ইতালিতে নতুন সরকারঃ আতঙ্কে অভিবাসীরা

ইসমাইল হোসেন স্বপন. ইতালি প্রতিনিধি :সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিয়ো বেরলুসকোনি কে বাদ দিয়েই অবশেষে ইতালিতে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠন করা হয়েছে। সাবেক প্রফেসর সিনোর যুজেপ্পে কোনতের নেতৃত্বে নবগঠিত মন্ত্রী পরিষদে সংস্কারবাদী দল মুভিমেন্তি চিয়কুয়ে স্তেল্লে বা ফাইভ স্টার মুভমেন্টের তরুণ নেতা লুইজি দি মাইয়ো কে কর্মসংস্থান ও সমাজ উন্নয়ন মন্ত্রী এবং কট্টর জাতীয়তাবাদী দল লেগা নর্দ বা নর্দান লীগ নেতা মাত্তেয়ো সালভিনিকে স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে চলমান দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক সংকট নিরশন হলো বলে ধারনা করা হচ্ছে।

গত মার্চ মাসের ৪ তারিখে ইতালির জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় ভাষায় গোভেরনো তেকনিকো বা অন্তবর্তী সরকারের অধিনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংস্কারবাদী দল মুভিমেন্তি চিংকুয়ে স্তেল্লে একক ভাবে পায় ৩২ শতাংশ ভোট। ডান জোট ৩৮ শতাংশ এবং সদ্য ক্ষমতা ছাড়া বাম জোট পায় মাত্র ২৩ শতাংশ ভোট। যার ফলে কোন দল বা জোট একক ভাবে সরকার গঠন করার যোগ্যতা হারায়।

এ সময়ে একক ভাবে ৩২ শতাংশ ভোট পাওয়া দল মুভিমেন্তি চিংকুয়ে স্তেল্লে যৌথ সরকার গঠনের প্রস্তাব দেয় ২৩ শতাংশ ভোট পাওয়া বাম জোটকে। কিন্তু সদ্য ক্ষমতা হারানো বাম জোট নেতা মাত্তেয়ো রেনসি জানিয়ে দেন তার দল বা জোট যৌথ সরকার গঠনের পরিবর্তে বিরোধী দলে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করবে।

এর পর শুরু হয় ডান জোটের সাথে চিংকুয়ে স্তেল্লের যৌথ সরকার গঠন প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে চিংকুয়ে স্তেল্লে নেতা লুইজি দি মাইয়ো শর্ত জুড়ে দেন, ডান জোট নেতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিয়ো বেরলুসকোনি কে বাদ দিলেই শুধুমাত্র ডান জোটের সাথে তাদের যৌথ সরকার হতে পারে। দি মাইয়োর এ শর্তে নিজেদের গররাজি জানিয়ে দেন ডান জোটের অন্যতম নেতা মাত্তেয়ো সালভিনি। তিনি বলেন, সিলভিয়ো বেরলুসকোনি আমাদের জোটের প্রধান নেতা, তাকে বাদ দিয়ে কোনো যৌথ সরকার হতে পারে না।

অপর দিকে চিংকুয়ে স্তেল্লে তাদের শর্তে অনড় থাকে। দি মাইয়ো বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিয়ো বেরলুসকোনি আদালত কর্তৃক সাজা প্রাপ্ত দূর্নীতিবাজ। তাকে নিয়ে নতুন কোনো সরকার গঠন হতে পারে না। এ নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আকারে রাজনৈতিক বাদানুবাদ। এক পর্যায়ে এগিয়ে আসেন কাপো দেল্লা স্তাতো বা রাষ্ট্রপতি সিনোর সেরজো মাত্তারেল্লা। তিনি উভয় দলকে নিয়ে দফায় দফায় সংলাপ করেও তাদের অবস্থান থেকে টলাতে ব্যর্থ হয়ে ঘোষনা দেন- দেশ বাধ্য হয়ে নতুন একটি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্টের এ ঘোষনার পর নড়েচড়ে বসে সকল রাজনৈতিক দল। বর্ষীয়ান রাজনীতিকরা মনে করেন, নতুন একটা নির্বাচনী খরচের ধাক্কা সহ্য করার মতো সক্ষমতা এই মুহুর্তে ইতালির নেই। তারা নতুন নির্বাচনে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেতারাও অভিন্ন মতামত প্রকাশ করে বলেন, নতুন নির্বাচনে না গিয়ে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত।

রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নানা মুখি চাপের এক পর্যায়ে বরফ গলতে শুরু করে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ডান জোট রাজি হয় সিনোর বেরলুসকোনিকে বাদ দিয়ে যৌথ সরকার গঠন করতে। প্রফেসর যুজেপ্পে কোনতে কে প্রধানমন্ত্রী করে একটা খসড়া মন্ত্রী পরিষদের তালিকা পাঠানো হয় রাষ্ট্রপতি সিনোর মাত্তারেল্লার কাছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি আপত্তি তোলেন খসড়া মন্ত্রী পরিষদে প্রস্তাবিত অর্থমন্ত্রী পাওলো সাবোনা কে নিয়ে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, পাওলো এক সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, ইউরোপের অভিন্ন মূদ্রা ইউরোর বিরুদ্ধে বই লিখেছেন। সুতরাং তাকে অর্থমন্ত্রী করা হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ইতালির সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

রাষ্ট্রপতি মাত্তারেল্লার আপত্তির মুখে প্রস্তাবিত প্রধানমন্ত্রী যুজেপ্পে কোনতে সরে দাঁড়ান এবং মন্ত্রী পরিষদ গঠন করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। শুরু হয় নতুন সংকট। রাষ্ট্রপতি নতুন করে অন্তবর্তী সরকার গঠন করেন। অনেকটা নিশ্চিত করে ধরে নেয়া হয় ইতালি নতুন একটি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের সম্ভব্য তারিখ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।

এর মধ্যে মে মাসের শেষ কদিনে নাটকীয় ভাবে দৃশ্যপট পালটে যেতে শুরু করে। প্রস্তাবিত অর্থমন্ত্রী পাওলো কে অন্য মন্ত্রনালয় দিয়ে মন্ত্রী পরিষদ গঠন করতে রাজি হন প্রফেসর কোনতে। শুরু হয় নতুন করে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এবং অনেকটা তড়িঘড়ি করে নতুন মন্ত্রী পরিষদের নাম ঘোষনা করা হয়। যৌথ সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা লুইজি দি মাইয়ো এবং মাত্তেয়ো সালভিনি রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে তাদের সম্মতি পত্রে স্বাক্ষর করেন।

ইতালির রাজনৈতি ইতিহাস খুব বেশি স্বস্তিকর নয়। সংসদের আস্থা ভোটে বার বার হেরে যাওয়া, সরকার পতন হওয়া এবং ঘন ঘন নির্বাচনের ধকলে দেশটি এখন ক্লান্ত প্রায়। দেশের জনগণ রাজনীতি এবং রাজনীতিকদের উপর উপর্যপুরি বিরক্ত। যে কারনে ২০০৯ সালে গঠিত চিংকুয়ে স্তেল্লে বা ফাইভ স্টার মুভমেন্ট মৌলিক কোনো রাজনৈতিক দল না হয়েও প্রধান দুই জোটের বিরুদ্ধে একক ভাবে ৩২ শতাংশ ভোট পেতে সক্ষম হয়। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ফাইভ স্টার মুভমেন্টের সাথে কড়া জাতীয়তাবাদী দল লেগা নর্দের যৌথ সরকার কতো দিন টিকতে পারবে বা কতোটা পথ এক সাথে চলতে পারবে তা নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারন শুরুতেই তারা অনেকটা পানি ঘোলা করে ফেলেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিনোর বেরলুসকোনি কে বাদ দিয়ে তাদের পথ চলা কতোটা সমরিন হবে তা এখনি বলা মুশকিল বলে অভিজ্ঞজনরা মনে করছেন।

২০০৯ সালের গোড়ার দিকে ইতালিয় রাজনীতিকদের উপর চরম বিরক্ত একদল যুবক নিজেদের মধ্যে সোস্যাল মিডিয়া ভিত্তিক আলাপ আলোচনা শুরু করে। তারা ইতালিতে ব্যাপক আকারে রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করে। এসব নিয়ে তাদের মধ্যে নিয়মিত আলাপ আলোচনা হতে থাকে। আস্তে আস্তে তাদের চিন্তা ভাবনার প্রতি দেশের যুব সমাজের সমর্থন বাড়তে থাকে। তারা প্রাথমিক ভাবে রাজনীতির পাঁচটি মৌলিক সমস্যা চিহ্নিত করে এবং তা সমাধানের জন্য করনীয় খুঁজে বের করে। এক সময় তারা ইতালির বিখ্যাত কৌতুকাভিনেতা সিনোর বেপ্পে গ্রিল্লোর নেতৃত্বে সংগঠিত হয় এবং পাঁচ মূলনীতির উপর ভিত্তি করে একটি আন্দোলন গড়ে তোলে যার নাম দেয়া হয় মুভিমেন্তি চিংকুয়ে স্তেল্লে বা ফাইভ স্টার মুভমেন্ট।

