পাখি দেখানোর কথা বলে প্রবাসীর শিশুপুত্রকে ১১ জন মিলে হত্যা করে!

এম নজরুল ইসলাম, বগুড়া করেসপন্ডেন্ট :: পাখি দেখানোর কথা বলে শিশু রিফাতকে (৮) অপহরণ করা হয়। ওইদিনই রিফাতকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। কিলিং মিশনে অংশ নেয় ১১ জন। এরমধ্যে একজন রিফাতের নিকট আত্মীয়। নদীর কচুরিপানার মধ্যে শিশু রিফাতের লাশ ফেলে দিয়ে চলে যায় হত্যাকারীরা। রিফাতের বাবা টাকা ধার দেয়নি বলেই এই হত্যাকান্ড। হত্যার পরেও শিশুটির বাবার কাছে মুক্তিপণ দাবি করে পাষন্ডরা।

হত্যার দায় স্বীকার করে রবিবার ও সোমবার বগুড়ার অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছে ৭ জন। হত্যাকান্ডে জড়িত ১১ জনের মধ্যে ১০জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জবানবন্দী নেয়ার পর ৭জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালতের বিচারক শ্যাম সুন্দর রায়।

গত রোববার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যার পর বাড়ির কাছ থেকে অপহরণের পর বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার খাদাস হাটপাড়া গ্রামের এনামুল হকের ছেলে রিফাত (৮) হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।

বুধবার (১৮ জুলাই) পোয়ালগাছা গ্রামের ভদ্রাবতী নদীর সিংহবাড়ি সেতুর নিচে কচুরিপানার মধ্যে থেকে শিশু রিফাতের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে থানা পুলিশ। এরপরই হত্যার রহস্য উদঘাটনে তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ। অবশেষে হত্যায় অংশ নেয়া ১১ জনকে সনাক্ত করে ১০জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় থানা পুলিশ। লাশ উদ্ধারের ৫ দিনেই হত্যার রহস্য উন্মোচন হয়েছে। অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করে জেলা পুলিশৈর সিনিয়র অফিসারদের সহায়তায় মূল ভূমিকা পালন করেন শাজাহানপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ।

সোমবার (২৩ জুলাই) সন্ধ্যায় সময়ের কন্ঠস্বরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন শাজাহানপুর থানার ওসি জিয়া লতিফুল ইসলাম।

মামলার বিবরণ, হত্যাকারীদের জবানবন্দী ও পুলিশ জানিয়েছে, গত ১৫ জুলাই সন্ধ্যা থেকে উপজেলার গোহাইল ইউনিয়নের খাদাস বাজারের ব্যবসায়ী সাবেক কুয়েত প্রবাসী এনামুল হকের ৮ বছরের শিশুপুত্র রিফাত হারিয়ে যায়। তাকে পরিবারের সদস্য এবং গ্রামবাসী রাতভর খুঁজে না পেয়ে পরদিন ইউপি চেয়ারম্যানের সাথে পরামর্শ করে থানায় এসে একটি সাধারন ডায়েরি করেন। খবর জানার পর থেকেই শিশুটিকে উদ্ধারে থানা পুলিশ তৎপর হয়ে উঠে এবং সম্ভাব্য সকল বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত শুরু করে।

১৬ তারিখ সকাল নয়টার দিকে রিফাতের বাবা এনামুলের মোবাইল নম্বরে ফোন করে ৫ লাখ টাকা দাবি করে বলা হয়, টাকা নিয়ে জামাদারপুকুর বাসস্ট্যান্ডে আসতে। এ কথা পুলিশকে জানানো হলে শিশু রিফাতের ক্ষতি হবে হুমকি দেয়া হয়। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে পুলিশ কৌশলী ভূমিকা গ্রহন করে। কিন্তু কেউই টাকা নিতে আসেনি। মুক্তপণ দাবি করা সেই ফোনটা কল করার পর থেকে বন্ধ। অনেক তথ্য বিশ্লেষন করে পুলিশ বুঝতে পারে কারা এ কাজটি করেছে এবং সে অনুযায়ী কয়েকজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সকল সম্ভাব্য কৌশল ব্যবহার করেও তাদের মুখ কোনভাবেই খোলানো যাচ্ছিল না। জিজ্ঞাসাবাদের সকল সম্ভাব্য কৌশল ব্যবহার করেও রহস্যকাজ হলো না। হাল ছাড়ার মতো অবস্থা হয়েছিল পুলিশের।

