SOMOYERKONTHOSOR

কলাপাড়ায় খাল দখলদারের তালিকা করেও থামানো যাচ্ছেনা দখল তান্ডব!

জাহিদ রিপন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, পটুয়াখালী ::  পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় কোন কিছুতেই থামছেনা খাল দখল তান্ডব। উপজেলা প্রশাসন খাল দখল করে দেয়া বাঁধ অপসারনে মাইকিংসহ ইউনিয়নে মতবিনিময় সভা করেছে। তারপরও দখলদারিত্ব চলছে। ফলে কৃষিকাজের ভবিষ্যত প্রতিকূল পরিবেশ ঠেকাতে ভূমিসহ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগ চরমভাবে ব্যাহতের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সবজির চাষের সুখ্যাতি রয়েছে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের। যেখানকার কৃষকের উৎপাদিত সবজি কলাপাড়ার গোটা উপজেলার চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি যোগান আসে ওই ইউনিয়ন থেকে। যেখানে রয়েছে পেশাদার ধানসহ সবজির আবাদ করা অন্তত ১২ শ’ চাষী। এরা ১২ মাস কোন না কোন ফসল উৎপাদন করে আসছেন। অথচ ওই ইউনিয়নের কাছারি খাল, সুলতানগঞ্জ খাল, কামিনদ্দিনের খাল, পাখিমারা খাল, টুঙ্গিবাড়িয়া খাল, বাহের খাল, পকিয়ার খাল, তাহেরপুর খাল, বেভাজিয়া খাল, সাপুরিয়া খালসহ ১৮টি খালে অবৈধভাবে বাঁধ ও বন্দোবস্ত নিয়ে মাছ চাষ, পুকুর, বসতঘর নির্মাণ করে যে যার মতো করে দখল করে আছে।

সরকারি খাল উদ্ধার করতে এবং কৃষিকাজের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ১৯ মে কৃষক, দখলদার, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সমন্বয়ে ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. তানভীর রহমান জানান, স্বেচ্ছায় সরকারি খালের বাঁধ কেটে দেয়া না হলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। ওই সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি মো. সুলতান মাহমুদ, সাধারান সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা এসএম রাকিবুল আহসান, কলাপাড়া থানার ওসি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন প্রমূখ। খাল উদ্ধারে ইতোমধ্যে উপজেলা ভূমি প্রশাসন প্রত্যেক তহশিলের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তাদের খালের দখলদারদের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
মহিপুর তহশিলসুত্রে জানা গেছে তাঁদের আওতাধীন খাল দখলদারের অন্তত দেড় শ’ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি চলছে। কলাপাড়া উপজেলা ভূমি প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে, চারটি তহশিলে খাল দখলদারদের ৯০ ভাগ তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। বাদুরতলী এলাকার স্লুইসখালের ২২টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। কলাপাড়া পৌরশহরের মধ্যদিয়ে বহমান খালের দুইদিকের দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সার্ভেয়ার আনছার উদ্দিন নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু দখলদাররা যেন কোন কিছুতেই দমছেনা। তারাও পুরোদমে খালে বাঁধ দিয়ে যে যার মতো ভরাট করে জমি কিংবা বাড়িঘর থেকে শুরু করে মাছের ঘের তৈরি করছে।

মিঠাগঞ্জের তেগাছিয়া, গোলবুনিয়া, ইসলামপুর, চরপাড়া, মধুখালী, আজিমদ্দিন, ময়ুরের খাল, আবগঞ্জের খালসহ অন্তত ১৫টি খালে দখলদারদের দখল তান্ডবে এখন কৃষিকাজে চরম প্রতিবন্ধকতার হচ্ছে। নীলগঞ্জের প্রশিক্ষিত চাষী সরোয়ার হোসেন জানান, সাপুড়িয়ার খালটি তাদের কৃষিকাজের জন্য মিঠাপানির আধার। কিন্তু ওই খালটিতে ৭/৮টি বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ আটকে দেয়ায় এবছর বোরোর আবাদে চরম বিপদ নেমে এসেছে। সেচ সঙ্কটে ব্যাপক ক্ষতি হয় বোরোর আবাদে। ধুলাসার ইউনিয়নের কাছারি খালে শুকনো মৌসুমে পানি থাকে। অথচ এ খালে বহু আগে চাষযোগ্য কৃষিজমি দেখিয়ে বন্দোবস্ত দেয়ায় এখন চলছে দখল তান্ডব।

শহরের চিঙ্গরিয়ায় হয়েছে দিনে-দুপুরে ডাকাতির মতো অবস্থা। এখনও ওই খালে তিন/চার ফুট পানি। আশির দশকে নৌকা চলাচল করত। অথচ ওই খালকে চাষযোগ্য কৃষি জমি দেখিয়ে দেয়া হয়েছে বন্দোবস্ত। বন্দোবস্ত গ্রহীতা আবার এখন বাঁধ দিয়ে খালটিকে পকেট সাইজ করে বিক্রি করে কোটি টাকার বাণিজ্যে নেমেছে। এ বন্দোবস্ত কেসটি অনেক আগেই উপজেলা বন্দোবস্ত কমিটি বাতিল করে দেয়। জরুরি প্রয়োজনের এ খালটি উদ্ধারে ভূমি প্রশাসন আন্তরিক নয় বলে পৌরবাসীর এন্তার অভিযোগ। তারা এখালটি উদ্ধারে অতি সম্প্রতি মানববন্ধন করেছেন।

এভাবে খাল দখল দৌরাত্মের কারনে এখন কলাপাড়া-কুয়াকাটা পৌরশহরের বসবাস উপযোগিতা হারাচ্ছে মানুষ। কারণ বর্ষায় প্রচন্ড জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এক নম্বর ওয়ার্ডের মদিনাবাগ এলাকার নাচনাপাড়া চৌরাস্তা সংলগ্ন অন্তত ৫০ বাসিন্দা দুই চারদিন আগের বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে। শুধুমাত্র পানি চলাচলের খাল বন্ধ করে স্থাপনা তোলায় এ অবস্থার শিকার তারা। একই দশা চিঙ্গরিয়ার মানুষের। খাল দখলের এখন তান্ডবে কলাপাড়ার অধিকাংশ মানুষ বসবাসের পরিবেশ পর্যন্ত হারিয়ে ফেলছেন জলাবদ্ধতার কারণে।

সরকারি খাল যে কোন মূল্যে উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার দৃঢ় মনোভাব পোষন করে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. তানভীর রহমান জানান, উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব ঠেকাতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।