এই দল বা আন্দোলনের নেতারা প্রায় সবাই বয়সে তরুণ, যুবক। তাদের চিন্তা ভাবনা ইতালিয় যুবকদের চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। বিশেষ করে যারা ইতালিয় রাজনীতি বা রাজনীতিকদের উপর চরম বিরক্ত তাদের কাছে এই দলের জনপ্রিয়তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। তার দৃশ্যমান প্রমান হলো এবারের নির্বাচনে দলটি প্রধান দুই জোটের বিরুদ্ধে একক ভাবে ৩২ শতাংশ ভোট পায়।

অপর দিকে কট্টোর জাতীয়তাবাদী দল লেগা নর্দ শুধু ইতালিত নয় গোটা ইউরোপে কড়া জাতীয়তাবাদী হিসাবে পরিচিত। নির্বাচনের আগে এই দলের নেতা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিনোর মাত্তেয়ো সালভিনি বলেছিলেন, নির্বাচিত হতে পারলে তারা অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি গ্রহণ করবেন। তারা মিঃ ট্রাম্পের সুরে সুর মিলিয়ে বলেছিলেন, প্রিমা ইতালিয়া বা ফাস্ট ইতালি।

তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল- সরকার গঠন করতে পারলে ইতালি থেকে কমপক্ষে ৬ লাখ অভিবাসীকে বহিস্কার করবে। যে সব দেশের অভিবাসীরা ইতালিতে অবৈধ ভাবে বসবাস করে তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে সালভিনি বলেছিলেন, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হবে যাতে ওই সব দেশ তাদের নাগরিকদের ইতালি থেকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে। তিনি বলেছিলেন, ইতালিতে বসবাস করতে হলে বৈধ ভাবে বসবাস করতে হবে। ট্যাক্স প্রদান করতে হবে। মুসলিম অভিবাসীদের উদ্দেশ্য করে সালভিনি বলেছিলেন, ইতালিতে থাকতে হলে ইতালিয় কালচার মানতে হবে। লাল মদ এবং শুকরের মাংশ খেতে হবে।

অভিবাসন নীতিতে ফাইভ স্টার মুভমেন্ট এতটা আগ্রাসী না হলেও তারাও নির্বাচনের আগে বলেছিল, ইতালিতে অভিবাসীরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

উল্লেখ্য, গত বছর সরকারী হিসাব মতে ইতালিতে অবৈধ উপায়ে প্রায় একলাখ ১৯ হাজার অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

সদ্য ক্ষমতা ছাড়া বিরোধী দলের নেতা সিনোর মাত্তেয়ো নেরসি প্রধানমন্ত্রী থাকা কালিন সময়ে ইতালির রাজনীতি এবং সরকারে স্থিতিশীলতা আনতে ব্যাপক সাংবিধানিক সংস্কারের কথা বলেছিলেন। তিনি সংবিধান সংস্কারের জন্য জনমত যাচাই করতে গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু তখন ডানপন্থী বিরোধী দল জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল, রেনসি রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য, তার নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সংবিধান সংস্কারের কথা বলছেন। সে সময়ে গণভোটে হেরে যায় সিনোর রেনসির সংস্কার প্রস্তাব এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

নতুন যৌথ সরকার ইতিমধ্যে ঘোষনা করেছে তারা পেনশন নীতিতে সংস্কার আনবে। একজন নাগরিক বা অভিবাসী তার নিজের বয়স এবং কাজের বয়স মিলিয়ে একশ বছর পার করলেই অবসরে যেতে পারবে।

অপর দিকে ইতালিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের মধ্যে কিছুটা আশঙ্কা বিরাজ করছে। কারন যৌথ সরকারের অন্যমত সাথী লেগা নর্দ কড়া জাতীয়তাবাদী দল। তারা নির্বাচনের আগে অভিবাসন নীতিতে যেসব কথা বলেছিল তা যদি বাস্তবায়নের চেষ্টা করে তবে অনেক অভিবাসীকেই হয়রানীর মুখে পড়তে হতে পারে। নিজ দেশে ফিরে যেতে হতে পারে।