ইয়াবা পাচার রোধে কর্ণফুলী থানার ‘এক্সরে’ পদ্ধতি

Chittagong

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম ব্যুরো: কৌশলের আর শেষ নেই। অভিনব পদ্ধতিতে পাচার করা হচ্ছে বিভিন্ন মাদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো মাদক পাচার প্রতিরোধে নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও পাচারকারীরাও থেমে নেই। নানা কৌশলে মাদক পাচার ও বিক্রি অব্যাহত রেখেছে তাঁরাও। বাহকদের অদ্ভুত কৌশলে বিস্মিত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। নিত্য নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল দেখে হতবাক পুলিশ বাহিনীও।

চট্টগ্রাম শহরের একমাত্র প্রবেশদ্বার কর্ণফুলী মইজ্জ্যারটেক। কক্সবাজার টেকনাফ তথা দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষ আরাকান সড়ক কর্ণফুলী হয়ে বন্দর নগরীতে প্রবেশ করে। সে সুবাধে নানা মাদকপাচারকারী ও চোরাকারবারী দলের অপরাধীরও পা পড়ে মইজ্জ্যারটেক মোড়ে।এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কঠোর নজরধারীও রয়েছে মইজ্জ্যারটেকে। যদিও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে ইয়াবা সহ মাদক পাচারকারীরা নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। কেউবা সাঁজে সাপুড়ে, কেউ সুন্দরী হিঁজড়া, আবার কেউবা ধরা পড়ে বয়বৃদ্ধ মসজিদের ইমাম, এমনকি কোরআনে হাফেজ, বাহাত্তর বছরের বৃদ্ধ পুরুষ, দুগ্ধজাত কোলে শিশুর মা এমনকি পায়ের জুতায়ও ইয়াবা বহন! কিন্তু পুলিশের তীর্যক চোখ ফাঁকি দিতে গিয়ে এসব শ্রেণী ধরা পড়ে।

তথ্যমতে, মাদক নির্মূলে গত পহেলা ফেব্রুয়ারি হতে ৯ ফেব্রুয়ারি ৯দিনে সর্বমোট ৩৪ হাজার ৭২০ পিস উদ্ধার করে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে কর্ণফুলী থানার চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম। এছাড়াও তিনি অভিযান চালিয়ে গতমাসে ৬০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার ও ৭৭জন বিভিন্ন মামলার আসামীকে গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি করেছেন।এসব শ্রেণীর কারবারী ছাড়াও অভিনব পদ্ধতিতে পেটের ভেতরে বিশেষ কায়দায় ইয়াবা ও স্বর্ণের বার ঢুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে এমন অভিযোগও অহরহ। কখনও পলিথিনে পেঁচিয়ে মুখ দিয়ে, কখনও বিশেষ কায়দায় পায়ুপথ দিয়ে ইয়াবা-স্বর্ণ ঢোকানো হয় পেটের ভেতর। পরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে মেডিসিন খেয়ে তা বের করা হয় মলত্যাগের মাধ্যমে। চোরাকারবারি বা সাধারণ বহনকারীদের টাকার লোভে প্রাণঘাতী এই কৌশলের দিকে ধাবিত করছে পাচারকারী গডফাদারেরা। বহনকারীদের ইয়াবা ও স্বর্ণ বহনে বাধ্য করাতে নতুন নতুন বিচিত্র সব ফন্দি ব্যবহার করছে গডফাদারেরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চিকিৎসকরা বলছেন, এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। পেটের ভেতরে ইয়াবা ও স্বর্ণ ঢুকিয়ে বহন করায় যেকোনও সময় মৃত্যু হতে পারে। এসব জেনেও কেনো মাদক পাচারকারীরা ঝুঁকি নিচ্ছে তার কোন সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে অভাবের তাড়নায় রাতারাতি কোটিপতি কিংবা বিত্তবান হতে মাদক ব্যবসায় জড়াচ্ছেন অনেকে। এমনটি লোকেমুখে প্রচার রয়েছে।

