সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ২৯শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

দুই বছর অতিক্রম হলেও অর্থ ও জনবল সংকটে হিমশিম খাচ্ছে নবগঠিত কর্ণফুলী

১:৩৬ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, মার্চ ১২, ২০১৯ চট্টগ্রাম
konofuli

জে. জাহেদ, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: নবগঠিত কর্ণফুলী উপজেলার বয়স দুই বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। দেশের ৪৯০তম সর্বকনিষ্ঠ শিল্পায়িত উপজেলা হওয়া সত্বেও এখন জনবল ও আর্থিক সংকটে ভুগছে। ফলে অনেকের কাঙ্খিত স্বপ্নে ফাটল ধরেছে।

কালভার্ট, সেতু, ড্রেনেজ, পানি নিষ্কাশন, গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে রাস্তা তৈরী ও সংস্কার সহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ থমকে আছে অর্থের অভাবে। অপরদিকে অপর্যাপ্ত রাজস্বের উপর ভর করে অস্থায়ী কার্যালয় ভাড়া, ফার্নিচার কেনা এবং আনুসঙ্গিক যন্ত্রপাতি ও উপজেলা পরিষদের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছে কর্ণফুলী উপজেলা।

বিগত দুই বছরে সর্বকনিষ্ঠ উপজেলা হিসেবে জন্ম নেওয়া কর্ণফুলীতে আয়ের প্রধান উৎস রাজস্ব/কর আদায়ে অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা হয়নি। উন্নয়নমূলক কাজের জন্য ভরসা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড ও সুনির্দিষ্ট বিশেষ তহবিল হলেও চাহিদার অনুকূলে এ সংস্থাগুলোর তহবিলের বরাদ্দ ছিলো নিতান্তই অপ্রতুল।

অর্থের সংকট প্রকট। অর্থের অভাবে অনেক প্রকল্প ও কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছে না কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসন। এমনকি নানা জটিলতায় যথাযথভাবে অর্থ আদায় করতে না পারলেও স্থানীয় সরকার বিভাগ কিন্তু নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে বারবার তাগিদ ও নিজস্ব আয় বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়ে আসছেন।

তার উপর সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া কর্ণফুলী উপজেলায় বিষফোঁড়া হয়ে আছে ২০১৬/১৭ অর্থ বছরের ১০ মাসের রাজস্বের কর্ণফুলীর প্রাপ্য অংশটুকু পটিয়ার হিসাবে জমা হওয়ার বিষয়টি। অথচ কর্ণফুলী উপজেলার নামে হিসাব খোলা হয়েছে ২০১৭ সালের মে মাসে। যা উপজেলা পরিষদ কর্তৃক বারবার তাগাদা দেওয়া সত্বেও এখনো পাওয়া যায়নি বলে সুত্রে জানায়। এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এছাড়াও রয়েছে কর্মকর্তা কর্মচারী সহ নানা পদে জনবল সংকট। জনবলের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে উন্নয়ন, বাড়ছে ভোগান্তি সাধারণ মানুষের। এ অবস্থায় সরকারকে বার্ষিক বরাদ্দ বৃদ্ধি ও জরুরী নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছে নেতারা দীর্ঘদিন।

উপজেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ জানায়, নিয়োগ পাবার আশায় একাধিকবার চাহিদা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও অনেক শূন্য পদে নিয়োগ আসছেনা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। সব মিলিয়ে দুই বছরের অধিক সময়ে কর্ণফুলী উপজেলায় থেমে গেছে উন্নয়ন কাজের চাকা।

উপজেলাবাসী প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হচ্ছে কাঙ্খিত নাগরিক সেবা থেকে। তবে উপজেলার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ফারুক চৌধুরীর দাবি সীমিত তহবিল থেকেই উন্নয়ন কাজ সহ নাগরিক সেবা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে তার পরিষদ।

ভুক্তভোগী ও উপজেলাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, আগামী বর্ষা মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা ও খানাখন্দে পরিপূর্ণ রাস্তাঘাটই ভোগান্তির মূল কারণ হবে।

অপরদিকে ইউপি চেয়ারম্যানেরা জানান, প্রায় প্রতিদিনই নিজ এলাকার স্ব স্ব জনগণ এসব সমস্যা সমাধানে তাদের বাসা বাড়িতে ধর্ণা দিচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। পুরাতন ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ও সড়কের মেরামত কাজ না করার জন্য দুষছেন তাদের পরিষদকে। এসব সমস্যার বিপরীতে বরাদ্দ অপ্রতুল জানালে তিরস্কারের শিকার হচ্ছেন তারা (চেয়ারম্যান মেম্বারেরা)। প্রতিনিয়তই তাদের এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে বলে জানা যায়।

