সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ২৯শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ভোটের প্রতিশ্রুতিতে বন্দী চরপাথরঘাটার ‘নয়াহাট সেতু’

৩:০০ অপরাহ্ণ | বুধবার, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮ চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম ব্যুরো: স্বাধীনতার পরে গুণে-গুণে ৪৭টি বসন্ত পার। কাঠের সাঁকো থেকে লোহার তৈরী পাটাতনের সেতু ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়েছে বছরের পর বছর। পালন করা হয়েছে সামাজিক সংগঠন ও শিক্ষার্থী কতৃক অবরোধ,মানববন্ধন সহ নানা কর্মসূচি।

নেতার পর নেতা। কতো নেতা এসে দেখে যায়, কতো এমপি মন্ত্রী ‘নয়াহাট সেতু’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু তবুও যেনো কোথায় আটকে আছে নিয়তি! বাস্তবে রপ নেয়না কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের দুঃখ নামে খ্যাত ‘নয়াহাট সেতু’। স্বপ্ন দেখতে দোষ কী, সেই স্বপ্নই দেখছে ৪৭বছর ধরে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ।

সেতুটির ভাগ্যের সিঁকে খুলছে না কিছুতেই। বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ এমপি মন্ত্রীর বহু প্রতিশ্রুতির কথা জনগণ ভূলেনি। আবারো ভোটের আগে কতিপয় রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতির লাল ফিতায় বন্দি হয়ে আছে স্বপ্নের ‘নয়াহাট সেত’ুটি। বাস্তবায়নে নানা প্রতিশ্রুতির ভাঁজে স্বপ্ন নিয়ে প্রহর গুণছে দুই ইউনিয়নে বসবাস করা অর্ধ লাখো মানুষ।

এ নয়াহাট সেতু নির্মাণ হলে এলাকার মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যেতো। খুলে যেতো অবকাঠামোগত যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্ভবনার দুয়ার। চরপাথরঘাটা তিনটি ওয়ার্ডে বসবাস করা হাজার হাজার মানুষের সাথে সেতুবন্ধন তৈরি হবে শহর কিংবা উপজেলার।

একটি মাত্র সেতুর জন্য জরুরী রোগী পরিবহন কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ অবনতি হলে কর্ণফুলী থানা পুলিশকেও ৩কিঃ মিঃ পথ ঘুরে যেতে হয়। নয়তো প্রশাসনিক লোকদের হেঁটে চরপাথরঘাটা এলাকায় প্রবেশ করতে হয়। বছরের বেশির ভাগ সময় ঝুকিঁপুর্ণ থাকে লোহার পাটাতনে গড়া এই নয়াহাট সেতু।

স্বাধীনতার পর থেকে নয়াহাট সেতুটির কথা এলাকাবাসী শুনে আসলেও গত ৪৭ বছরেও এটির বাস্তবায়ন হয়নি। কোন সরকারের আমলে তা পুর্ণতা পায়নি। যদিও ভোটের মাঠে সব সরকারের আমলে এমপি মন্ত্রীর আশ্বাসের বানী আর প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বার বার। এমন জনশ্রুতিও রয়েছে, নয়াহাট সেতু বাজেট পাশ হলেও পটিয়ার সংসদ তার এলাকার নয়াহাটে নিয়ে গেছে সেতুটি। নামনে হেরফের তবে জানা যায়নি তা কতটুকু সত্য।

চরপাথরঘাটা মুক্ত বিহঙ্গ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা মোঃ সেলিম খাঁন বলেন, ‘১৯৯৬ সালে ক্লাবের পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধান অতিথি হিসেবে আসা প্রয়াত চট্টল মেয়র মহিউদ্দীন চৌধুরীকে নয়াহাট সেতু বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে, তিনি লোহার পাটাতন দিয়ে চলাচল উপযোগী করে দেন সেতু দিয়ে। যা এখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

