‘রাজনৈতিক’ সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড বেশি নিষ্ঠুর

২:০২ অপরাহ্ণ | রবিবার, অক্টোবর ১৪, ২০১৮ মুক্তমত

মুক্তমত ডেস্ক :: রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বলতে ‘মানুষ অথবা সম্পত্তির বিরুদ্ধে জোরপূর্বক বলপ্রয়োগ এবং সহিংসতার মাধ্যমে একটি সরকার, বেসামরিক জনগণ অথবা এর কোনো অংশকে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আতঙ্কিত ও বাধ্য’ করাকে বোঝায়। কোনো রাজনৈতিক বিরোধীদলের ওপর যখন এরূপ জোরপূর্বক বলপ্রয়োগ এবং সহিংসতা করা হয়, এটি অবশ্যই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিশেষ প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে অপসারণ করার উদ্দেশ্যে এ সব কাজ করা মানেই হলো গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং সমাজকে লজ্জাহীন স্বৈরতন্ত্রের হাতে সোপর্দ করা।

সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ পল উইলকিনসন তার Terrorism and the Liberal State (London, Macmillam, 1986)- নামক বইয়ে রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তু মূলত ‘বাছবিচারহীন’ ও ‘অনিশ্চিত’ হয়ে থাকে। উনি আরো ব্যাখ্যা করেছেন যে, যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের লক্ষ্যবস্তু হন না সেহেতু কেউই রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদ থেকে নিরাপদ নয়। যে কেউ যে কোনো মুহূর্তে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন।

‘অপরাধমূলক সন্ত্রাসবাদ’ থেকে ‘রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে কারণ রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট দর্শকশ্রেণিকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা করা হয়ে থাকে। রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদীরা মূলত একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের (রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের) ওপর দীর্ঘমেয়াদি ভয়, ভীতি ও হুমকি সৃষ্টি করতে চায়। পল উইলকিনসন দাবি করেন যে ‘রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড বেশি নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়ে থাকে, অনেকটা শটগান দর্শনের মতো, গাড়ি বোমা, পেরেক বোমা, ডাবল বোমা ইত্যাদি উপায়ে বহু মানুষকে একসঙ্গে মেরে ফেলাই যার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে’।

অপরাধ যেখানেই সংঘটিত হোক না কেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্ব›দ্বীকে অপসারণ করার উদ্দেশ্যে মারাত্মক রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নৃশংস আক্রমণ কখনোই বিচারের আওতামুক্ত থাকা উচিত নয়। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর পরিবার ও সহযোগীদের নৃশংসভাবে হত্যার ফলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছিল। সেই নৃশংস হত্যার মাত্র একচল্লিশ দিন পর একটি Indemnity Ordinance (ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ) ঘোষণা করা হয়, যার ফলে খুনিদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে এই অধ্যাদেশ অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয় এবং ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা’-র রায়ের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জাতি বেরিয়ে আসে এবং সমাজে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়।

রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের নিকৃষ্ট উদাহরণ হলো যখন একটি রাষ্ট্র বা ঐ রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন সরকার তার রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী আচরণ শুরু করে। বিদেশি অথবা নিজের দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কর্তৃক এই ধরনের সন্ত্রাসবাদকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ আদতে খুবই হতাশাজনক। কেননা নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মূলত একটি রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। আর সেখানে কিনা রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা হরণ করে দানবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে? অবশেষে ১৪ বছর পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হলো! মামলার জীবিত ৪৯ আসামির মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, মাওলানা তাজউদ্দিন, হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

এছাড়াও মামলায় সরাসরি সংশ্লিষ্টতার দায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে স্থাপিত ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় ঘোষণার সময় ৩১ জন আসামি আদালতে হাজির ছিল। মামলার পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য ‘২১ আগস্টের গ্রেনেড’ হামলা একটি রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের নগ্ন উদাহরণ।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে অরাজনীতিকরণের জন্য তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এবং দলের অন্য সদস্যদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা পরিচালনা করে। আর শুধু তা-ই নয়, সেই বর্বর গ্রেনেড হামলার পরে তৎকালীন বিএনপি সরকার মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত উধাও করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। একই সঙ্গে গ্রেনেড হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যা রাজনৈতিক নাটকও সাজায়। এ কারণেই ‘২১ আগস্টের গ্রেনেড’ হামলা মামলার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদকে রুখে দেয়ার জন্য এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

আবার, ‘২১ আগস্টের গ্রেনেড’ হামলা মামলার রায় শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং এই রায় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সমগ্র দক্ষিণ-এশীয় রাষ্ট্রসমূহের জন্যও হয়ে উঠবে একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ। আমরা দেখেছি দক্ষিণ-এশীয় রাষ্ট্রসমূহ নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের উর্বর আবাসভ‚মি। পাকিস্তানের লিয়াকত আলী খান হত্যাকাণ্ড (১৯৫১), মুহাম্মাদ জিয়াউল হক হত্যাকাণ্ড (১৯৮৮) অথবা বেনজির ভুট্টো হত্যাকাণ্ড (২০০৭), ভারতের মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী হত্যাকাণ্ড (১৯৪৮), ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড (১৯৮৪) অথবা রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড (১৯৯১), শ্রীলঙ্কাতে বান্দরনায়েকে হত্যাকাণ্ড (১৯৫৯), ভিজায়া কুমারানাতুঙ্গা হত্যাকাণ্ড অথবা রানাসিংহে প্রেমাদাসা হত্যাকাণ্ড (১৯৯৩), ভুটানের জিগমে পালডেন দর্জি হত্যাকাণ্ড (১৯৬৪) অথবা মালদ্বীপের ড. আফরাশিম আলী হত্যাকাণ্ড (২০১২) ইতিহাসের পুনারাবৃত্তি ঘটিয়েছে বার বার। এর সবই ‘রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের’ নগ্ন উল্লাস। সুতরাং, গণতান্ত্রিক সমাজ রক্ষায় ও এই সব জঘন্য ধারাবাহিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের সমাপ্তি ঘটাতে, প্রকৃত অপরাধীদের ও তাদের মদতদাতাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা অপরিহার্য।

– লেখক : তুরিন আফরোজ, আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক