‘পার্কিং স্পেস ব্যবহার হয় অন্য কাজে গাড়ি থাকে রাস্তায়’: বাড়ছে যানজট, নগরবাসীর দুর্ভোগ

সময়ের কণ্ঠস্বর: মার্কেটের বেজমেন্ট পার্কিংয়ের জন্য সংরক্ষিত থাকার কথা। যাতে ক্রেতারা সেখানে গাড়ি রেখে কেনাকাটা করতে পারেন। কিন্তু সেখানে তৈরি করা হয়েছে দোকানপাট। এমনকি ওঠানামার জন্য এস্কেলেটর, লিফট, টয়লেটের স্থানেও দোকান বানিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্রেতারা রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে এখন মার্কেটে ঢুকছেন। আর এতে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।

ঢাকা মহানগরীতে এ রকম ১৯৮টি বহুতল মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হোটেল, ব্যাংক-বীমা ভবন রয়েছে, যেগুলোর কারণে ওই এলাকায় কখনোই যানজট কমে না।

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলালের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, এ কথা সত্য- বেশ কয়েকটি মার্কেটের পার্কিং স্পেসে অস্থায়ী দোকান বানিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এগুলো উচ্ছেদ করা চ্যালেঞ্জিং বিষয়। আবার বরাদ্দ দেওয়ার কারণে অনেকে মামলাও করে বসেন। তবে এর একটা সমাধান হওয়া প্রয়োজন। সেই সমাধানটা খুঁজে বের করতে হবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ প্রথমে যানজটের জন্য দায়ী ভবনগুলো চিহ্নিত করার কাজ করে। পরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যাচাই-বাছাই করে দেখতে পায়, ১৯৮টি ভবনে পার্কিং স্পেস থাকার কথা থাকলেও তা নেই। এগুলো প্রধান সড়ক ঘেঁষে হওয়ায় যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খায় ট্রাফিক পুলিশ। ডিএমপির পক্ষ থেকে এসব ভবনের পার্কিং স্পেসের অনুমোদনহীন অবকাঠামোগুলো অপসারণের জন্য রাজউককে বারবার অনুরোধ করা হয়। পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট ভবন মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও দাবি করে তারা।

রাজউকের বোর্ড সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) আবুল কালাম আজাদ বলেন, পার্কিং স্পেসকে অন্য কাজে ব্যবহার করে তারা অন্যায় করছে। এমনকি সামনে সাইনবোর্ড টানিয়ে আগত অতিথিদের গাড়ি রাস্তায় রাখার কথা বলছে। তিনি জানান, উত্তরা, গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডি ও মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিছু পার্কিং উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পরই সেগুলো আবার আগের রূপ পায়। রাজউকের পরিচালক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওয়ালিউর রহমান বলেন, নকশাবহির্ভূত অংশ মজবুত করে তৈরি করায় সেগুলো ভেঙে দেওয়াও কষ্টসাধ্য। তাছাড়া রাজউকে জনবলেরও অভাব। অনেক সময় পুলিশও পাওয়া যায় না। আবার ভবন মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় অভিযানকালে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। তারপরও কিছু এলাকায় বেশ কিছু ভবনের পার্কি স্পেসের দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙা হয়েছে।

তিনি বলেন, যেগুলো ভাঙা হয়েছে, সেগুলো ভাঙা নিয়েও সমস্যা হয়েছে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনা ভাঙার খরচ ভবন মালিককে বহন করতে হয়। ভেঙে দেওয়ার পর সেই অর্থ তারা দেয়নি। তখন বলে- ভেঙে তো দিয়েছেনই, তাহলে টাকা দেব কেন। এ নিয়ে বেশ কিছু ভবন ভাঙার ব্যাপারে অডিট আপত্তি উঠেছে। এ নিয়ে এখন রাজউকও সমস্যায় আছে।

