সৌদি আরবে গৃহকর্তা কতৃক ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার ৯ নারীর মধ্যে ৫ জন ফিরলেন দেশে

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক-
জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে গিয়ে গৃহকর্তা কতৃক ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার অসংখ্য নারীর আর্তনাদের খবর এখন নিত্যকার গল্প। এদের অনেকেই আটকে আছেন অমানবিক নির্যাতনের মধ্যেই, অনেকের গল্প অপ্রকাশিত।

সম্প্রতি এমনি উদ্ধার হওয়া নয়জন নারীর মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশী নির্যাতিত হওয়া নারী শ্রমিকদের পাঁচজন দেশে পৌঁছেছেন। গতকাল শুক্রবার রাতে তাদের বহনকারী ফ্লাইট শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড হেলথ ফাউন্ডেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাংবাদিক সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি।

এর আগে, বৃহস্পতিবার রাতে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) সারওয়ার আলম জানিয়েছিলেন, তাদের ক্যাম্পে থাকা ৯ নারীকেই তিন থেকে চার দিনের মধ্যে বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব হবে।

সৌদি আরব এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০ হাজারের মতো নারী গৃহকর্মী নিয়েছে৷ এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বা ৪০ হাজার নারী গৃহকর্মীকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে৷ নিয়োগকারীরা কারণ হিসেবে তাদের কাজে অনীহার কথা বললেও একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে, ‘‘বাংলাদেশি গৃহকর্মীদের কাজে অনীহার কারণ ভিন্ন৷ তাঁরা নির্যাতনের শিকার এবং তাঁদের বেতনও খুব কম দেয়া হয়৷”

ফিরে আসা পাঁচ নারী শ্রমিক হচ্ছেন- ঢাকার লালবাগের সুমাইয়া কাজল, মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর পিংকি, ময়মনসিংহের ফুলপুরের মাজেদা, ভোলার রিনা ও নওগাঁর সুখী।সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসা বাংলাদেশি ঐ গৃহকর্মীরা বিমানবন্দরে তাঁদের নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন৷

মানবাধিকারকর্মী সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি জানান, গতকাল রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের EK584 নম্বর ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন নির্যাতনের শিকার নারীদের ৫ জন। এদের সবাইকে নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে।

গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব যাওয়া ওই নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের দাম্মামের খোবার এলাকার একটি ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়। গত আড়াই মাসে এভাবে ৯ নারী ওই ক্যাম্পে আশ্রয় পান।

সম্পর্কিত সংবাদ থেকে আরও পড়ুন

গৃহকর্তার কাছ থেকে নানা দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের শিকার হওয়া৷

কেবল বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীরাই নয়, সৌদি নাগরিকদের বিরুদ্ধে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ অন্য দেশগুলোও করেছে৷ ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীর ওপর যৌন নির্যাতনের একটি খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিন্দার ঝড় তুলেছিল৷ সেবার গৃহকর্মীর ওপর যৌন নির্যাতন চালাতে গিয়ে স্ত্রীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়েন এক সৌদি নাগরিক৷ স্বামীর আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে সেই নারী ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন৷

একই বছর এক ভারতীয় গৃহকর্মী তার কাজ থেকে মুক্তি চাইলে গৃহকর্তা তার ওপর হামলে পড়েন৷ কেবল তাই নয়, ক্ষুব্ধ হয়ে গৃহকর্তা একটি ছুরি দিয়ে ওই গৃহকর্মীর হাত কেটে ফেলেন৷

সৌদি আরবে বাংলাদেশি গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে তোলপাড়

সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসা বাংলাদেশি এক নারী গৃহকর্মীর ভিডিও নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে৷ ওই গৃহকর্মী ফেরার পথে রিয়াদ বিমানবন্দরে তাঁকে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন৷ বাংলাদেশ বিষয়টির তদন্ত করছে৷

ভাইরাল হওয়া ওই ইউটিউব ভিডিওর তথ্য অনুযায়ী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে৷ তাতে বলা হয়েছে, সাত মাস আগে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে গিয়ে নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশি এক নারী৷ মঙ্গলবার রিয়াদ বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে বসে এক আরবকে ওই নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি৷ তাঁর বক্তব্য ভিডিও করেছেন ওই আরব৷

ভিডিওতে ওই নারীর এক হাতে ক্ষতচিহ্ন, আরেক হাতে গোটা গোটা ফোস্কা দেখা যায়৷ এক প্রশ্নের জবাবে ওই নারী বলেন, সৌদি আরবে কাজে আসার পর প্রতিদিন তাকে ছয় থেকে সাতবার গরম কিছু দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হত৷ ওই ছ্যাঁকাতেই হাতে ফোস্কা হয়েছে৷

কেন নির্যাতন করা হত জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কারও সাথে, বিশেষ করে স্বামীর সাথে কথা বলতে চাইলে মালিক দিত না৷ দেশে ফিরতে চাইলে নির্যাতন করা হত৷ এভাবে নির্যাতনের পর সৌদি মালিক তাঁকে বিমানবন্দরে রেখে চলে যায়৷ ওই নারী বলেন, এই কয় মাসে তাঁকে কোনো বেতন দেওয়া হয়নি৷ কিন্তু বিমানবন্দরে রেখে যাওয়ার সময় বেতন নিয়েছেন মর্মে স্বাক্ষর নিয়ে গেছেন মালিক৷ ভিসা ও পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, নির্যাতিত ওই বাংলাদেশি নারীর বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়৷ তিনি গত ২২ জানুয়ারি সৌদি আরব যান৷ সৌদিতে তার নিয়োগকর্তা আজিজা নাশহাত মোহাম্মদ আলী কাকা৷

এই বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর সরওয়ার আলম   বলেন, ‘‘আমরা ওই নারীকে নির্যাতনের ভিডিও সম্পর্কে জেনে তদন্ত শুরু করেছি৷ আমরা বাংলাদেশ এবং সৌদি আরব দু’জায়গায়ই যোগাযোগ করেছি৷ আমরা এখন ওই নারী গৃহকর্মীর বক্তব্য গ্রহণ করব৷”

তিনি বলেন, ‘‘তিনি এখন বাংলাদেশেই তাঁর গ্রামের বাড়িতে আছেন৷ তাঁর বক্তব্য নেয়া হচ্ছে৷ আর আমরা সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি৷”

সৌদি আরবে বাংলাদেশি গৃহকর্মী নির্যাতনের আরো অভিযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা কিছু অভিযোগ এর আগেও পেয়েছি৷” তিনি জানান,  ‘‘নির্যাতিত ওই নারীর নাম সালমা৷ তিনি গ্রামে ফিরে আসার পর তাঁকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ তাঁর শরীরে নির্মম নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে৷ তিনি শুধু বলেছেন আমার ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তা বললে আপনারা স্তব্ধ হয়ে যাবেন৷”