বিগত কয়েক মাসের তথ্যে জানা যায়, চট্টগ্রাম কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক মোড়ে প্রতিদিন সিএমপি পুলিশের চেকপোস্ট ও কর্ণফুলী থানা পুলিশের অভিযানে এ রকম অসংখ্য মাদকপাচারকারী ধরা পড়ে। যাদের অনেকে খেয়ে পেটের ভেতর কিংবা পাকস্থলীতে বেঁধে পাচার করার সময় আটক হন। এক্ষেত্রে কর্ণফুলী থানা পুলিশের ভূমিকা প্রশংসনীয় বলে দাবিদার।

গোপন সংবাদের উপর ভিত্তি করে ইয়াবা পাচারকারীদের আটক করেও অনেক সময় কর্ণফুলী থানা পুলিশেরও আবার হিমশিম খেতে হয়। কিছুতেই সারা শরীর তন্নতন্ন করে খুঁজেও ইয়াবা বা স্বর্ণের হদিস পাওয়া যায়না। কেন না পেটের ভেতর রয়ে যায় মাদক কিংবা স্বর্ণ। অনিচ্ছ্বাসত্বেও পরে সন্দেহ জনক ব্যক্তিদের নিয়ে পুলিশ অফিসারদের নিজ খরচে দৌড়াতে হয় পাশে থাকা নানা মেডিকেল হল কিংবা ডায়গনস্টিক সেন্টারে। অপরাধীদের স্বীকারোক্তিতে অথবা সাধারণ পরীক্ষার পর না হলে ডিজিটাল এক্সরে করিয়ে নিশ্চিত হতে হয়। পেটের ভেতর মরণ নেশা ইয়াবা ও স্বর্ণ রয়েছে কিনা। পুলিশের সাথে নিজস্ব মেডিকেল টিম না থাকায় এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় পুলিশ সদস্যদের।

এ রকম জটিল অভিজ্ঞতা ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়া এবং বেশির ভাগ সফল অপারেশনের নেতৃত্বদানকারী  কর্ণফুলী থানার উপ পরিদর্শক মো. মনিরুল  ইসলাম জানান, ‘গোপন তথ্য ও র্সোসদের স্ট্রং তথ্য থাকার পরও অনেক সন্দেহজনক ব্যক্তিদের তল্লাশী করে মাদক ও স্বর্ণ পাওয়া যায় না। পরে মেডিকেল চেকআপ ও এক্সরে করালে ধরা পড়ে ইয়াবা এমনটি ঘটে থাকে প্রায়।’

অপরদিকে জানা যায়, পুলিশের প্রতিটি মামলা তদন্ত খরচ পর্যাপ্ত না হলেও এসব আনুসঙ্গিক খরচ মিটাতে হয় অফিসারদের স্ব উদ্যোগে। মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এমন চিরুনী তল্লাশি এবং কর্মকান্ডকে স্থানীয়রা স্বাগত জানিয়েছেন।

অপরদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ডা. সুমন বড়–য়া জানান, ‘পেটের ভেতরে ইয়াবা ও স্বর্ণ ঢোকানো হলে যেকোনও সময় মৃত্যু হতে পারে। আর একাধিক স্বর্ণের বার পেটের ভেতরে থাকার কারণে পেটের ভেতরের অর্গানগুলোর স্বাভাবিক পরিচালনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে।’তথ্যমতে, যদিও চোরাকারবারিরা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এসব ইয়াবা ও স্বর্ণ পুনরায় বের করে ফেলে। তারপরেও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কিন্তু রয়ে যায় বলে মন্তব্য করেন চমেক এর এই চিকিৎসক।’

এ প্রসঙ্গে কর্ণফুলী থানার সহকারি উপ-পরিদর্শক মো. জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে চোরাকারবারিদের মধ্যে পেটের ভেতরে করে ইয়াবা ও স্বর্ণের পাচার দেখা যাচ্ছে। সাধারণত আগে থেকে নিশ্চিত হওয়া না গেলে এ ধরনের চোরাকারবারিদের ধরা যায় না। কারণ তল্লাশি করে অবৈধ মালামাল চেক করা হয়। কিন্তু পেটের ভেতরে থাকা কোনও দ্রব্য সাধারণ তল্লাশি করে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ফলে পুলিশের সাথে মেডিকেল টিমের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনেকরি।’তিনি আরো বলেন, বর্তমানে কর্ণফুলী থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আলমগীর স্যারের নেতৃত্বে উপজেলায় মাদক নিয়ন্ত্রেণে অনেকটা সফল। কেনোনা পাচারকারীরা যে কৌশল অবলম্বন করুক না কেনো আমরা ওসি স্যারের নির্দেশে সরকারের জিরো টলারেন্স বাস্তবায়নে বদ্ধ পরিকর।’

