ফসলি জমি হ্রাসে চিন্তিত কৃষি বিভাগ, নাটোরে ৭ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে পুকুর

তাপস কুমার, নাটোর প্রতিনিধি: ধানের চেয়ে মাছে লাভ বেশি, তাই তিন ফসলি জমি খুঁড়ে বানানো হচ্ছে পুকুর। নাটোরে গত সাত বছরেই অন্তত চার হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমে গেছে।

এর দুই-তৃতীয়াংশই এখন পুকুর। বাকিটা বসতবাড়ি, ইটভাটা আর রাস্তাঘাট। এ নিয়ে বেশ চিন্তিত কৃষি বিভাগ। তবে জমির শ্রেণী পরিবর্তন রোধে আইন থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই।

নাটোর কৃষি বিভাগের হিসাবে, ২০০৫ থেকে ২০১২ সালের আগে পর্যন্ত আবাদি জমিতে পুকুর খনন সহনীয় মাত্রায় ছিল। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে এ প্রবণতা স্থানীয় কৃষকদেরও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নতুন পুকুর খনন করা হয়েছে নয় হাজারের বেশি। এ প্রবণতা বন্ধ করতে গত সোমবার নাজিরপুর ইউনিয়নের বৃৃ-কাশো গ্রামের কৃষকরা বিলের মাঝখানে মানববন্ধন করেছেন।

সম্প্রতি চলনবিল ঘুরে দেখা যায়, এক্সক্যাভেটর দিয়ে এখনো চলছে পুকুর খনন। এর ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে কোথাও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিলের চাপিলা ইউনিয়নে অনেক ফসলি মাঠ ছয় মাস জলমগ্ন থাকছে। বিয়াঘাট ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকায়ও এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গুরুদাসপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পুকুর খনন করা হচ্ছে নিয়মিত। ধানের দাম না পাওয়ায় হতাশ কৃষকরা মাছ চাষে ঝুঁকছেন অথবা আবাদি জমি মাছের বাণিজ্যিক খামারিদের ইজারা দিচ্ছেন। আবার ইটভাটার জন্য নগদ টাকায় মাটি কেনা হচ্ছে বলে পুকুর খননে আলাদা ব্যয়ও হচ্ছে না। ফলে আবাদি জমিতে পুকুর খননে উৎসাহিত হচ্ছেন কৃষক।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গুরুদাসপুর উপজেলার বৃ-কাশো গ্রামের বিলটি চাকলবিল নামে পরিচিত। প্রায় ২০০ বিঘা আয়তনের বিলটিতে বিশাল আয়তনের পুকুর খননের পরিকল্পনা করছেন বেশ কয়েকজন কৃষক। এসব পুকুর খনন করা হলেও পুরো এলাকা জলাবদ্ধতার কবলে পড়বে।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, এ গ্রামে ২৫০-৩০০টি পরিবার রয়েছে। তাদের আয়ের একমাত্র উৎস কৃষি। বিলে এরই মধ্যে কয়েকটি পুকুর আছে। আরো পুকুর খনন করলে সবগুলো জমি জলাবদ্ধ হবে। চাষাবাদ একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে।

বিলে পুকুর খননের পরিকল্পনা করছেন যে ক’জন কৃষক, তাদের মধ্যে একজন ফজলুর রহমান। তিনি সেলফোনে বলেন, গত বছর পুকুর খননের চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু স্থানীয়দের কারণে হয়নি। তবে প্রশাসন ও স্থানীয়দের অনুমতি ছাড়া পুকুর খনন করবেন না বলে আশ্বাস দেন তিনি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০০৫-০৬ থেকে ২০১০-১১ অর্থবছর পর্যন্ত নাটোর জেলায় আবাদি জমি খুব একটা কমেনি। কিন্তু এরপর থেকেই আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। ২০১১-১২ অর্থ বছরে জেলায় আবাদি জমি ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার ৮৩৮ হেক্টর, তা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬৮ হেক্টরে। অর্থাৎ এই সাত বছরে কমেছে ৪ হাজার ১৭০ হেক্টর।

অন্যদিকে ২০১২ সালের আগে পুকুর ছিল ১২ হাজার ৪২০টি, ২০১৮ সালে এসে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৪৮৭টিতে। অর্থাৎ সাত বছরে পুকুর বেড়েছে ৯ হাজার ৬৭টি, যা আয়তনের হিসাবে ৩ হাজার ৭৩ হেক্টর। পুকুর খননের কারণে জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে ছয় শতাধিক হেক্টর ফসলি জমি।

উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী, গত সাত বছরে আবাদি জমি কমেছে ৪ হাজার ১৭০ হেক্টর, আর একই সময়ে নতুন পুকুর খনন হয়েছে ৩ হাজার ৭৩ হেক্টর।

এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন – বাড়িঘর, রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণে প্রতি বছরই এক হেক্টর করে আবাদি জমি কমছে। কিছু জমিতে নির্মাণ হচ্ছে ইটভাটা। তবে মূলত পুকুর খননের কারণেই প্রতি বছর কমছে তিন ফসলি জমি।

