যে কারণে মঙ্গলে মানুষ পাঠানো সহজ নয়

মুক্তমত ডেস্ক :: মঙ্গলে মানুষ পাঠানো সহজ নয় এবং সাধারণত আমরা পৃথিবীবাসী প্রায় সকলেই ২০০০ সাল হতে শুনতে পাই, যুক্তরাষ্ট্রের নাসা ২০২০ সালে মঙ্গলে মানুষ পাঠাবে। এমনকি এখন পর্যন্ত প্রতি মাসেই দুই একবার বিভিন্ন বিজ্ঞান সাময়িকীসহ পত্র-পত্রিকাতে সে খবর দেখতে পাওয়া যায়।

এখানে আসলে প্রশ্ন হচ্ছে যে নাসা আসলেই কি মঙ্গলে মানুষ পাঠাতে পারবে কি না? আসলে এটা তাদের একটা মিথ্যা অপপ্রচার। আসলে তারা আমাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে এবং মঙ্গলে যদি সত্যি মানুষে পাঠাতে পারে তাহলে ঐ মানুষগুলো মঙ্গলে বেঁচে থাকতে পারবে কি? এবং উপরে বর্ণিত কথা গুলার সঠিক জবাব ও সঠিক তথ্য আছে কি না? এবং এবার দেখা যাক আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে কি বলে-

প্রথমেই কেবল পৃথিবীর চাঁদের বিষয় চিন্তা ভাবনা করে দেখা যাক এবং সাধারণত সূর্য হতে পৃথিবী নয় কোটি তের লক্ষ মাইল দূরে অবস্থিত। কিন্তু আমাদের পৃথিবীটা কেবল প্রতি ২৪ ঘন্টায় এক ঘুর্ণন দিয়ে থাকে।

পৃথিবী সাধারণত একটি সার্কেলের ভেতরে অবস্থিত আর এই সার্কেলের বাইরে দিয়ে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে চাঁদ পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘুরে বেড়ায়। চাঁদের আবর্তনের পর্যায়কাল এবং তার কক্ষপথের পর্যায়কাল একই হওয়ায় আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের একই পৃষ্ঠ সবসময় দেখতে পাই। চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন, ৭ ঘন্টা, ৪৩ মিনিট এবং ১১ সেকেন্ড সময় নেয় কিন্তু সমসাময়িক আবর্তনের ফলে পৃথিবীর পর্যবেক্ষকরা প্রায় ২৯.৫ দিন হিসেবে গণনা করে। একটি ঘণ্টা আবর্তনের পর্যায়কাল অর্ধেক ডিগ্রি দূরত্ব অতিক্রম করে।

চাঁদ পৃথিবীকে যে অক্ষরেখায় পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করছে, সে অক্ষরেখায় চাঁদ একদিন বা ২৪ ঘন্টায় ১৩°কোণ অতিক্রম করে। সুতরাং পৃথিবীকে প্রদক্ষীণ চাঁদের সময় লাগে ২৭ দিন, ৭ ঘন্টা, ৪৩ মিনিট এবং ১১ সেকেন্ড। এই জন্য আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের একই পৃষ্ঠ দেখে থাকি। পৃথিবী থেকে আমরা চাঁদের শতকরা প্রায় ৫৯ ভাগ দেখতে পেয়ে থাকি। চাঁদ আকাশের সবসময় একটি অঞ্চল থাকে তাকে জৌডিঅ্যাক বলে। যা ক্রান্তিবৃত্তের প্রায় ৮ ডিগ্রি নিচে এবং গ্রহণরেখা উপরে অবস্থান করে। চাঁদ প্রতি ২ সপ্তাহে একে অতিক্রম করে৷ আর তার সাথেই পৃথিবীও ঘুরতে থাকে এবং সার্কেলের ভিতরে বিশেষ করে আর কোন গ্রহ নাই, শুধু পৃথিবী। পৃথিবীর খুব নিকটে সার্কেলের বাইরে আছে কেবল চাঁদ এবং পৃথিবীর অতি নিকটবর্তি উপগ্রহ চাঁদ হবার পরেও পৃথিবী ও চাঁদের দূরত্ব হচ্ছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ মাইল এবং চাঁদে আজও কোন মানব যেতে পারেনি।

যদিও ১৯৬৯ সালে একটি ভুয়া অপপ্রচার করে যুক্তরাষ্ট্র, যে নিল আর্মস্ট্রং চাঁদে গিয়েছিল সেটা ছিল আসলেই একটি নাটক। মঙ্গল গ্রহ আরও অনেক দূরে অবস্থিত। তাহলে নাসা ২০২০ সালে কিভাবে মঙ্গলে মানুষ পাঠাবে তা আমার মাথায় আসেনা।

কারণ, যারা আজও চাঁদে মানুষ পাঠাতে পারে নাই, চাঁদ পৃথিবীর অনেক কাছে থাকার পরেও। আবার সেই ব্যক্তিরা নাকি মঙ্গলে মানুষ পাঠাবে এবং যদি সত্যি মঙ্গলে মানুষ পাঠাতে নাসা সফল হয় তাহলে সেখানে মানুষ বেঁচে থাকতে পারবে কি না এবার সেটা ভেবে দেখা যাক।

আমাদের পৃথিবীর গড় ব্যাসার্ধ হচ্ছে প্রায় ৪০০০০ বর্গ মাইল, তেমনি ভাবেই মঙ্গলের ব্যাসার্ধও ৪০০০০ বর্গ মাইল হতে হবে। তাহলেই কেবল মঙ্গলে ১২ ঘন্টা দিন, ১২ ঘন্টা রাত হবে। পৃথিবীর যেমন চাঁদ আছে অথবা পৃথিবীটাকে চাঁদে ঘুরিয়ে থাকে তেমনি ভাবেই মঙ্গলের সাথে চাঁদের আকর্ষণ থাকতে হবে। আর মঙ্গলও চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীর মতোই ঘুরতে হবে তবেই কেবল মঙ্গলে মানুষ টিকে থাকতে পারবে।

