বগুড়ায় হাত হারানো শিশু সুমির প্রশ্নের উত্তর দেবে কে?

এম নজরুল ইসলাম, বগুড়া প্রতিনিধি: দেখতে আসলেন না, খবরও নিলেন না, অথচ মন্ত্রী সাহেব সড়ক দুর্ঘটনার দিন হাসপাতালেই ছিলেন। শিশু সুমিকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটাছুটি করেছি, পত্র-পত্রিকায় খবর ছাপা হলো, টিভিতে দেখালো, তবুও খবর নেয়নি স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

জেলার ডিসি সাহেব, পুলিশের এসপি সাহেব, হামাকেরে ডাবলু ভাই এসেছিল। সুমির খোঁজখবর নিয়েছে, চিকিৎসার জন্য টাকাও দিছে। জিয়া মেডিকেলের ডাক্তার স্যারেরা সবসময় খেয়াল রাখছে, হামার সুমি নাকি তারাতারি সুস্থ হয়ে উঠবি।

ব্রাক স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী শিশু সুমি বারবার বলছে, হামার হাত কই, ডাক্তারে হাত খুলে রাকিছে। এখন আমার মেয়ের প্রশ্নের উত্তর দেবে কে? বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন সড়ক দুর্ঘটনায় হাত হারানো ৮বছরের শিশু সুমির মা মরিয়ম বেগম।

বৃহস্পতিবার বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে সুমির প্রশ্নের সম্মুখিন হয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরাও। সুমির মা শোকে পাথর হয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। মেয়ের মাথার পাশে সারাক্ষণ বসে বসে আছেন। ভাবছেন তার আদরের সন্তানটির পরিণতির কথা।

সুমির বাবা দুলাল মিয়ার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা হাসপাতালে দেখা হবার সাথে সাথে তিনিও হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। মেয়ের পরিণতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না তিনি।

তিনি কেঁদে কেঁদে বললেন, আমি ওর কষ্ট ইেখে রাতে ঘুমাতে পারি না। খাবারও পেটে ঢুকে না। কী করব কূল খুঁজে পাছি না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিম স্যার দুর্ঘটনার দিন শেরপুর হাসপাতালেই ছিলেন। আমার মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় শেরপুর হাতপাতালে নিয়ে গেছিলাম। তবুও মন্ত্রী সাহেবের নজরে পড়েনি। আজতক পর্যন্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পক্ষে কেউই শিশু সুমির খবর নেয়নি। 

ডিজিটাল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের বগুড়া জেলা শাখার নেত্রী মাহবুবা পারভীন বলেন, মেয়েটার উন্নত চিকিৎসার জন্য মোটা অংকের টাকার প্রয়োজন। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি তার উন্নত চিকিৎসার জন্য হাত বাড়াতে পারেন। আমাদের দেশে এবং দেশের বাইরে অনেক মানুষ আছেন, যারা সুমির পাশে দাঁড়িয়ে ওর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারেন। সুমির বাবা অনুরোধ করছেন তার মেয়ের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে।

মাহবুবা পারভীন জানান, সুমির মা মানসিকভাবে অনেকটাই বিপর্যস্ত। মানুষের বাসায় কাজ করে থাকেন। ওর বাবারও বয়স হয়েছে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত তিনিও। আগে ভ্যান চালাতেন। এখন সেই কাজও করতে পারে না। সুমির মায়ের কাজের উপরেই ওদের পেটে দুই বেলা খাওয়া চলে। এমন পরিস্থিতিতে সুমিকে নিয়ে তারা ভেঙে পরেছে। কী করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না।

এদিকে, ট্রাকের ধাক্কায় হাত হারানো শিশু সুমিকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বিপিএম। তিনি শিশুটির চিকিৎসার খোঁজ খবর নেন এবং শিশুটির বাবার কাছে নগদ ১৫ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করেন পুলিশ সুপার। এসময় বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মন্ডল বিপিএম বার, আব্দুল জলিল পিপিএম, কুদরতই খুদা শুভ উপস্থিত ছিলেন।

সমাজ সেবার কল্যাণ তহবিল থেকে বগুড়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নুরে আলম সিদ্দিকী শিশুটির চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা ও চিকিৎসার খোঁজ খবর নিতে হাসপাতালে যান। তিনি ঐ শিশুর মায়ের হাতে নগদ ২০ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করেন।

এছাড়া শিশু সুমির চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ডাবলু। সুমিকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান সমবায় ব্যাংক লি: বগুড়ার চেয়ারম্যান যুবনেতা ডাবলু। এসময় বগুড়া প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম বাবু ও জেলা যুবলীগ নেতা সাজেদুর রহমান সিজু উপস্থিত ছিলেন।

জানা গেছে, হাত হারানো ৮ বছরের শিশু কন্যা সুমির চিকিৎসার সকল দায়িত্ব নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সুমির সার্বিক চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকদের নিয়ে একটি টিম করা হয়েছে। তার নিবিড় পরিচর্যা করা হচ্ছে। রক্তের স্বল্পতা থাকলেও সেটি হাসপাতালের চিকিৎকরা স্বেচ্ছায় রক্ত প্রদান করছেন। সুমির অবস্থা আগের থেকে কিছুটা ভাল বলছেন চিকিৎসকরা।

হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাঃ নির্মলেন্দু চৌধুরী বলেন, সুমিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা দেয়া হচ্ছে। তারা বাম হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং ডান হাত ও মাথায় আঘাত পেয়েছে। ডান হাতের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আগামী ৩ সপ্তাহের মধ্যে সুমি সুস্থ হয়ে উঠবে বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, গত ২২ এপ্রিল ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের শেরপুর উপজেলার শেরুয়া বটতলা এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় শিশুটির একটি হাতের অর্ধেক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের অর্থপেডিক ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সে চিকিৎসাধীন রয়েছে। সুমির বাড়ি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ফুলতলা দক্ষিন পাড়া। তার মায়ের নাম মরিয়ম এবং বাবা ভ্যান চালক দুলাল খাঁ।

Leave a Reply