নেশার টাকা নিয়ে বিরক্তি থেকে নটরডেম ছাত্রকে খুন করে বান্ধবী!

১:২৬ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯ আলোচিত

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক :: রাজধানীর সবুজবাগে নটরডেম কলেজের ছাত্র ইয়োগেন গোনছালভেস হত্যার ঘটনায় সখিনা বেগম সবিতা (২৬) নামে এক তরুনীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। রোববার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মুগদা এলাকা থেকে ওই নারীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। মূলত প্রতারণার ফাদে ফেলে নেশার জন্য নিয়মিত অর্থ নেওয়া এবং টাকার জন্য বিরক্ত করা এবং হুমকির দেওয়ার ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ইয়োগেনকে হত্যা করা হয়েছে বলে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে দাবী করেছে গ্রেফতার সবিতা।

২০১৩ সাল থেকে সবিতার সাথে নডরডেম ছাত্র ইয়োগেনের সঙ্গে ঘনিষ্টতা রয়েছে। ঘনিষ্টতার সূত্র ধরে একজন ইয়োগেনের ঘনিস্ট আরেক আইনজীবির বিরুদ্ধে করা সবিতার মামলার স্বাক্ষীও ছিলো ইয়োগেন। নিহত ইয়োগেন নেশাগ্রস্থ ছিলো।

গত ১২ ফেব্রুয়ারী রাজধানীর সবুজবাগের একটি বাসা থেকে নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইয়োগেনের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সবুজবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ৩ হত্যা মামলার ছায়া তদন্ত শুরু করে। হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে সিসি টিভির ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে র‌্যাব ও পুলিশ। সিসি ক্যামেরায় বোরখা পড়া অবস্থায় সবিতা নামের এক নারীকে ওই বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। এর অগে খুন হওয়া ইয়োগেনকে নিয়ে ওই নারীকে বাসায় প্রবেশ করতেও দেখা যায়। এর সূত্র ধরে তদন্ত করতে গিয়ে হত্যার রহস্য উদঘাটন করে র‌্যাব ৩।

র‌্যাব জানায়, খুন হওয়া ইয়োগেন এর সাথে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ঘাতক সবিতার ২০১৩ সালে পরিচয়। ২০১৭ সালের দিকে ইয়োগেন নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যায়নকালীন সময়ে তাদের সাথে ঘনিষ্টতা আরও দৃঢ় হয়। ২০১৩ সালে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়ার পর ধানমন্ডি ক্যাম্পাসে জাফর উল্লাহ নামে আরেক ছাত্রের র‌্যাগিং এর শিকার হয় সাবিনা ইয়াসমিন সবিতা। জাফর উল্লাহ রাশেল বর্তমানে জজ কোর্টে আইনজীবি হিসেবে কাজ করছে। জাফর উল্লাহ স্ট্যামফোর্ডে পড়াশুনাকালীন পিপলস হেল্প ফাউন্ডেশন (পিবিএইচএফ) নামে একটি বেসরকারী সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলো। ওই প্রতিষ্ঠানে জাফরের সঙ্গে কাজ করতো ইয়াগোনও। জাফরের সঙ্গে পরিচয়ের কারণে জাফর সবিতাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে প্রতারিত করেছিলো। এসব ঘটনার স্বাক্ষী ছিলো ইয়োগেনও। কিন্তু জাফরের সঙ্গে ইয়োগেনের সম্পর্ক থাকলেও পরে সর্ম্পকে চিড় ধরে। এর মধ্যে এক পর্যায়ে এডভোকেট জাফরের বিরুদ্ধে মামলা করে সবিতা। সেই মামলায় সাক্ষী হয় ইযোগেন। সাক্ষী হওয়ার সুবাধে সবিতার কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা দাবী করতে শুরু করে ইয়োগেন। টাকা না দিলে ইয়োগেন সবিতাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতিও দেখায়। এভাবে কিছুদিন চলার পর জাফরের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষী দিতে রাজী হয় ইয়োগেন। কিন্তু স্বাক্ষ্য দিতে রাজি হওয়ার পর ইয়োগেন এর আশংকা ছিল জাফর তার ক্ষতি করতে পারে। এজন্য ইয়োগেন সবিতাকে অনুরোধ করেছিল তাকে একটি পৃথক বাসা ভাড়া করে দেয়ার জন্য। যাতে ইয়োগেন এর পরিবার এসব ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকে। সবিতা ইয়োগেনকে জানায় পৃথক বাসা ভাড়া নিতে হলে অর্ধেক ভাড়া ইয়োগেনকে বহন করতে হবে। কারণ জাফর এর সাথে ইয়োগেন এরও স্বার্থ জড়িত। গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সবিতা এবং তার মা সবুজবাগের ৯ নং হিরাঝিল মসজিদের ৭৭/এ সামসুলহবের বাসা বাড়া নেয়। ভাড়ার এ্যডভান্স বাবদ ৫ হাজার টাকা দেয়। কিন্তু শর্ত ভঙ্গ করে ইয়োগেন বাসা ভাড়ার টাকা উল্টো সবিতার কাছেই দাবী করে। বিভিন্ন সময়ে মোবাইল বিল ও নেশার টাকার জন্য সবিতাকে চাপ দিতো ইয়োগেন। প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ বার করেও টাকা নিতো। এসব কারণে ইয়োগেনের উপর ক্ষিপ্ত হতে শুরু করে সবিতা।