সরেজমিন দেখা যায়, ৯২ নিউ এলিফ্যান্ট রোডের সানরাইজ শপিং সেন্টারের সামনের রাস্তায় গাড়ি পার্ক করেই লোকজন ঢুকে যায় কেনাকাটায়। এলোমেলো পার্কিংয়ের কারণে রাস্তা সংকুচিত হয়ে লেগে যায় যানজট। সকাল থেকে রাত অবধি চলে একই চিত্র। আর্থিক লাভের আশায় অর্ধশতাধিক দোকান বানিয়ে ভাড়া দিয়েছেন মালিক। চশমা, ঘড়ি ও পোশাকের দোকানসমৃদ্ধ মার্কেটটি সর্বক্ষণ জমজমাট থাকে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজউক অভিযান চালিয়ে সেখানকার কয়েকটি দোকান অপসারণ করেছিল। পরে সেগুলো মেরামত করে আবার চালু করা হয়েছে। পাঁচতলার নকশার আড়ালে নির্মাণ করা হয়েছে সাততলা ভবন।

সরেজমিন দেখা গেছে, দোকান, অফিস, শোরুম, ব্যাংক, বাবুর্চিখানা, মালিকের অফিস, স্টোররুম, আবাসিক কক্ষ প্রভৃতি কাজে ব্যবহার হচ্ছে এসব ভবনের পার্কিং স্পেস। মিরপুরের ২৮২/১ মাজার রোডের আলমাস টাওয়ারের পার্কিং স্পেস ব্যবহূত হচ্ছে লন্ড্রি দোকান ও স্টোর হিসেবে। ৮ নম্বর শেওড়াপাড়ার বেজমেন্ট ব্যবহূত হচ্ছে ফার্নিচারের গোডাউন হিসেবে। ২৩২/২৩৪, মীর শওকত আলী সড়কের পূর্বাচল ভবনের নিচতলায় করা হয়েছে রডের শোরুম। ৪৮, মহাখালীর স্কয়ার সেন্টারের নিচতলা ব্যবহূত হচ্ছে স্টোর হিসেবে। উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের এইচএম প্লাজার বেজমেন্ট ব্যবহার হচ্ছে মার্কেট হিসেবে।

রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, রাজধানীতে রাজউকের নকশা অমান্যকারী ভবনের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। এর মধ্যে শ’দুয়েকের কারণে ওইসব এলাকায় ভয়াবহ যানজট হচ্ছে। এ জন্য অবৈধ অংশ উচ্ছেদ অভিযান চলছে। এটা অব্যাহত থাকবে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল করিম বলেন, অনেক ভবনে পার্কিং স্পেস থাকলেও সেটা ব্যবহার হয় অন্য কাজে। অথচ ভবনগুলোর পার্কিং স্পেস থাকলে রাজধানীর যানজট অনেকটা কমে যেত। তারপরও ট্রাফিক পুলিশরা ওইসব এলাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখছেন।

যানজট তৈরি করছে যেসব ভবন মতিঝিল জোন : মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার আদমজী কোর্ট, সোনালী ব্যাংক হেড অফিস, বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন, জনতা ব্যাংক হেড অফিস, পূবালী ব্যাংক হেড অফিস, অগ্রণী ব্যাংক হেড অফিস, উত্তরা ব্যাংক, আমিন কোর্ট, করিম চেম্বার, টয়োটা বিল্ডিং, স্টক এক্সচেঞ্জ, এজাজ চেম্বার, সিটি ব্যাংক, দিলকুশার এশিয়া টাওয়ার, ঢাকা ব্যাংক হেড অফিস, সিটি ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক হেড অফিস, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, জীবন বীমা ভবন, জনতা ইন্স্যুরেন্স, ফকিরাপুলের শতাব্দী টাওয়ার, শান্তিনগরের এমএল ভিলেজ।

সূত্রাপুর জোন :হাটখোলা রোডের সালাহউদ্দিন ভবন, রাসেল সেন্টার, নজরুল ইসলাম রোডের নবারূণা ভবন, শুভেচ্ছা প্লাজা, মামুন প্লাজা, রামকৃষ্ণ মিশন রোডের মোতালেব ম্যানশন, টিকাটুলীর ইত্তেফাক ভবন ও ইনকিলাব ভবন।

