সংবাদ শিরোনাম
‘অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু আমাদের কারও কাম্য নয়’- অনন্ত জলিল | ‘এই আওয়ামী লীগ মুজিব-সোহরাওয়ার্দী-ভাসানীর আওয়ামী লীগ নয়’ | ‘ছাত্রলীগ সারাদেশেই হামলা চালাচ্ছে’- ভিপি নুর | ‘সরকারবিরোধী হলে ৩০ ডিসেম্বরের পরই রাস্তায় নামতাম’- ভিপি নুর | ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেন ‍দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে জামায়াতের নবনির্বাচিত আমীর | জামায়াতে ইসলামীর নতুন আমীর ‘ডা. শফিকুর রহমান’ | ‘শেখ হাসিনাকে কটাক্ষ করলে জনগণ কাউকে ক্ষমা করবে না’- কাদের | ‘খালেদা জিয়ার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে’- ফখরুল | এবার ওয়ানডে র‌্যাংকিং থেকেও সাকিবের নাম মুছে দিল আইসিসি | ‘সরকারের ব্যর্থতার কারণেই একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে’- ফখরুল |
  • আজ ২৮শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মিয়ানমারে হঠাৎ যুদ্ধ ব্যবসায়ী এরিক প্রিন্স

১১:৩৮ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, এপ্রিল ২, ২০১৯ মুক্তমত

মুক্তমত ডেস্ক :: বহুল আলোচিত ‘ব্ল্যাকওয়াটার’-এর প্রতিষ্ঠাতা এরিক প্রিন্স মিয়ানমারেও সামরিক ঠিকাদারির কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। খবরটি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য উদ্বেগের।

১৯৯৭-এ জন্ম নেওয়া ‘ব্ল্যাকওয়াটার’-এর জনক তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের এই সংস্থাটি ছিল ভাড়াটে সৈনিকদের কারবারি। এরিক প্রিন্স যুক্তরাষ্ট্রের নেভি-সীলের সাবেক কর্মকর্তা। ইরাকে নির্মম ধাঁচের খুনোখুনির জন্য এরিক ও তাঁর সংস্থা দুনিয়াব্যাপী কুখ্যাতি পেয়েছিল একদা। সেই সামরিক ঠিকাদার এরিক আবার খবরের শিরোনাম হলেন সম্প্রতি।

ব্ল্যাকওয়াটার থেকে এফএসজি এবং এফএসজি-মিয়ানমার
ইরাকসহ বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে ব্ল্যাকওয়াট বৈশ্বিক যে দুর্নাম কুড়ায়, তা থেকে রেহাই পেতেই কিছুদিন পর্দার আড়ালে থাকে তারা। বিশেষত বারাক ওবামার শাসনামলে। ২০১০-এ এরিক ‘ব্ল্যাকওয়াটার’ বিক্রি করে দেন এবং ২০১১ থেকে সেই সংস্থাটির নাম রাখা হয়েছে একাডেমি!

পরবর্তীকালে এরিক নতুন নামে আরেকটি সংস্থা গড়েন ‘ফ্রন্টিয়ার সার্ভিসেস গ্রুপস’ বা এফএসজি নামে। কৌতূহলোদ্দীপকভাবে সংস্থাটি নিবন্ধিত হয় হংকংয়ে। সম্প্রতি এই কোম্পানি মিয়ানমারে আরেকটি যৌথ উদ্যোগী কোম্পানির গোড়াপত্তন করেছে ‘এফএসজি-মিয়ানমার’ নামে। দেশটির ডিরেক্টরের অব ইনভেস্টমেন্টের নথি থেকে দেখা যায়, এফএসজি-মিয়ানমারের নিবন্ধন নম্বর ১১৭৮২৫৭৭৯।

বলা হচ্ছে, এই কোম্পানি চীন, জাপান, থাইল্যান্ডসহ মিয়ানমারের ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের’ নিরাপত্তা দেবে। নিবন্ধনের পরপরই এফএসজি-মিয়ানমার তাদের রেঙ্গুন কার্যালয় (লোয়ার পাজুনডাং রোড, বোটাহটাং টাউনশিপ) থেকে নিরাপত্তাকর্মী চেয়ে বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে।

