সংবাদ শিরোনাম
নরসিংদীতে প্রথমবারের মতো সর্বাধুনিক কার ওয়াশ ও সার্ভিসিং সেন্টার উদ্বোধন | রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে ‘ফইন্নি গ্রুপের’ ৬ সদস্য আটক | এবার চমেক চিকিৎসকদের জন্য ‘নোবেল’ চাইলেন মেয়র নাছির | তানোরে অবৈধ এসটিসি ব্যাংক সিলগালা | ফাঁড়িতে আসামির মৃত্যু: পুলিশ-এলাকাবাসীর সংঘর্ষে আহত ৩৩, পাঁচ পুলিশ প্রত্যাহার | লালমনিরহাটে সহকারী পরিচালকের বেত্রাঘাতে স্কুলছাত্রী অজ্ঞান | সাগরে মৎস আহরণে নিষেধাজ্ঞা, ফিশারিঘাট হারিয়েছে চিরাচরিত রুপ | ‘আবরার পানি খাইতে চাইলে পানি দেওয়া হয় নাই’ | নান্দাইলে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ রাখায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা | মাগরিবের আজানের ২০ মিনিটের মধ্যে ছাত্রীদের হলে ঢোকার নির্দেশ! |
  • আজ ২রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রমজান মাস এলেই বেড়ে যায় খাদ্যদ্রব্যের দাম, নিয়ন্ত্রণ করবে কে?

২:৫৯ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, এপ্রিল ১৯, ২০১৯ চট্টগ্রাম
mangso

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম ব্যুরো: গরুর মাংসের দাম নিয়ন্ত্রণহীন। বড় বিচিত্র আমাদের কারবার। দাম একবার বাড়লে আর কমেনা। কর্ণফুলীতে পবিত্র মাহে রমজান মাসকে সামনে রেখে এখন থেকেই গরুর মাংসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে মাংস ব্যবসায়ীরা।

অনেক দোকানদার চোখ বন্ধ করে বিক্রি করছে ৪০০ টাকা কেজির গরুর মাংস বর্তমানে  ৬৫০ টাকা হতে ৭০০ টাকা করে। কোন কোন সময় খাসির মাংস যেখানে বিক্রি করা হতো ৭০০-৭২০টাকা সেখানে খাসির মাংসের দামে গরুর মাংস বিক্রি অবাক করেছে সাধারণ মানুষকে।

প্রতি বছর রমজান মাস এবং রমজানের ঈদ এলেই ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে গরুর মাংসের দাম বাড়িয়ে দেয়। এবারো তা করতে শুরু করেছে । স্থানীয়রা জানায়, ভ্রাম্যামান আদালত পরিচালনা হচ্ছেনা দেখে উপজেলার শিকলবাহা, ফকিরন্নিরহাট, বোর্ড বাজার, চরপাথরঘাটা পুরাতন ব্রীজঘাট মাংসের দোকানে যেনো আগুন লেগেছে। একবার মাংসের দাম বাড়লে পরে আর কখনো দাম কমেছে বলে তাদের ইতিহাসে নজির পাওয়া যায়নি।

খোয়াজনগরের ব্যবসায়ি আলহাজ্ব আব্দুল শুক্কুর (৬৫) জানান, ‘শবে কদরে দিনে মাংস কিনতে এসে অবাক হলাম। ৭০০ টাকা মূল্যে চড়া দাম হাঁকিয়ে গরুর মাংস কি হিসেবে বিক্রি করছে সেটা বোধগম্য হয়নি আমার। পরে নিজেই চলে আসলাম।’

তিনি আরো বলেন, আমার জানা মতে এভাবে স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে এই পর্যন্ত গরুর মাংসের ম‚ল্য ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০০ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। ধনী শ্রেণীর লোকেরা এই চড়া দামেই নিঃশব্দে ১০ কেজি ১৫ কেজি করে গরুর মাংস কিনে নিয়ে যাচ্ছে। আর সাধারণ স্বল্প আয়ের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে গরুর গোশত’র স্বাদ নিতে। এই দুর্ম‚ল্যের বাজারে সাধারণ মানুষ এখন গরুর গোশত খাওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারছে না। যে হারে দাম বাড়াচ্ছে তাতে আগামী কয়েক বছরে প্রতি কেজি ২/৩ হাজার হলেও করার কিছু থাকবেনা।