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, গুরুদাসপুরের সব এলাকাতেই আবাদি জমিতে পুকুর খনন চোখে পড়ছে। বিশেষ করে চাপিলা, বিয়াঘাটে বেশি। অধিকাংশই তিন ফসলি জমিতে পুকুর করা হচ্ছে। এসব ফসলি জমিতে বর্ষাকালে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট ছোট মাছ ধরে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করে। এভাবে পুকুর খনন চলতে থাকলে গুরুদাসপুরে আবাদি জমি একেবারে কমে যাবে।

আবাদি জমি দ্রুত কমে যাওয়ার বিষয়টি রীতিমতো ভাবিয়ে তুলছে উল্লেখ করে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, এ জেলায় খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু পুকুর খননের কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

এ ব্যাপারে প্রশাসনের উদ্যোগ আছে কিনা জানতে চাইলে গুরুদাসপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, আবাদি জমিতে পুকুর খনন করতে হলে জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিতে হয়। আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

নাটোরে নতুন জাতের বোরো আবাদে ব্যস্ত কৃষক

বালাইমুক্ত, উৎপাদন সময় কম, খরচ সাশ্রয় এবং ফলন ভাল হওয়ার আশা নিয়ে নতুন জাতের বোরো ধান আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত ও রোপণ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন নাটোরের কৃষক। বোরো চাষে নতুন জাতের বীজ নিয়ে নতুন আশায় বিশাল কর্মযজ্ঞে নেমেছেন তারা।

কৃষি বিভাগের পরামর্শে ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কৃষকরা ইতোমধ্যে নতুন জাতের বীজ (ব্রি- ধান-৮১, ৮২, ৮৪ ও ৫৮ জাতের) রোপণ শুরু করেছেন। আবহাওয়া ভাল থাকলে এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশ অনুকূলে থাকলে অন্যান্য জাতের তুলনায় একটু আগেই ফসল ঘরে তুলতে পারবেন এমন আশা করছেন দেশের বৃহত্তম চলনবিল ও হালতিবিলের কৃষকরা। আর কৃষি বিভাগের দাবি এসব নতুন জাতের বোরো ধানের উৎপাদন আশানুরূপ হলে এই জাতের বীজের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। এতে কৃষককে ভাল ও গুণগত মানের বীজ সহসায় পেয়ে যাবে। তাদের কারো জন্য অপেক্ষা বা ধর্ণা দিতে হবে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি ২০১৮-১৯ বোরো মৌসুমে ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৭০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ৫৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। বীজতলা থেকে চারা তুলছেন কৃষকরা। এ পর্যন্ত (১০ জানুয়ারি) জেলার সাতটি উপজেলায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর বীজ রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হতে পারে। গত বছর ৬১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। তাতে ধান উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৮৮ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে সদর উপজেলায় ২ হাজার ৭০৮ হেক্টর, নলডাঙ্গায় ৭ হাজার ৮৬০, সিংড়ায় ৩৪ হাজার ৫৬৩, গুরুদাসপুরে ৪ হাজার ৮২, বড়াইগ্রামে ৪ হাজার ৯৯৫, লালপুরে ১ হাজার ১০৮ ও বাগাতিপাড়ায় ৬৮৪ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

চলনবিলের কৃষক আব্দুল বারি, সোলেমান ও ইদ্রিস আলী জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শে তারা এবার নতুন জাতের বীজ সংগ্রহ করে বীজতলা প্রস্তুত করেছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে তা রোপণ করা হবে। নতুন জাতে নতুন কিছু পাওয়ার আশা করছেন তারা। তবে তারা পরীক্ষামূলকভাবে দুই-তিন বিঘা করে আবাদ করবেন। ধানের ক্ষেতে পানি সরবরাহ করছেন কৃষক। হালতিবিলের কৃষক কাউসার রহমান, বেলাল হোসেন, আব্দুল গফুর জানান, তারাও পরীক্ষামূলকভাবে নতুন জাতের ধানের বীজ ইতোমধ্যে জমিতে রোপণ করেছেন। আশানুরূপ ফলন হলে আগামীতে আরো বেশি করে এসব জাতের ধান চাষ করবেন এবং বীজ সংগ্রহ করবেন। তবে এসব বীজের প্রতি আশাবাদী তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, এবার জেলার বেশির ভাগ কৃষক নতুন নতুন জাতের বীজ সংগ্রহ করেছেন। বিশেষ করে জিরাশাইলের বিপরীতে ব্রি ধান-৮১ জাত, ব্রি জাত-২৮ ও ২৯ এর বিপরীতে ব্রি ধান-৫৮, ৮১ ও ৮৪ জাত, ব্রি ধান ২৯ এর বিপরীতে ব্রি ধান-৫৮ জাত এবং স্বর্ণার বিপরীতে ব্রি ধান-৮২ জাত। এরপরেও কৃষকরা সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ধান বীজ রোপণ করছেন ব্রি ধান ২৮ ও ২৯ জাত। গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে বোরোর বীজ রোপণ শুরু হয়েছে চলবে মার্চ মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের যথাযথ চেষ্টা আর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বোরো ফসলে বাম্পার ফলন হবে। সেই লক্ষ্য নিয়ে কৃষকদের পরামর্শ ও উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।

Sharing is.

Share on facebook
Share with others
Share on google
Share On Google+
Share on twitter
Share On Twitter
  • You May Also Like: