স্বপ্ন কেন স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়, স্বপ্ন মনে রাখার উপায় কী?

জানা-অজানা ডেস্ক :: ঘুম সম্ভবত সারাদিনে আমাদের জীবনে সবচেয়ে তৃপ্তির একটা সময়। সারাদিনের ক্লান্তি, হতাশা, একঘেয়েমি বিরক্তিকর চিন্তাধারার সময়ে একটা ভাল ঘুম আমাদের সময়টাকেই বদলে দিতে পারে এমনকি খুব আনন্দের সময়েও ঘুমের একটা বড় প্রভাব থাকে আমাদের রোজকার জীবনে। বলতে গেলে একজন মানুষ তার পুরো জীবনের প্রায় তিন ভাগের একভাগ ঘুমিয়ে কাটায়। আর আমাদের ঘুমের একটি নিত্য অনুষঙ্গ আমাদের স্বপ্ন।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা ঘুমে স্বপ্ন দেখি। এমনকি যারা দাবি করেন তারা ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখেন না তারাও আসলে স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু সত্যটা হলো, আমরা স্বপ্নকে মনে রাখতে পারিনা। এমনকি যতটা আমরা বলতে পারি তাও কিন্তু সবটুকু নয়। এবং বিষ্ময়ের কথা, দিনের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হতেই আমরা স্বপ্নের বেশিরভাগই ভুলে যাই। এবং সেই সময় আমাদের মনের একটি অবচেতন পুরো স্বপ্নটা নিজের মত সাজিয়ে বর্ণনা উপযোগী করে থাকে।

এ সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ার মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো সায়েনন্টিস্ট থমাস এড্রিলন বলেন, “আমাদের মাঝে স্বপ্ন ভুলে যাবার খুব স্বাভাবিক একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এবং যারা নিয়মিত নিজের স্বপ্নের কথা অন্যের সাথে আলাপ করে তাদের মাঝে এই প্রবণতা আরো বেশি। এবং যদিও এটি বিশ্বাস করা কষ্ট তবে সত্যটা হলো, আপনি ঘুম থেকে উঠে কিছু মনে করতে পারছেন না মানে আপনি একটু আগেই একটি স্বপ্ন দেখেছেন।”

যদিও এর পুরোপুরি কারণ এখনো পর্যন্ত জানা যায়নি তবে আপাত একটি ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা দাঁড় করিয়েছেন। মানুষের ঘুমের সময় ব্রেনের কাজের ধরণ এবং নার্ভাস সিস্টেমের গবেষনার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, ঘুমের সময় মানবদেহের সবকটি অংশই একত্রে বিশ্রামে যায় না।

আমাদের মস্তিষ্কের অন্যতম একটি অংশ হিপ্পোক্যাম্পাস। মস্তিষ্কের এই অংশটি নিয়ে প্রথম জানা যায় যায় ২০১১ সালের একটি গবেষণার মাধ্যমে। সাধারণত হিপ্পোক্যাম্পাস খুব ছোট সময়ের জন্য স্মৃতি সংরক্ষণ করে। প্রচলিত ভাষায় যাকে আমরা বলে থাকি শর্ট টাইম মেমরি। অর্থাৎ শর্ট টাইম মেমরি কে লং টাইম টাইম মেমরিতে রুপান্তরের কাজটিই করে হিপ্পোক্যাম্পাস।

গবেষকরা তাদের গবেষনায় দেখতে পান আমাদের ঘুমের সময় এ হিপ্পোক্যাম্পাস সবার শেষে বিশ্রামে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘুমিয়ে পড়ার প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘন্টা পর হিপ্পোক্যাম্পাস নিষ্ক্রিয় হতে থাকে। যেহেতু হিপ্পোক্যাম্পাস সবার শেষে নিষ্ক্রিয় হয় তাই ঘুম থেকে জাগবার পরেও এর সক্রিয় হতে দেহের বা ব্রেইনের অন্যান্য অংশের তুলনায় খানিক বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়ে থাকে। ঠিক এই কারণেই ঘুম থেকে ওঠার পরপরই স্বপ্নের কথা স্মরণে থাকলেও হিপ্পোক্যাম্পাস তা পুরোপুরি গ্রহণ করে দীর্ঘস্থায়ী কোন স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়না।

যদিও এটি স্বপ্ন মনে না থাকার খুবই যৌক্তিক একটি ব্যাখ্যা তবে তার মানে এই নয় যে ঘুমের সময় বা রাতে হিপ্পোক্যাম্পাস একেবারেই নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। বরং মস্তিষ্কের অন্যান্য যেকোন অংশের তুলনায় হিপ্পোক্যাম্পাস এইসময় আরো বেশি কাজ করে থাকে। যখন আমরা ঘুমে বিভোর থাকি ঠিক সেসময় হিপ্পোক্যাম্পাস আমাদের সারাদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনা কে স্মৃতি হিসেবে জড়ো করে শর্ট টাইম মেমরি থেকে লং টাইম মেমরি অর্থাৎ একটি দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে পরিণত করার জন্য ব্যস্ত থাকে। কিছু কিছু গবেষণায় দেখা যায়, ঘুমন্ত অবস্থায় হিপ্পোক্যাম্পাস নতুন কোন তথ্য (স্বপ্নে আমরা যা দেখতে পাই) সেসব সংগ্রহ না করে বরং আগেই ঘটে যাওয়া ঘটনাকে স্মৃতি আকারে মস্তিষ্কের কর্টেক্সে প্রেরণ করে।

সাধারণত ঘুম ভাঙবার পর সাধারণ যেকোন মানুষের মস্তিষ্কের স্মৃতি ধারণের কার্যকারীতা শুরু হতে প্রায় দুই মিনিট সময় প্রয়োজন হয়ে থাকে। ২০১৭ সালে স্বপ্ন মনে রাখার বিরল ক্ষমতার অধিকারী ১৮ জনকে চালানো এক গবেষণায় দেখা যায় তাদের ঘুমের পর মস্তিষ্কের কাজ শুরু হতে গড়ে কেবল এক মিনিট সময় প্রয়োজন হয়। আর এই এক মিনিটেই হিপ্পোক্যাম্পাস তার কাজ শুরু করতে পারে বলেই তারা তাদের স্বপ্নকে মনে রাখতে সক্ষম ছিলেন।