তা ছাড়া সামনে রমজান। যেখানে উন্নত বিশ্বের মুসলিম প্রধান দেশে রমজান মাসকে সামনে রেখে মাছ, তরকারি ও কেনাকাটায় বড় ধরনের ছাড় দেয়া হয় যেমন: আরব আমিরাতের আবুধাবিতে রমজান মাসে নাগরিকেরা যেন সহজে খাবার পণ্য কিনতে পারে সে ভর্তুকি সুবিধা পায়। ‘স্মার্ট পাস ডিজিটাল প্লাটফর্ম’ পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমেই নানা পণ্য কম দামে কিনতে পারেন তাঁরা।

এমনকি রমজানে কষ্ট লাঘবে পণ্য বিক্রিতে ‘হোম ডেলিভারী’ সুবিধাও দেয়া হয় খাদ্যপণ্য সরবরাহে কিন্তু আমাদের দেশে সম্পুর্ণ ভিন্ন রমজান আসার আগেই পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। আড়তদার ও মজুদদারেরা রমজান মাসে চাহিদা সম্পন্ন পণ্যসামগ্রী স্টোরে জমা রেখে দাম বাড়ায় । যা অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের কাজ বলে উল্লেখ্য করেছেন নয়াহাট জামে মসজিদের মুসল্লী জাহাঙ্গীর আলম।

গত ১মাস আগেও চরপাথরঘাটা গোশতের দোকানে এক কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৪০০-৪৫০ টাকা। রমজান মাসকে সামনে রেখে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা হঠাৎ কেজিপ্রতি গোশতের দাম বাড়িয়েছে ২৫০-৩০০ টাকা। যা গরিবের নাগালের বাহিরে।

গরুর মাংসের এই ম‚ল্য এখন সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। ধারণা করা যায়, এই অবস্থা হলে দেশের ৮০ ভাগ মানুষের পক্ষে গরুর গোশত কিনে খাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। গরুর গোশত পরিণত হয়েছে এখন ভাগ্যবানদের খাবারে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক মাস আগের বেশি দামেই গরু ও খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে সাথে বেড়েছে মুরগির দাম। অন্যদিকে মাছের দাম কিছুটা বাড়লেও অপরিবর্তিত আছে সবজির দাম।

গরুর মাংসের দাম বেশি হওয়ার কারণ জানতে মাংস ব্যবসায়ী আকবর হোসেন, আব্দুল খালেক, মো. কফি, জহুর আহাম্মদ, জোস মোহাম্মদ এর সাথে ক্রেতা সেঁেজ কথা হলে তাঁরা সকলে বলেন, এখন খরচ বেশি তাই বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। প্রতি কেজি ৬০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।

এদিকে আগের সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে। চরপাথরঘাটার মুরগি বিক্রেতা নুরুল আজম বলেন, গত কয়েকদিন আগে থেকে গরুর মাংসের দাম বাড়তি থাকায় ব্রয়লার মুরগির চাহিদা বাড়ছে ও দামও বেড়েছিল। এ সপ্তাহে কেজি প্রতি ব্রয়লার মুরগি ১৫-২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং কক মুরগি প্রতিপিস ২৫০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা ও দেশি মুরগি ৩৫০-৪৫০ টাকায়।

ব্রীজঘাট কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ সবজি গত সপ্তাহের দরে বিক্রি করছে। প্রতি কেজি সাদা আলু ১৬-১৮ ও লাল আলু ২০-২২ টাকা, বেগুন ৫০-৬০ টাকা, ফুলকপি আকারভেদে ৩০-৫০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, শিম প্রকারভেদে ৩৫-৫০ টাকা, টমেটো ২০-৩০ টাকা, গাজর ২৫-৩৪ টাকা, ম‚লা ৫০-৬০ টাকা, শশা ও খিরা ৪০-৫০ টাকা, পেঁপে ৩৫ টাকা, মিষ্টি কুমড়ার পিচ ৭০-৮০ টাকা, বরবটি ৬০-৭০ টাকা, শালগম ৩৫ থেকে ৫০ টাকা, ঢেঁড়স ৫০-৬০ টাকা, কচুরলতি ৪০-৫০ টাকা, মটরশুটি ৫০-৬০ টাকা, কাঁচা কলা প্রতি হালি ২০-৩২ টাকা, লেবু প্রতি হালি ২০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৫০-৬০ টাকা দরে বিক্রি করছে।