সবুজবাগ জোন :অতীশ দীপঙ্কর রোডের বেঙ্গল নিটেক্স, মমতাজ মেমোরিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আপডেট ডেন্টাল কলেজ, হোটেল যামিনী, কমলাপুর উচ্চ বিদ্যালয়, উত্তর মুগদার ম্যাপস ডায়াগনস্টিক সেন্টার, খিলগাঁও রেলগেটের নাহার টাওয়ার, নিলয় টাওয়ার, মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার মালিবাগ সুপার মার্কেট, ডিআইটি রোডের চৌধুরী ফ্যাশন, ড্রাগন টাওয়ার, গ্রিন টাওয়ার, ডিআইটি রোড মার্কেট, ৪৭৫ নম্বর হোল্ডিং, পশ্চিম হাজীপাড়ার আশরাফ ফ্যাশন, ওনার্স অ্যাপারেলস, ৫৮ ও ৬৭ নম্বর হোল্ডিং, পশ্চিম রামপুরার আলম হাইটস, অগ্রণী অ্যাপারেলস, মোল্লা টাওয়ার, পূর্ব রামপুরার আলতাফ টাওয়ার, আম্বিয়া পয়েন্ট, আলাউদ্দিন টাওয়ার, হোটেল জোনাকী, মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার চাঁদ প্লাজা, হোটেল মিরাজ, ৬৯/বি ও ১১০১ নম্বর হোল্ডিং।

মিরপুর জোন :২৮২/১ মাজার রোডের আলমাস টাওয়ার, মিরপুর ১-এর মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্স, রবিউল প্লাজা, বাগদাদ শপিং কমপ্লেক্স, প্রিন্স বাজার অ্যান্ড প্রিন্স, বাটাবাজার প্রিন্স ফাস্টফুড, মুক্তি প্লাজা, মুক্তিযোদ্ধা হক প্লাজা, ইসলাম প্লাজা, সুইডেন প্লাজা ও মিরপুর ১-এর ৯ নম্বর প্লটের বহুতল মার্কেট।

পল্লবী জোন :সেনপাড়া পর্বতার লিমো শো রুম ও গার্মেন্ট, শেওড়াপাড়ার হাতিল ফার্নিচার শোরুম, মিন টাওয়ার, কাজীপাড়ার প্রবাল কমিউনিটি সেন্টার, বেগম রোকেয়া সরণির আইএফআই টাওয়ার, মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের উপমা প্লাজা, কারী ফ্যামিলি শপিং মল, মিরপুর ১১ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের পাটোয়ারী টাওয়ার, পূরবী সিনেমা হলের পাশের সরত ম্যানশন, মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের মিরপুর ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

ধানমণ্ডি জোন :এলিফ্যান্ট রোডের হাজী জয়নাল ভবন, জহির এসি মার্কেট, ডা. তুহিন মল্লিক মার্কেট, আমেনা ম্যানশন, মিনিতা প্লাজা, মনসুর ভবন, হোটেল ডি আমাজান, সানরাইজ ভবন, গফুর ম্যানশন, জাহানারা ভবন, বাটাবাজার, খায়রুন নেসা ম্যানসন, লেক সার্কাস কলাবাগানের জোবাইদা সুপার মার্কেট, লেকভিউ সুপার মার্কেট, ব্রাদার্স ম্যানশন, মিরপুর রোডের কসবা সেন্টার, বদরুদ্দোজা সুপার মার্কেট, হকার্স মার্কেট, নূরজাহান সুপার মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, চাঁদনী চক মার্কেট, রাফিন প্লাজা, বাকুশাহ মার্কেট, চন্দ্রিমা মার্কেট, ফাতেমা আর্কেড, ধানমণ্ডি প্লাজা, নিউ মার্কেট, পুরাতন এলিফ্যান্ড রোডের চিশতিয়া মার্কেট, গ্রিন রোডের মাওলা বিল্ডিং, পান্থপথের এসএস চিলি চায়নিজ, সাতমসজিদ রোডের জিয়াজিন চায়নিজ, এশিয়া প্যাসিফিক ইঞ্জিনিয়ারিং, স্টার কাবাব, ৯৯ নম্বর হোল্ডিং, আলমাস শপিং মল, উৎসব রেস্তোরাঁ।

