নোয়াখালীর নিঝুম দ্বীপের মূল আকর্ষণ চিত্রা হরিণ বিলুপ্তির পথে

৭:৫৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৮, ২০১৮ আলোচিত, ইতিহাস-ঐতিহ্য, দেশের খবর, সাফল্যের বাংলাদেশ

মো:ইমাম উদ্দিন সুমন, স্টাফ রিপোর্টার, সময়ের কণ্ঠস্বর: নোয়াখালীর হাতিয়ার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠা নিঝুম দ্বীপের মূল আকর্ষণ চিত্রা হরিণ এখন বিলুপ্তির পথে। অবাধে বৃক্ষ নিধন, শিকারীদের বেপরোয়া থাবা, শিয়াল-কুকুরের আক্রমণ ও পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে দ্বীপটিতে হরিণের অস্তিত্ব সংকট দেখা দিয়েছে।

ফলে দেশ-বিদেশ থেকে নিঝুম দ্বীপে হরিণ দেখতে আসা পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অথচ পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে এখান থেকে হরিণ রপ্তানি করে প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, দেশে হরিণের অন্যতম অভয়ারণ্য নিঝুম দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠে দেশের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন কেন্দ্র নিঝুম দ্বীপ। দ্বীপটি ভেসে উঠার পর ৮০’র দশকে বন বিভাগ এখানে বনায়ন করে। এরপর ১৯৮৫ সালে সরকার এই দ্বীপে ২ জোড়া হরিণ অবমুক্ত করে। পরবর্তীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজারে। ২০০১ সালে সরকার নিঝুম দ্বীপকে জাতীয় উদ্যান ও হরিণের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এক সময় এ বনে ৩০ হাজার হরিণ থাকলেও বন উজাড় হওয়ায় এ সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১০ হাজারে।

নিঝুম দ্বীপে পর্যটকদের মূল আকর্ষণ এই কয়েক হাজার হরিণ। গাছ কেটে বসতি গড়ে উঠায় আবাসস্থল হারাচ্ছে হরিণ। এছাড়াও রাত-বিরাতে শিকারীরা হরিণ শিকার করে পাচার করছে, আর শিয়াল-কুকুরের আক্রমণে হরিণের প্রাণহানি ঘটছে অহরহ। দ্বীপের চারদিকে বেড়িবাঁধ না থাকায় নোনা পানি বনে ঢুকে হরিণের খাবার পানি ও খাদ্য সংকট দেখা দেয়। ফলে অনেক সময় প্রাণ বাঁচাতে হরিণ লোকালয়ে এসে ধরা পড়ছে মানুষের হাতে। অবার খাদ্য ও অবাস সংকটে হরিণ নিঝুম দ্বীপ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী অন্য দ্বীপগুলোতে চলে যাচ্ছে। দ্বীপে গাছ ও হরিণ কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে কমছে পর্যটক। হরিণ না দেখে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে পর্যটকদের।

এদিকে, নিঝুম দ্বীপের উন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষেপে গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। নিঝুম দ্বীপকে দেশ ও দেশের বাইরে গ্রহণযোগ্য একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। ২০১৭ সালে নিঝুম দ্বীপকে জেলার ব্র্যান্ডিং ঘোষণা করে সরকার। নাম দেয়া হয় “নিঝুম দ্বীপের দেশ নোয়াখালী”। ইতিমধ্যে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিঝুম দ্বীপ ঘুরে মুগ্ধ হয়েছেন। নিঝুম দ্বীপ যখন দেশ ও দেশের বাইরে নোয়াখালীর ব্র্যান্ডিং হিসিবে পরিচিতি লাভ করবে তখন এ জেলার অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল।

নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহরাজ উদ্দিন অবজারভার অনলাইনকে বলেন, নিঝুম দ্বীপে সীমানা প্রাচীর না থাকা, খাদ্য সংকটসহ বিভিন্ন কারণে ৩০ হাজার হরিণ থেকে কমে ৮-১০ হাজারে নেমে এসেছে। হরিণের মাংস সুস্বাদু হওয়ায় অনেক সময় হরিণ পাচার হয়। তাছাড়া প্রতিটি ছোট বা মাঝারি হরিণের মূল্য ২৫-৩০ হাজার টাকা। ফলে টাকার লোভে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা হরিণ শিকার ও পাচারের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। হরিণ কমে যাওয়ায় পর্যটকও কমে গেছে। বিষয়টি আমরা জেলার বিভিন্ন মিটিংয়ে উপস্থাপন করেছি।

নিঝুম দ্বীপে হরিণ কমে যাওয়ার কথা স্বীকার করে নোয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তহিদুল ইসলাম অবজারভার অনলাইনকে বলেন, মানুষ দিন দিন বন উজাড় করছে। এতে হরিণের বিচরণে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। খাদ্য সংকটসহ বিভিন্ন কারণে নিঝুম দ্বীপ ছেড়ে হরিণ পার্শ্ববর্তী অন্য বনে চলে যাচ্ছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। স্থানীয় বন বিভাগের বিট অফিসারদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আয়েশা ফেরদৌস বন উজাড় হওয়ার কথা স্বীকার করে অবজারভার অনলাইনকে বলেন, নিঝুম দ্বীপ আমাদের দেশের একটি সম্পদ। এটিকে রক্ষা করতে হবে। পর্যটকদের ফেরাতে হরিণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে নিঝুম দ্বীপের বৃক্ষ নিধন। যারা নিঝুম দ্বীপ ও দ্বীপের হরিণ ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ জন্য তিনি এলাকার সকলের সহযোগীতা কামনা করেন।