ। বারুণীর গঙ্গা স্নান অনুষ্ঠিত হয় এ ঋষি পল্লীর একটু দূর দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গার শাখা নদী গুমানীতে।

গঙ্গা স্নানের দিন করকোলা ঋষি পল্লীতে লাগে উৎসবের আমেজ। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পক্ষ থেকে এদের জীবন মান উন্নয়নে কিছু দিন পূর্বে লালন পালনের উদ্দেশ্যে ২০ টি গরু দেয়া হয়। গৃহ নির্মানের জন্য এ পল্লীর ৪৬ জনকে ১৮ হাজার করে টাকা ও দেয়া হয়। বিতরণ করা হয় স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা।

এ ব্যাপারে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরকার অসীম কুমার বলেন, “উপজেলার মধ্যকার একটি ঋষি পল্লী শিক্ষায় এতটা পিছিয়ে রয়েছে বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের সাথে কথা বলে প্রয়োজনে অতিরিক্ত নজরদারী করা হবে। কেন এ পল্লীর শিশুরা লেখা পড়ায় ঝরে পরছে তার কারণ অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিভাবকদের সচেতন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। প্রয়োজনে এ শিশুদের জন্য পৃথক ডাটাবেজ তৈরী করে আলাদা যত্ন নেওয়া হবে।

পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আব্দুস সালাম এ প্রসঙ্গে জানান, “৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের ৫ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। বিষয়টি নিয়ে উক্ত এলাকার প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

সময়ের কণ্ঠস্বর/মহিআ

Leave a Reply