রমনা জোন :গুলিস্তানের পীর ইয়েমেনী মার্কেট, রমনা ভবন, সিদ্ধেশ্বরীর মৌচাক মার্কেট, আনারকলি মার্কেট।

কোতোয়ালি জোন :ফুলবাড়িয়ার সুন্দরবন স্কয়ার, আমিন সুপার মার্কেট, বায়তুস সামির ইন্টারন্যাশনাল হোটেল, ইসলামপুরের জাহাঙ্গীর টাওয়ার, সদরঘাটের গেটওয়ান সুপার মার্কেট, সুলতানা সুপার মার্কেট।

মহাখালী জোন :মীর শওকত সড়কের পূর্বাচল, তেজগাঁওয়ের গ্রেটওয়াল, এজি টাওয়ার, হক টাওয়ার ও ২০৪/বি, ১৯৯, ১৯০, ১৮৭/১৮৮/বি নম্বর হোল্ডিং, মহাখালীর মো. সাহাবউদ্দিন ম্যানশন, মোহাম্মদ আলী মোল্লাহ, হাজী আনোয়ার হোসেন, মহিউদ্দিন আহমেদ, নূর মোহাম্মদ, মো. সুলতান, মো. জাহাঙ্গীর খান, জয়নাল হাজী, খন্দকার আবুল কাশেম, তবারক হোসেনের ভবন, বনানীর আমান উল্লাহ, মো. সাখাওয়াত উল্লাহ, আতিকুল্লাহ, আব্বাস উল্লাহর ভবন, বনানীর মো. সিকদার হোসেনের ভবন।

গুলশান জোন :গুলশান-১-এর গুলশান শপিং সেন্টার, মহাখালীর হাজী সুপার মার্কেট, এমবল ভবন, রহমান ভবন, কলম্বিয়া সুপার মার্কেট, স্কয়ার সেন্টার ও সিস্টিক টাওয়ার।

বাড্ডা জোন :শাহজাদপুরের জামালপুর টাওয়ার, কনফিডেন্স সেন্টার, সুবাস্তু নজরভ্যালি, ট্রপিক্যাল হোমস, উইন্ড উইন্ড পেইন্ট, উত্তর বাড্ডার ফুজি টাওয়ার, আজ হাইটস, মধ্য বাড্ডার হাকিম টাওয়ার, ব্যাংক অব এশিয়া, ব্যাপারী কনফিগার টাওয়ার, প্রাণ আরএফএল সেন্টার, শমসের গ্রুপ প্রাইভেট লিমিটেড, কাজী শপিং সেন্টার, হাকিম প্লাজা ও ভূতের আড্ডা চায়নিজ রেস্টুরেন্ট।

উত্তরা জোন :৭ নম্বর সেক্টরের বিএনএস সেন্টার, সাঈদ গ্র্যান্ড সেন্টার, মমতাজ মহল পার্টি সেন্টার ও রেস্টুরেন্ট, ৯ নম্বর সেক্টরের হাইজ অ্যান্ড হাইয়ার, চ্যাম ফায়ার রেস্টুরেন্ট, ব্ল্যাক রোজ হোটেল ইন্টারন্যাশনাল, ৬ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ৪ নম্বর ভবন, ৩ নম্বর সেক্টরের সিঙ্গাপুর প্লাজা, আলাউদ্দিন টাওয়ার, এইচএম প্লাজা, বেইলি কমপ্লেক্স, কুশল সেন্টার, লন্ডন প্লাজা, এএইচ টাওয়ার, এবি সুপার মার্কেট, আমির কমপ্লেক্স, ৪ নম্বর সেক্টরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, এপেক্স গ্যালারি, এ কে টাওয়ার ও সি সেল টাওয়ার।