সূর্য হতে আমাদের পৃথিবীর দূরত্ব প্রায় নয় কোটি তের লক্ষ মাইল এবং তেমনি ভাবেই কেবল মঙ্গল ও সূর্যের দূরত্ব নয় কোটি তেরো লক্ষ মাইল হতে হবে তবেই কেবল মঙ্গলে পৃথিবীর সমান আলো ও তাপ পড়তে থাকবে অথবা আবহাওয়া প্রায় পৃথিবীর সমান থাকবে। আর নাহলে সেখানে বসবাস অসম্ভব।

আমাদের পৃথিবীতে যেমন পানি আছে আর পানি থাকার কারণে ঐ পানি হতে জলীয়বাষ্প হয়ে পানি আকাশে গিয়ে মেঘ হয়, আবার ঐ মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণ হয়ে মাটিতে পড়তে থাকে। আর ঐ বৃষ্টির পানির সাহায্যেই কেবল আমরা গাছ-পালা, শাক-সব্জি, ফুল-ফলাদি পেতে থাকি। আর সেসব থেকে শ্বাস-প্রশ্বাসে অক্সিজেন পেয়ে থাকি।

এরকম মঙ্গলে আছে কি? তা না হলে মঙ্গলে মানুষ টিকে থাকতে পারবে না এবং বর্তমানে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ এতোটা কম যে এতে তরল পানি থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু মঙ্গলে বরফ রয়েছে। এর দুই মেরু সম্পূর্ণ বরফ দ্বারা গঠিত। ২০০৭ সালের মার্চে নাসা এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে যে পরিমাণ বরফ রয়েছে তা গলিয়ে দিলে সমগ্র গ্রহটি পানিতে ডুবে যাবে এবং এই জলভাগের গভীরতা হবে প্রায় ১১ মিটার (৩৬ ফুট)। সেখানে কিভাবে বসবাস করা সম্ভব?

তবে মঙ্গলে মহাকাশযানই পাঠানো সম্ভব। কেবল মঙ্গলকে কেন্দ্র করে রকেট উৎক্ষেপণ করাই সম্ভব। মঙ্গলে মানুষের পদচিহ্ন অঙ্কনের প্রধান বাঁধা হলো পৃধিবী থেকে এর বিশাল দূরত্ব। কোনো মহাকাশ যান মঙ্গলে পাড়ি দিতে হলে কমপক্ষে ২২৫ মিলিয়ন কিলোমিটার (২২ কোটি ৫০ লাখ কিলোমিটার) পথ অতিক্রম করতে হবে, যা ব্গিত মিশনগুলো থেকে অনেকগুণ বেশি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান প্রযুক্তিতে নির্মিত রকেটে করে মঙ্গলে যেতে হলে নভোচারীর ৯ মাস সময় লেগে যাবে। তার মানে হলো মহাশূন্যের ওজনহীন স্থানে তাকে দীর্ঘসময় কাটাতে হবে। এত দীর্ঘসময় সেখানে কাটালে শরীরে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।

উদারহণস্বরূপ, দীর্ঘসময় শূন্য অভিকর্ষে (জিরো গ্রাভিটি) কাটালে রেটিনায় রক্ত পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে দেখা দিতে পারে দৃষ্টিহীনতা। এ ছাড়া হাড়ের ভরত্ব ও ক্যালসিয়াম সঙ্কুচিত হতে পারে।

এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হলে বিদ্যমান রকেট প্রযুক্তি থেকে সরে এসে নিউক্লিয়ারভিত্তিক রকেট প্রযুক্তি চালু করতে হবে। যাতে করে খুব কম সময়ে মঙ্গলে পাড়ি দেয়া যায়। আর এটা করতে কমপক্ষে ২৫ বছর সময় লেগে যাবে।

একসময় হয়তো প্রযুক্তির উন্নয়নে মানুষও পাঠানো সম্ভব, সেখানে কিছুদিন অবস্থান করাও সম্ভব। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে বাঁচা অসম্ভব। এজন্য নাসা বলেছিল, তারা মঙ্গলে যেসব মানুষ নিয়ে যাবে তাদেরকে আর পৃথিবীতে ফেরত আনবে না। অর্থ্যাৎ, একেবারেই যেতে হবে। আর সেখানে যাওয়া মানেই যেতে যেতে অন্ধ হয়ে যাওয়া আর অবতরণের পরপরই বাঁচার মত কোন পরিবেশ না থাকায় সাথে সাথেই মৃত্যু।

আমার কথা গুলো কতটুকু যৌক্তিক অথবা গ্রহণযোগ্য সেটা আপনাদের বিবেচনার উপরে ছেড়ে দিলাম। আশা করি, আপনারা বিচার-বিশ্লেষণ করে সঠিক তথ্য বের করবেন।

লেখক: মোঃ মুস্তাফা কামাল। দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী। email: [email protected]

বি: দ্র: এই লেখার বিষয়বস্তুর সাথে সময়ের কণ্ঠস্বরের সম্পাদকীয় নীতিমালার কোন সম্পর্ক নেই। এই লেখা লেখকের নিজস্ব মত। এই লেখায় কেউ প্রভাবিত হলে তার দায়ভার সময়ের কণ্ঠস্বর বহন করবে না।

Sharing is.

Share on facebook
Share with others
Share on google
Share On Google+
Share on twitter
Share On Twitter
  • You May Also Like:
  • Top Views