বিগত দুইটি অর্থবছরে উপজেলার রাজস্ব আয় এবং এডিবি ও জলবায়ু ট্রাস্টের বরাদ্দ বিহীন পথচলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় উপজেলার রাজস্ব আয়ের প্রায় সমপরিমাণ অর্থই পরিচলন ব্যায়ে চলে যাচ্ছে। দুই অর্থবছরেই এমনটি হয়েছে। অপরদিকে, কর্ণফুলী উপজেলা গত দুই বছরে পেয়েছে এডিবি ও স্থানীয় সরকার বিভাগ হতে মোট বরাদ্দের মাত্র ৫% কিংবা অপ্রতুল বরাদ্দ। যা উল্লেখ করার মতো নয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এডিবি ২০১৭-২০১৮ সালের শেষ কিস্তি ছিলো মাত্র ১২ লাখ টাকা। এবং ২০১৮-২০১৯ সালের চতুর্থ কিস্তি ছিল ৮০ লাখ। জলবায়ু ফান্ড থেকে কোন বরাদ্দ পাননি। বিগত বছরগুলোতে ঘাটের ইজারা বাবদে কোন টাকাই সিটি কর্পোরেশন থেকে আসেনি। ফলে রাজস্ব আয় থেকে পরিচলন ব্যায় নির্বাহের পর কিছুই থাকছে না, যা উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হবে।

অথচ মোটামুটি নাগরিক সেবা নিশ্চিতে প্রয়োজন প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা যার মধ্যে ভবন নির্মাণ, পাকা সড়ক, ড্রেন নির্মাণ, রাস্তা মেরামত ও আনুষাঙ্গিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই প্রয়োজন ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা।

জানা যায়, এমন আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে সামনে উপজেলাধীন ঘাট গুলো ইজারায় টেন্ডার হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এর রাজস্ব শাখা থেকে এসব ইজারা দেওয়া হয়। গত বছর সিন্ডিকেট করে ইজারা মূল্য আগের বছরের চেয়ে অর্ধেক করে পেলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব শাখায় বারবার তাগাদা দেওয়া সত্বেও নীতিমালা অনুযায়ী বিগত তিন বছর কর্ণফুলী উপজেলার প্রাপ্য অর্থটুকুও পরিশোধ করেননি তারা।

অপরদিকে একটি সুত্র দাবি করছে, সিটি কর্পোরেশন এর ১১নং ঘাট ইজারায় ডাক না দিয়ে পুনরায় কয়েকজন মিলে ভাগিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। অপর একটি সিন্ডিকেট একই উদ্দেশ্যে ১১, ১২, ১৪ নং ঘাট ডাকে না এনে পুরাতন ব্রীজঘাটের মত নিয়ন্ত্রণে নিতে চেষ্টা করছে।

কর্ণফুলীর উপজেলার এক চেয়ারম্যান বলেন, ‘শুধু আগামী বর্ষা মৌসুমেই ড্রেন নির্মাণ, রাস্তা মেরামত ও আনুষাঙ্গিক সংস্কারের জন্য ওনার প্রয়োজন প্রায় ১ কোটি টাকা। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রাপ্ত বরাদ্দে একটি প্রকল্পের কাজও ঠিকমত করা সম্ভব হচ্ছেনা। এমন অবস্থায় সংরক্ষিত মহিলা সদস্যদের সাথে ভাগাভাগি করে আপাতত প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তারা। উন্নয়ন কাজে গতি আনতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের দরকার বলে মনে করেন তিনি।’

এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাবে কাজ যে একদম হচ্ছেনা তা ঠিক নয়। তবে পুরা উপজেলার ভোগান্তি আমাকেও কষ্ট দেয়। সীমিত বরাদ্দেই যতটুকু পারা যায় কাজের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। অর্থ বরাদ্দ পেলেই উপজেলাবাসীর আর ভোগান্তি থাকবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।’

অন্য প্রসঙ্গে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তারবীজ বলেন, ‘আমি যোগদান করার পর শূণ্য পদ জনবল কাঠামো অনুযায়ী তা পূরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই এসব পদে জনবল নিয়োগ দেয়া হবে।’