মোবাইল ফোনের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে ল্যান্ড ফোন

জামাল হোসেন বাপ্পা, বাগেরহাট প্রতিনিধি: আজ বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস। এক সময় ঘরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটায় দেখা মিলতো ল্যান্ডফোনের।

লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হত এই ল্যান্ডফোনের লাইন নেওয়ার জন্য। দিন দিন বেড়ে যাওয়া মোবাইলের ফোনের দাপটে ল্যান্ডফোনের দিনগুলো এখন বিস্মৃত প্রায়। তবে কিছু কিছু বাসায় ঘর সাজানোর সামগ্রী হিসেবে দেখা মেলে এই ল্যান্ডফোনের।

কিন্তু আগামী এক দশকের মধ্যে এই ল্যান্ডফোন একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। বাড়িতে বাড়িতে ল্যান্ড ফোনের একটা ঐতিহ্য ছিল কয়েক বছর আগেও। তবে সে ঐতিহ্যে অনেকটাই ভাটা পড়েছে মোবাইল ফোনের জনপ্রিয়তায়।

বাড়িঘরে টেলিফোনে চাহিদা কমার পাশাপাশি কমেছে অফিসপাড়ায়ও। একটা সময় অফিস-আদালতে জরুরি বার্তা আদান-প্রদানে টেলিফোনের ওপর নির্ভশীল ছিলেন কর্মকর্তারা। তবে সেটাও এখন তুলনামূলক কমে গেছে। একটি অফিসের যেকোনো তথ্য আদান-প্রদানে কর্মকর্তারা মোবাইল ফোন ব্যবহারেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

বাংলাদেশে প্রথম মোবাইল ফোন চালু হয় ১৯৯৩ইং সালের এপ্রিল মাসে। হাচিসন বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (এইচবিটিএল) ঢাকা শহরে এএমপিএস মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল ফোন সেবা শুরু করে। ১৯৯৬ইং সালে এটিই সিডিএমএ প্রযুক্তি দিয়ে সিটিসেল নামে কাজ শুরু করে৷ তখন মোবাইল ফোনের সংযোগ এবং কলরেট ছিল আকাশ ছোঁয়া। সিটিসেল গত বছর বন্ধ হয়ে গেছে।

এখন যে পাঁচটি মোবাইল ফোন অপারেটর সক্রিয় আছে, তারা জিএসএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে। সেগুলো হলো: গ্রামীণ ফোন, রবি, এয়ারটেল, বাংলালিংক এবং টেলিটক। টেলিটক রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান। বাকিগুলো বেসরকারি এবং বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে রবি ও এয়ারটেল একীভূত হয়ে রবি হবার কাজ করছে।

বাগেরহাট আদালতের আনছার নামের এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, অফিসে টিএন্ডটির লাইন থাকলেও সেটি এখন খুব একটা ব্যবহার হয় না। আমার সহকর্মী কিংবা কাজের ক্ষেত্রে অন্য সবার সঙ্গে আলাপে এখন মোবাইল ফোনই ব্যবহার করি। ল্যান্ডফোনটা এখন অকেজোই বলা চলে।

কৃষি ব্যাংক বাগেরহাটের শরণখোলার বিসনু প্রসাদ নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকে টেলিফোনের ব্যবহার একেবারেই কমে গেছে। বছর কয়েক আগেও টেলিফোনের ওপর নির্ভর করতো সবাই। কিন্তু এখন মোবাইলেই যাবতীয় যোগাযোগ হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিটি ব্যাংক এখন মোবাইলে ব্যাংকিং সুবিধা দেয়ার কারণে গ্রাহকের সঙ্গে ওভাবেই সমন্বয় করছে। আর আমাদের সঙ্গে প্রধান শাখার কর্মকর্তাদেরও যোগাযোগ মোবাইলেই বেশি হচ্ছে।

বাগেরহাট বিটিসিএল'র এ ই পি মোঃ মনোয়ার হোসেন জানান, বর্তমানে বাগেরহাট জেলায় ১১ টি এক্সেচেঞ্চের আওতায় প্রায় আড়াই হাজার গ্রাহক আছে। এছাড়াও ১৩২টি ইন্টারনেট সংযোগ এবং ১২ লিজ ব্রটব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদান কারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের বেশিরভাগই বিভিন্ন অফিস-আদালতের কাজে ব্যবহার করছেন। বাসাবাড়িতে সংযোগ থাকলেও সেটা সংখ্যায় অনেক কম। শুধু তাই নয়, আগে থেকে ল্যান্ড ফোন সংযোগ বাসায় নেয়া থাকলেও তা ব্যবহার করছেন না এমন গ্রাহকের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

এক কথায় ক্রমেই গ্রাহক হারাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি বিটিসিএল’র ল্যান্ডফোন। হাতে হাতে মোবাইল ফোন আর আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঠিক পেরে উঠছে না এক সময়ের অতি প্রয়োজনীয় এই সেবা সংস্থাটি।

বিটিসিএল-এ কর্মকর্তা আরো জানান, ল্যান্ডফোনে গ্রাহক আগ্রহ বাড়াতে বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতের বিটিসিএল খুব শীগ্রই একটি সেবা নিয়ে গ্রাহদের কাছে আসছে যাতে থাকবে ব্রটব্যান্ড ইন্টারনেট, ওনলাইন টিভিসহ আরো অনেক কিছু।

এই উপমহাদেশে ১৮৫৩ইং সালে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ল্যান্ড ফোনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭১ইং সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বিভাগ। ১৯৭৬ইং সালে এ বিভাগটিকে একটি কর্পোরেট সংস্থায় রূপান্তরের পর, ১৯৭৯ইং সালে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বিভাগকে পুনর্গঠন করে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বোর্ড (বিটিটিবি)।

এরপর তারা দেশ ব্যাপী বাণিজ্যিক ভিত্তিতে টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদান শুরু করে। ২০০১ইং সালে টেলিযোগাযোগ আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) নামে আলাদা একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে টেলিযোগাযোগ খাতের নীতি নির্ধারণ ও তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়।

এরপর ২০০৮ইং সালে বিটিটিবিকে লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করে এর নতুন নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। বেসরকারি খাতেও ল্যান্ড ফোনের সেবা বিস্তৃত করা হয়। পাবলিক সুইচড টেলিফোন নেটওয়ার্ক (পিএসটিএন) নামের এক ধরনের ফোন কোম্পানির সংখ্যা বিটিসিএলসহ মোট আটটি।

এখন চাইলেই ল্যান্ড ফোনের কানেকশন পাওয়া যায়। বিলও অনেক কম। অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল, ন্যাশনওয়াইড ডায়ালিং, সারা দেশে একই কলরেট, তারপরও সাধারণ মানুষ মোবাইলের জনপ্রিয়তার কারণে এর প্রতি আর আগের মতো আগ্রহী নন।