নবীগঞ্জে চাঞ্চল্যকর তন্নী হত্যা মামলার ১৯ মাসেও আসামীর শাস্তি হয়নি, স্বজনরা হতাশ

মতিউর রহমান মুন্না, নবীগঞ্জ প্রতিনিধি- হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ শহরের বহুল আলোচিত কলেজ ছাত্রী তন্নী রায়কে ধর্ষনের পর গলা টিপে হত্যা করে বস্তাবন্দী লাশ নদীতে পেলে দেওয়ার প্রায় এক বছর সাত মাস অতিবাহিত হয়েছে। অপর দিকে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডের এখনো শুরু হয়নি বিচার কার্যক্রম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ কর্তৃক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তর করা হয়েছে।

আলোচিত এই মামলায় ইতোমধ্যে মোট ৩১ জনের মধ্যে ১১ জনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করেছে আদালত। তবে এ মামলার দীর্ঘদিন ধরে বিচারিক কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয়রা সচেতন মহল। এমনকি মামলার অগ্রগতি নিয়ে চরম হতাশায় রয়েছেন নিহতের পরিবার ও স্বজনেরা। হত্যাকান্ডের মূল হোতা ঘাতক রানু রায় কারাগারে রয়েছে। তন্নী হত্যাকান্ডের পর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে একের পর এক আল্টিমেটামের মুখে ঘটনার ২০ দিন পর মামলার প্রধান আসামী ঘাতক রানু রায়কে গ্রেফতার করে হবিগঞ্জ ডিবি পুলিশ। এরপর ২০১৬ইং সালের ১৯ ডিসেম্বর ঘাতক রানু রায়কে এক মাত্র আসামী করে আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করে ডিবি পুলিশ। এমনকি তন্নী হত্যার ময়না তদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে- জোর পূর্বক ধর্ষন করে গলা টিপে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বিগত ২০১৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বেলা দেড়টার দিকে তন্নী রায় নবীগঞ্জ শহরতলীর শেরপুর রোডস্থ ইউকে আইসিটি ইন্সটিটিউট কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বেড় হয়ে আর ফেরেনি। তার নিখোঁজের ঘটনায় নবীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরী করেন তন্নী রায় এর বাবা। সাধারণ ডায়েরী করার ৩ দিনের মাথায় কলেজ ছাত্রী তন্নী রায়ের বস্তাবন্দি লাশ নবীগঞ্জ শহরতলীর একটি নদী থেকে উদ্ধার করে নবীগঞ্জ থানা পুলিশ।

এদিকে তন্নী হত্যা মামলার প্রধান আসামী রানু রায়কে গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবীতে একের পর এক বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন মানববন্ধন করে আসছিল। হত্যাকান্ডের ২০ দিনের মাথায় (৭ অক্টোবর) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হবিগঞ্জ ডিবি পুলিশের ওসি আজমিরুজ্জামানের নেতৃত্বে একদল ডিবি পুলিশ ব্রাম্মণবাড়ীয়ার বাস স্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। পরদিন (৮ অক্টোবর) শনিবার দুপুরে হবিগঞ্জের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিচারক নিশাত সুলতানার আদালতে সে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করে এবং তন্নী হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করে। ওই সময় হত্যার কারণ হিসেবে রানু রায় স্বীকারোক্তিতে বলে- তন্নীর সাথে দীর্ঘদিন ধরে তার প্রেমের সম্পর্ক চলে আসছিল। এর কারণে ১৭ সেপ্টেম্বর শনিবার প্রেমিক রানু রায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে তন্নী কোচিং সেন্টারে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে তার বাড়িতে যায়। যাওয়ার পর তন্নীর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বার্তার এক পর্যায়ে ঝগড়ার সৃষ্টি হয়। এ সময় রানু রায় তন্নীকে হাত দিয়ে জোরে আঘাত করে। এরপর তন্নীর গলায় রানু চেপে ধরলে এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে তন্নী মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে।

অভিযোগ উঠেছিল, তন্নী হত্যাকান্ড রানু একা করতে পারলেও তার লাশকে বেঁধে ৯টা ইটসহ বস্তাবন্দী করে গুম করা একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকান্ডের মামলায় বিজ্ঞ আদালত একের পর এক শুনানী গ্রহন করলেও মামলার কোনো অগ্রগতি দেখতে না পেয়ে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যূনালে মামলার ফাইল হস্তান্তর করার দাবী জানান তন্নীর পরিবার। এদিকে, ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ কর্তৃক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তরের আদেশ দেওয়া হয়। এরই প্রেক্ষিতে গত বছরের ২২ নভেম্বর চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়।

জানা গেছে, এ মামলায় ৩১ জন স্বাক্ষীর মধ্যে ১১ জনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করেন হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আতাব উল্লাহ। অপর দিকে, রানু রায় জামিন লাভের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও সুত্রে জানা গেছে।

নিহত কলেজ ছাত্রী তন্নী রায় এর পিতা বিমল রায় জানান, "আমার মেয়ে তন্নী হত্যা মামলার অগ্রগতি নিয়ে আমি এবং আমার পরিবার হতাশায়। আমরা খুব চিন্তায় আছি, বেচেঁ থাকতে আমার মেয়ের হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যেতে চাই। অভিযোগের সুরে তিনি আরো বলেন, মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিচার ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হলেও এখনো বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।"

তন্নীর ভাই বিভাষ রায় জানান, "আসামী রানুকে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হউক। তাহলেই আমরা ন্যায় বিচার পাব ও তন্নীর আত্মা শান্তিÍ পাবে। বিভাষ রায় আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি ও স্থবিরতার কারণে তার বোনের মতো দেশে অনেক নৃশংসভাবে খুন, ধর্ষন ও নানা অপরাধমূক কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে।

Leave a Reply