এলাকা ঘুরে ও প্রবীণ লোকদের সঙ্গে নয়াহাট সেতু বিষয়ে কথা বলে তথ্য পাওয়া যায়, ২০০৩ সালে বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নয়াহাট সেতু নির্মাণের। মাঠে কম আসলেও ‘সরওয়ার জামালের চিন্তাধারা,নয়াহাট খোলা ব্রীজ গড়া’ শ্লোগানে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন চরপাথরঘাটাবাসীকে। কিন্তু বাস্তবে পর পর কয়েকবার এমপি নির্বাচিত হলেও নয়াহাট সেতু আলোর মুখ দেখেনি।

পরে ২০১০ সালের দিকে আওয়ামী লীগের প্রয়াত সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এমপি হলে এলাকাবাসী দাবি তুলেন নয়াহাট সেতু নির্মাণের। বিগত সরকারের নানা এমপি মন্ত্রীর সাথে তিনিও প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১২ সালে এই বিজ্ঞ রাজনীতিবিদের অকাল মৃত্যুতে তা আর সম্ভব হয়নি। পরে ২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি উপ নির্বাচনে মনোনয়ন পান তারই জ্যেষ্ঠ পুত্র ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ।

নির্বাচনে জাবেদ বিজয়ী হওয়ার পর উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন নতুন প্রজন্মের কাছে। এরপর ৫ জানুয়ারির বিএনপি বিহীন নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পেলে আনোয়ারা-কর্ণফুলীবাসী প্রথমবারের মতো মন্ত্রীত্বের স্বাদ পায়। ফলে আবারো স্বপ্ন দেখতে শুরু করে চরপাথরঘাটাবাসী।

তথ্যমতে, প্রয়াত পিতার দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনের এক জনসভায় কথা দিয়েছিলেন নয়াহাট সেতু গড়ে তুলবেন। কিন্তু বারবার আশাহত চরপাথরঘাটাবাসী। দেখতে দেখতে আবারো কড়া নাড়ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটের মাঠে জনগণের দ্বারে দ্বারে প্রার্থীরা। গত কয়েকদিন আগে পুরাতন ব্রীজঘাট এলাকায় নৌকা প্রার্থীর এক নির্বাচনী পথ সভায় এলাকাবাসী আবারো দাবি তুলেন, ফলে এক বছর সময় চেয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ নৌকায় ভোট চাইলেন।

এভাবে বিগত ৪৭ বছরে সেতুটির ভাগ্যে বইছে বঞ্চনা, পাচ্ছে একের পর এক প্রতিশ্রুতি। ঘুরে ফিরে নির্বাচন আসে, নির্বাচনও যায়। এমপি আসে, বহুনেতাও আসে প্রতিশ্রুতিও দেয়। কিন্তু স্বপ্নের নয়াহাট সেতু প্রতিশ্রুতির লাল ফিতায় এখনো বন্দী।
বড় প্রয়োজন এ সেতুর জন্য কবে বরাদ্দ পাশ হবে। কবে নাগাদ নির্মাণ কাজ শুরু হবে তা এখনো অনিশ্চিত।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ও থানা যুব লীগের সহ সভাপতি মোঃ ফরিদ জুয়েল বলেন, ‘নয়াহাট সেতুটি নির্মাণ করা খুবই জরুরী। আশপাশের কয়েকটি গ্রাম তথা ৩০হাজার মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে সেতুটি নির্মাণ করা হলে। তিনি আশা করেন উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরেই তাদের দুঃখ মুছবে।’

কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদেও চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার অবিসংবাদিত নেতা প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর প্রতিশ্রুতি পূরণে তাঁরই সুযোগ্য পুত্র সবসময় সচেষ্ট ও আন্তরিক। যেহেতু এ সেতু নিয়ে আমাদের ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ কথা দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে তিনি এ সেতু নির্মাণ করবেন এটাই আমাদের আশা। কেনোনা তিনি কথা দিয়ে কথা রাখেন।’

সেতু নির্মাণের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে মানবন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যও এ বিষয়ে অবগত। সেতু মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানান আওয়ামী নেতারা। আশা করা যাচ্ছে খুব শীঘ্রই নয়াহাট সেতু ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে আলো দেখবে।