• আজ ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

একরাশ কষ্ট নিয়ে মর্গের দুয়ারে অবিরাম অশ্রুপাত

১১:১৫ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর :: মো. দীপুর চোখেমুখে উদ্বেগ। ক্লান্তিতে শরীর চলছে না। দু-একবার বসেও পড়েন, আবার উঠে গিয়ে ছোটেন আশপাশে। সবাইকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কর্মী মনে করে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধু জানতে চাইছেন একটি কথা- ‘আমার দুই ভাই আর ভাতিজার লাশটা কার কাছে গেলে পাব?’

দীপুর মতো এমন হাজার হাজার আত্মীয়স্বজনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল ঢামেক মর্গ এলাকাজুড়ে। কেউ চিৎকার করে কাঁদছেন, তো কেউ শোকে কান্নার শক্তি হারিয়ে নির্বাক। কেউ আবার প্রিয়জনের লাশ শনাক্ত করতে ঢুকে পড়ছেন মর্গের ভেতরে। তাদের ভিড় সামলাতে মর্গের কর্মীরা বারবারই গেট বন্ধ করে দিচ্ছেন। কিন্তু তাতেও দমে যাননি প্রিয়জন হারানো মানুষগুলো। মর্গের জানালা দিয়ে হলেও একবার প্রিয়মুখ দেখার প্রাণপণ চেষ্টা তাদের।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানমালার কারণে শহীদ মিনার ঘিরে সড়কে ডাইভারশন (বিকল্প যাতায়াত) চালু করে পুলিশ। এ কারণে ঢামেক হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখগুলোও বিধিনিষেধের আওতায় ছিল। চানখাঁরপুল হয়ে ঢামেকের গেটের দিকে যেতে পুলিশি চেকপোস্ট। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে গাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে দায়িত্বরত সার্জেন্ট রাস্তা খুলে দিয়ে বললেন, ‘যান ভাই যান, এতবড় ট্র্যাজেডি। সকাল থেকে আমাদের মনটাও খারাপ।’

পুলিশের মন খারাপের কথা শুনে ঢামেক হাসপাতালের ইমার্জেন্সি গেট পেরিয়ে মর্গের দিকে এগোতে থাকি। সেখানে হাজারো স্বজনের উপস্থিতি। ঢামেকে স্বাভাবিক দিনেও অতিরিক্ত লোকের সমাগম থাকে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য শোকার্ত মুখ। এর মধ্যে আবার শহীদ মিনার থেকেও অনেকে ভিড় করছেন। মানুষে মানুষে ধাক্কা খেয়ে এগোতে থাকি। এরই মধ্যে দুয়েকজন ভিআইপি বিশাল দলবল নিয়ে ঢুকে পড়ছেন হাসপাতালে।

মর্গের সামনে গিয়ে দেখা হয় শোকার্ত দীপুর সঙ্গে। দুই বড় ভাই মোহাম্মদ আলী (৩২) ও অপু রায়হান (৩১) এবং মোহাম্মাদ আলীর তিন বছরের শিশু সন্তান আরাফাতের করুণ মৃত্যুর গল্প শোনান তিনি। তাদের তিন ভাইয়ের ব্যবসা রয়েছে চুড়িহাট্টায়। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবারও দোকানে গিয়েছিলেন তারা। বাবার দোকান দেখতে শখ করে চাচাদের সঙ্গে যান আরাফাত। রাতে দোকান বন্ধ করে বের হচ্ছিলেন তারা। তার দুই বড় ভাই আরাফাতকে নিয়ে ১০ গজ পেছনে ছিলেন। এমন সময় বিকট বিস্ফোরণ। নিজের চোখের সামনেই যেন ঝলসে যায় তিনটি তাজাপ্রাণ।

কথাগুলো বলতে বলতেই দীপুর আহাজারি, ‘আমি ঘটনাচক্রে বেঁচে গেলাম। কিন্তু এ বেঁচে থাকা কী জন্য জানি না। সারাজীবনেও চোখের সামনের এ নির্মম ঘটনা ভুলতে পারব না।’

রহমতগঞ্জের বাসায় দীপুদের যৌথ পরিবার। নিহত অপুর চার মাসের জোনাইরা নামে এক কন্যাসন্তান রয়েছে। আর অপর ভাই মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে দীপুই সবার ছোট। তাদের বোন জরিনা খাতুন বুকফাটা আর্তনাদ করছিলেন মর্গের সামনে। স্বজনরা তাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তার একটাই কথা, ‘এতবড় কষ্ট আমরা কীভাবে নেব? একই পরিবারের তিন তিনজন মানুষ নেই। ছোট্ট আরাফাত ছিল সবার চোখের মণি। সেই আরাফাতও পুড়ে গেল।’

এরই মধ্যে দুপুরের দিকে মর্গের কাছে তথ্যকেন্দ্র চালু করে ঢাকা জেলা প্রশাসন। উপায়ান্তর না দেখে সেখানে গিয়েই নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজ করতে ব্যাকুল হতে দেখা যায় অনেককে। মর্গ এলাকায় ব্যস্ত পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও আনসার সদস্যরা। কিন্তু শুধু দায়িত্বে আটকে নেই, তাদেরও কারও কারও চোখে জল। নিহতরা যেন তাদেরও আপনজন। চকবাজারের আগুনে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ পড়া রোহান খানও (২১) নিহত হয়েছেন।

এ সময় তার বাইকের পেছনে ছিলেন বন্ধু মেহেদী। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে তিনিও নিজেকে বাঁচাতে পারেননি। রোহানের বোনের বিয়ের জন্য কেনাকাটা করতে চার বন্ধু দুই বাইকে অগ্নিকাণ্ডে ওই স্থান দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বন্ধু লাবিব ও আরাফাত বাইক নিয়ে জ্যাম ঠেলে আগেই বেরিয়ে যাওয়ায় তাদের কিছু হয়নি।

রোহানের বাবার নাম হাসান খান, মা রুবিনা ইয়াসমিন। বাসা পুরান ঢাকার আগামসি লেনে। মর্গের সামনে হাসান খান ছিলেন নির্বাক। অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছেন তিনি, কারও কথারই উত্তর দিচ্ছেন না। রোহানের চাচাতো ভাই মামুন খান বলেন, ‘বোনের বিয়েটাও দেখে যেতে পারল না রোহান।’

সন্তান হারা এক মায়ের আকুতি : যা পান, একটু মাংস হলেও, একটু, একটু হলেও দেন! আমার বাবারে আমি কোলে নিমু! আমার বাবারে ডাকলে আসবে না? আমার বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল, বিদেশ যাবে! ও নর্থ সাউথে পড়ে, আমার বাবারে আমি ডাকলে অাসবে তো? যা পান আমার বাবার একটু বের করে দেন।

Loading...