ইয়োগেনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সবিতা ইয়োগেনকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এজন্য গত ৫ ফেব্রুয়ারী পুরোন ঢাকা থেকে ৪৫০ টাকা দিয়ে কালো ও সবুজ রংয়ের ১টি ব্যাগ এবং ৬৫০ টাকা দিয়ে ১টি বটি ক্রয় করে ইয়োগেনকে হত্যা করার সুযোগ খুঁজতে থাকে। গত ১২ ফেব্রুয়ারী ইয়োগেন সবিতার সাথে কোর্টে দেখা করতে রাজি হয়। তারপর ইয়োগেনকে সাথে করে তার ভাড়াকৃত বাসায় যাওয়ার কথা বলে সবিতার তার মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয় এবং ইয়োগেনকে হিরাঝিল গলির মাথায় অপেক্ষা করতে বলে। অতপর বাসাবো টেম্পু ষ্ট্যান্ড হতে ১টি প্রাণের লাচ্ছি ক্রয় করে। বাসায় প্রবেশ এর পর ইয়োগেন পিপাসা পাওয়ায় জুস কিনতে বাইরে যায়। এই ফাকে সবিতা প্রাণের লাচ্ছি জুসের সাথে চেতনা নাশক ঔষধ মিশায়। অতপর ইয়োগেন জুস কিনে বাসায় ফিরে আসার পর একটি প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম গ্লাসে করে লাচ্ছি খেতে দেয় এবং উক্ত দৃশ্যগুলো ইয়োগেনের মোবাইলে রেকর্ড করে। অতপর ইয়োগেনের মোবাইল হতে ইউটিউব চ্যানেলে ৪ টি ভিডিও আপলোড করে উক্ত ভিডিওগুলো মোবাইল হতে ডিলিট করে দেয়। অতপর ইয়োগেন অচেতন হলে তার হাত পা মুখ কাপড় দিয়ে বেধে ফেলে। তারপর বটি দিয়ে এলোপাথাড়ী কোপাতে থাকে। কোপানোর একপর্যায়ে ইয়োগেন চিত অবস্থা হতে উল্টে যায়। তখন সবিতা তার পিঠের উপর এলোপাথাড়ী কোপাতে থাকে। অতপর সেলোয়ার কামিজ ও ওড়না পরে খালি পায়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। বাসা থেকে বের হয়ে সে একটি রিক্সা ভাড়া করে। সবুজবাগ বালুর মাঠ, তিলপাপাড়া এলাকা দিয়ে রিক্সাযোগে নয়াটোলা মগবাজার এলাকায় তার বান্ধবীর বাসায় যায় এবং তিলপাপাড়া এলাকায় যাওয়ার পর সে তার মোবাইল ফোন চালু করে।