ব্ল্যাকওয়াটারের অভিজ্ঞতা থেকে ইতিমধ্যে এটা জানা, এরিকের ভাড়াটে ‘সুরক্ষাকর্মী’রা অধিকাংশই হয়ে থাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র বাহিনী ছেড়ে আসা সৈনিক ও কর্মকর্তা। বেপরোয়া ‘অভিযান’ পরিচালনায় যাঁদের থাকে ‘সুনাম’।

এরিকের কর্মীরা কেন মিয়ানমারে আসবেন
চীন মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী এবং সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার। দেশটিতে চীনের কেবল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিনিয়োগই আছে অন্তত ৩১ স্থানে। এর মধ্যে কাচিনে তিন বিলিয়ন ডলারের মেইটসোন মেগা ড্যাম প্রকল্প জনবিক্ষোভের মুখে থমকে আছে। একই অঞ্চলে রয়েছে মূল্যবান পাথরের খনি, যা চীনের ব্যবসায়ীদের জন্য দারুণ আগ্রহ–উদ্দীপক এক স্থান। কিন্তু কাচিনে রয়েছে সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও যারা স্থানীয় সম্পদের জনহিস্যার জন্য লড়ছে। একই ধরনের লড়াই চলছে আরাকানে। অথচ এখানেই চীন গভীর সমুদ্রবন্দর এবং পাইপলাইন প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে রেখেছে। এ রকম অবস্থায় জাতিগত সংঘাতে জর্জরিত মিয়ানমারের নীতিনির্ধারক এবং চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘অপ্রচলিত নিরাপত্তাকাঠামো’ দরকার।

শান্তি ও ব্যবসার মধ্যে চীন কখনো প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে এমন দেখা যায়নি। কাচিন ও আরাকান অঞ্চলে দুরূহ সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে মানবাধিকার দলনের জন্য নিন্দিত মিয়ানমার বাহিনীর জন্যও অপ্রচলিত নিরাপত্তা সহায়তা ভালো কাজে দিতে পারে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গত জুন থেকে এরিকের প্রতিষ্ঠান মিয়ানমারে সক্রিয়। তবে ওখানে তারা ঠিক কী ধরনের ‘অভিযান’-এ লিপ্ত এবং কোন অঞ্চলে কোন ধরনের বিনিয়োগকারীদের রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেসব বিষয়ে কোনো তথ্য পাচ্ছে না স্থানীয় নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো। ‘পাং কু’ নামে স্থানীয় এক এনজিওর কর্মসূচি কর্মকর্তা দোই রার মতে, এফএসজিকে কাজ চালাতে অনুমতি দেওয়ার আগে এই কোম্পানি ও তার কর্মকর্তাদের পূর্বতন রেকর্ড এবং তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ বিবেচনায় রাখা জরুরি।

বিষয়টি যেভাবে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের
চীনের সঙ্গে এরিকের হৃদ্যতা বিশ্বে ভাড়াটে সৈনিকতার নতুন এক বিশাল বাজারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মুশকিল হলো, অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ন্যাটোভুক্ত অন্যান্য দেশ থেকে এ রকম বিষয়ে গোপন তথ্য যত সহজে বের করতে পারতেনÑচীন ও মিয়ানমারের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। তবে এফএসজি-মিয়ানমারের কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ঘটেছে। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের ঘটনাবলির মোটাদাগের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার শিকার বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের তাদের পুরোনো বসতিতে ফেরত পাঠাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু এর মধ্যেই রাখাইনে বৌদ্ধপ্রধান আরাকান আর্মির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। সে ক্ষেত্রে সংখ্যায় অল্প হলেও বৌদ্ধ রাখাইনদেরও উদ্বাস্তু হিসেবে নিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

এ রকম অবস্থায় এরিক প্রিন্সের ভাড়াটে নিরাপত্তা বাহিনী রাখাইনেও কোনো রকম অভিযানে যুক্ত হবে কি না সেটা এক উদ্বেগজনক প্রশ্ন। রাখাইনে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে সেখানে বিনিয়োগের নিরাপত্তায় এফএসজি যুক্ত হয়ে পড়লে স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ পেতে পারে। সরকারের প্রতিপক্ষ কাচিন আর্মি ও আরাকান আর্মি নিঃসন্দেহে বিষয়টি নেতিবাচকভাবেই দেখবে, যা মুসলমান রোহিঙ্গা ও বৌদ্ধ রাখাইন উদ্বাস্তুদের বাংলাদেশ থেকে সেখানে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনের পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টাকে আরও বিলম্বিত করতে পারে।

আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

Loading...