প্রকৌশলী ফারুক আলম, একজন রাজনীতিবিদের ইতিকথা

৫:৪৯ অপরাহ্ণ | রবিবার, এপ্রিল ৭, ২০১৯ গুণীজন সংবাদ

প্রকৌশলী ফারুক আলম। একজন সৌম্য, মার্জিত, নির্লোভ ও নির্মোহ ব্যক্তি তিনি। সহজ সরল সম্ভ্রান্ত মুখ! পেশায় তিনি একজন পুর প্রকৌশলবিদ ও কাঠ প্রযুক্তিবিদ। এদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ও তিনি দেশের বাইরে থেকেও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আপাদমস্তক তিনি একজন দেশপ্রেমিক ব্যক্তি। তাঁর মননে, চিন্তায় সবসময় থাকে দেশ এ দশের চিন্তা।

প্রারম্ভিক জীবনঃ ফারুক আলম ১৯৪০ সালের ১ মার্চ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ) শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৃত সুলতান আলম হাওলাদার (সাবেক চেয়ারম্যান) ও মাতা মৃত নূর জাহান বেগম। ছেলে বেলা থেকেই তিনি ছিলেন অনন্য মেধার অধিকারী।

শিক্ষাজীবনঃ তিনি ঢাকা থেকে তাঁর প্রারম্ভিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৫৯ সালে “সুইডিস-পাকিস্থান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি” তে ভর্তি হন। এবং ১৯৬৩ সালে সেখান থেকে কাঠ প্রযুক্তিবিদ্যায় কারিগরি শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি সুইডেনের জনকোপিং এ এরিক ড্যালবার্গ কলেজ অব ইঞ্জিয়ারিং এ ভর্তি হন এবং ১৯৭০ সালে তিনি তিনি পুরপ্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এক ভিন্নধারার শিক্ষা গ্রহণ করে তিনি তাঁর শিক্ষা জীবনকে প্রতিফলিত করেছেন।

কর্মজীবনঃ ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে তিনি “বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন এ” যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এর মহাব্যবস্থাপক হিসেবে সার্থকভাবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৮০ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের প্রথম ৫ তারকা হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের ডেপুটি চিপ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মূলত: পেশায় তিনি একজন পুর প্রকৌশলবিদ ও কাঠ প্রযুক্তিবিদ ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবনঃ রাজনীতি অঙ্গনেও ছিলো তাঁর অনন্য ভূমিকা। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি “জাতীয় পার্টির ” মনোনয়নে শরীয়তপুর-৩ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত “বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন” এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বিশেষ ভূমিকাঃ এমন একজন দেশ প্রেমিক মানুষ যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ও দেশের বাইরে থেকেও এ দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি তৎকালীন সরকারী চাকুরী থেকে বহিংস্কৃত হন এবং চলে যান সুইডেনে। সেখানে গিয়ে যোগদান করেন সুইডেনে ‘মুক্তিযুদ্ধ কার্যকারী কমিটি’তে এবং সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ মানুষের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বরবর্তা ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনের জন্যে আন্তর্জাতিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। যেহেতু সে সময়ে আমেরিকা, চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল না। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন তার এই কর্মকান্ড তৎকালীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁদের এ বিশেষ মূল্যবান অবদানের জন্য সরকার তাদে পুনরায় চাকুরীতে বহাল রাখেন।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাঁর বিশেষ অবদানঃ দেশের উন্নয়ন কার্মকাণ্ডে এমন একজন গুনী, মেধাবী, মহান মানুষের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে তাঁর নিজস্ব এলাকায়। শিক্ষাক্ষেত্রে এবং শিক্ষা উন্নয়নের জন্য তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় তিনি প্রাইমারী বিদ্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। অসংখ্য স্কুল ও মাদ্রাসা এমপিও ভুক্তি করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর এ বিশেষ অবদান জনগনের মনে ব্যপকভাবে সাড়া জাগায়। বিআইডব্লিউটিসি এর চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর নিজ এলাকা ডামুড্যাতে প্রথম বাস স্টপিজ স্থাপন করেন। এছাড়াও লঞ্চ টার্মিনাল স্থাপন করেন তৎকালীন সময়ে। এছাড়া বেকার সমস্যা দূরীকরণে ও দারিদ্রতা বিমচনের লক্ষ্যে তিনি আন্তরিকভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মূখ্য অবদান রেখেছেন। দেশে শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্রতা বিমোচন ও জনগনের আর্থিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনঃ ব্যক্তিগত জীবনে তিনিঢাকা জেলার অন্তর্গত বান্দুরা ও ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পরিবার মরহুম খাঁন বাহাদুর আব্দুল খালেক সাহেবের কনিষ্ঠ কন্যা লায়লা আলমের সাথে ১৯৭৪ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। লায়লা আলম ২০০৬ সালে তিনি জগতের মায়া ছেড়ে পরলোক গমন করেন। তার একমাত্র সন্তান ফাহেম আলম আমেরিকার ফ্লোরিডাতে শিক্ষাজীবন শেষে বাংলাদেশী আমেরিকার নাগরিক, থাকেন আমেরিকার ফ্লোরিডায় এবং সেখানে একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির চেয়ারম্যান।

বর্তমান সময়ঃ তিনি ঢাকার বারিধারা ডিওএইচ থাকেন। বর্তমানে তিনি অবসর জীবনযাপন করছেন। কোন রকম শারিরীক অসুস্থতা নেই। মাঝে মধ্যে তিনি আমেরিকায় বসবাসরত ছেলের কাছ থেকে ঘুরে আসেন। বিকেলে নামাজ পড়ে পার্কে হাঁটাহাঁটি করেন। এভাবেই তিনি তাঁর অবসর জীবনের সময়গুলো কাটান। একজন সৎ দেশপ্রেমিক প্রতিভাবান গুণী ব্যক্তিত্বের অবদান ভুলবার নয়। আমরা তাঁর সার্বিক মঙ্গল কামনা করছি।

লেখক- আইরিন কাকলী, কবি ও সাহিত্যিক।