একপর্যায়ে ১৮ তারিখ সকালে শিশু রিফাতের অর্ধগলিত মৃতদেহ পোয়ালগাছা ভদ্রাবতী নদীর সিংহবাড়ি সেতুর নিচ নদীর থেকে উদ্ধার করার পর এলাকায় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এলাকার কেউই রিফাতের বাবা-মা আত্মীয় স্বজনের বুকফাটা আর্তনাদ দেখে স্থির থাকতে পারেনি। চোখের পানি ফেলেছে পুলিশ সদস্যরাও। এরপর নিহত শিশু রিফাতের বাবা এনামুল হক বাদি হয়ে কয়েকজনের নাম দিয়ে মামলা (নং ১৫) দায়ের করেন।

এজাহারে তিনি জানান, তার গ্রামের কালাম নামের একজন অনেকদিন যাবত টাকা ধার চায়। টাকা না দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে সে এ কাজ করতে পারে। কালাম আগে থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধরা ছিল। তার কাছ থেকে ঘটনা জানার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা হলো, কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের সকল কৌশল ব্যর্থ হয়ে গেল। মূল ক্লু ছিল সেই মোবাইল নম্বর। অনেক রিসার্স এনালাইসিস করে, ডিজিটাল এনালগ সকল তরিকা ব্যবহার করে ধীরে ধীরে ঘটনা স্পষ্ট হয়ে গেল। আটক করা হলো সজীব (১৯) নামক এক অটোরিক্সা চালককে। তার কাছে জানা গেল পুরো ঘটনা।

১৫ তারিখ সন্ধ্যায় কালাম এবং তার এক নিকটাত্মীয় সজীবের অটোরিক্সায় জমাদারপুকুর থেকে উঠে আরেকটু এগিয়ে আসার পর পাঁচ ফুল, মেহেদী এবং বায়েজিদ নামে তিনজন শিশু রিফাতকে নিয়ে উঠে। তারা শিশুটিকে পাখি দেখানোর কথা বলে বাজার থেকে কৌশলে বের করে নিয়ে আসে। আর একটু এগিয়ে মফিজুল নামে আরেকজন ভ্যানে ওঠে। পিছন পিছন আরেকটি ব্যাটারি চালিত ভ্যানে ছিল জাহিদ, বোরহান, মাসুদ, সেলিম। তারা সবাই সিংহবাড়ি সেতু উপর নেমে যায়। এরপর কালাম, তার সেই নিকটাত্মীয় এবং মফিজুল বাচ্চাটিকে নিয়ে নদীর ভিতর নামে। মফিজুল বাচ্চাটির পা ধরে আর কালাম হাত ধরে থাকে, আরেকজন ছেলেটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর নদীর কচুরিপানার ভিতর লাশ ফেলে দিয়ে উপরে চলে আসে। ভ্যান চালক সজীব গাড়িদহ থেকে ফিরে আসার সময় তাদের নিয়ে আবারও খাদাস বাজারে চলে আসে। এঘটনায় জড়িত ১১ জন এরমধ্যে ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে ৭জন।

বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সনাতন চক্রবর্তী এসব তথ্য নিশ্চিত করে সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, শিশু রিফাত নিখোঁজের পর তাকে উদ্ধারে মাঠে নামে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের পর টানা ৫দিন অবিশ্রান্ত পরিশ্রমে হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন হয়েছে।

Sharing is.

Share on facebook
Share with others
Share on google
Share On Google+
Share on twitter
Share On Twitter

You May Also Like:

  • Recent Updates
  • Top Views