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, ইয়াবার ক্ষেত্রে চোরাকারবারিরা পলিথিনে পেঁচিয়ে টিউবের মতো তৈরি করে থাকে। একেকটি টিউবে ২৫০ থেকে ৩০০ ইয়াবা ট্যাবলেট থাকে। এগুলো কখনও পাকা কলার সাথে কখনও কৌশলে মলদ্বার দিয়ে পেটের ভেতরে ঢোকানো হয়।

সুত্রমতে, ৫ থেকে ১৫টি টিউব একসঙ্গে পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে বহন করে পাচারকারীরা। পথে তারা তল্লাশির মুখোমুখি হলেও সাধারণ পদ্ধতিতে তাদের ধরা যায় না। অভিনব সে কৌশল। গত বছরের ২৭মে দুই রোহিঙ্গা নাগরিককে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তারা পেটের ভেতরে ইয়াবা ঢুকিয়ে পাচার করছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বছর দেড়েক আগে কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা এলাকার দিলদার মোহাম্মদ ওরফে লালু নামে এক কিশোর টেকনাফ থেকে পেটের ভেতর ইয়াবা ঢুকিয়ে ঢাকায় রওনা দিয়েছিল। কিন্তু পথিমধ্যে চরম পেটব্যথায় মারা যায় সে। ময়না তদন্তের পর তার পেট থেকে পাঁচ প্যাকেট ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ২০১৬ সালেও পায়ুপথে ইয়াবা বহন করার সময় তা গলে গিয়ে মারা যায় ইসমাইল ওরফে বাঘাইয়া নামে টেকনাফের কচুবনিয়া এলাকার এক তরুণ। এভাবে অসংখ্য দূর্ঘটনা ঘটে থাকে যার কিছু অংশ মাত্র জানা যায়।

কর্ণফুলী জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েক মাসে কর্ণফুলীর বিভিন্ন এলাকা হতে বড় বড় ইয়াবা চালান উদ্ধার করা হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আমাদের অফিসারেরা বেশ দক্ষতা ও সফলতার সাথে কাজ করছেন বলে তা সম্ভব হয়েছে।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তারা বলছেন, ‘পেটের ভেতর ইয়াবা বহনের প্রবণতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। লোভে পড়ে মাদক চোরাকারবারিরা আত্মঘাতী এ কৌশল বেছে নিচ্ছে।’

কর্ণফুলী এলাকার ডায়নামিক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সত্বাধিকারী আব্দুল মালেক রানা বলেন, ‘পেটের ভেতরে লুকানো জিনিস শনাক্তের জন্য উন্নত দেশগুলোতে বিশেষ যন্ত্র রয়েছে। বাংলাদেশেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এরকম যন্ত্র কেনা দরকার।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সদ্য পিপিএম পদকে ভূষিত সিএমপি বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. হামিদুল আলম বলেন, ‘পেটের ভেতরে করে ইয়াবা ও স্বর্ণ পাচার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। অনেক সময় অনিচ্ছাসত্বেও সন্দেহভাজন লোকদের বাহিরের মেডিকেল ল্যাব ও ডায়গনস্টিক সেন্টারে নিয়ে এক্সরে করাতে হয় সেটা সত্য।’ তবে এক্ষেত্রে পুলিশের যদি নিজস্ব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেডিকেল টিম ও জনবল সহ এক্সরে মেশিন থাকতো তবে মাদক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি আরো সহজ হতো বলে আমি মনেকরি। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি। মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন পুলিশের এই উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

Sharing is.

Share on facebook
Share with others
Share on google
Share On Google+
Share on twitter
Share On Twitter
  • You May Also Like:
  • Top Views