প্রতি আঁটি লাউ শাক ২৫ টাকা, লাল শাক, পালং শাক ১৫ টাকা, পুঁই শাক ও ডাটা শাক ২০-৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি পেঁয়াজ প্রকারভেদে কেজি প্রতি ১৭-৩০ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ৩০-৩৫ টাকা বিক্রি করছেন বিক্রেতারা।

মাছ বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি রুই ২৬০-৩০০ টাকা, কাতলা ৩২০ টাকা, তেলাপিয়া ১৪০-১৬০, সিলভার কার্প ২০০-২৫০ টাকা, গলদা চিংড়ি ৪৫০-৮০০ টাকা, পুঁটি ১৮০-২০০ টাকা, পোয়া মাছ ১৫০-২৫০ টাকা, ছোট ইলিশ ৫৫০-৬০০ টাকা, মলা ১৮০-২০০ টাকা, শিং ২৫০-৩০০, দেশি মাগুর ৩৫০-৪০০ টাকা, পাঙ্গাস ১৩০-১৫০ টাকা, চাষের কৈ ২০০-২৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ডিমের দামও গত সপ্তাহের দামে অপরিবর্তিত রয়েছে। ফার্মের লাল ডিম প্রতি হালি ২৮-৩২ টাকা এবং দেশি মুরগির ডিম ৪৬ টাকা ও হাঁসের ডিম ৪৪-৪৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

আজ শুক্রবার কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। প্রতিটি মাংসের দোকানেই থরে থরে সাজানো হয়েছে মাংস। বাড়তি দামের নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি মাংসের বাজারে। দাম বেশি হলেও ভালোই বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন মাংস ব্যবসায়ী অথচ তারপরেও তারা সারতে পারছেন বলে চিন্তার ভাঁজ কপালে। যা লোভ দেখানো মাত্র।

তবে অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়ানোকে অন্যায় দাবি করে ভোক্তারা বলেন, দাম বেড়েছে বলে কয়েকদিন  মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হয়েছে। কিন্তু পরিবারের ছোটদের কাছে এটা অসহ্যের। তাই দাম বেশি হলেও তাদের কথা চিন্তা করেই বাড়তি দামে মাংস কিনতে হচ্ছে বলে জানান।

বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আজকের বাজারে গরুর মাংস কেজি প্রতি ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে; এক মাস আগেও যা ছিলো ৪০০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা। তবে আজ খাসির মাংস চোখে পড়েনি। অনেকে দাম ৬৫০-৭০০ টাকায় বলে বিক্রি করছে বলে জানান।

গরুর মাংসের দাম ৭০০ টাকা বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মাংস ব্যবসায়ী মামুনুর রশিদ বলেন, গরুর দাম বাড়তি তাই আমরা আজকেও হাড় ছাড়া মাংস ৭০০টাকা ও হাড়সহ মাংস ৬০০-৬৫০ টাকায় বিক্রি করছি। কেনো হঠাৎ গরুর দাম বেড়ে গেছে জানতে চাইলে তিনি কোন সঠিক কারণ জানাতে পারেননি।

তবে অপরদিকে দাড়িয়ে থাকা মাংস ক্রেতা মো. নাছির বলেন, ওরা ইচ্ছা করে রমজানের আগে দাম বাড়াচ্ছে। আর একেক খসাই থেকে গরু ব্যবসায়ীরা বকেয়া পায় ১৫-২০-২৫ লাখ টাকা করে। সে কারণে তাদেরকে কম দামের গরুও উচ্চ দামে ধরিয়ে দিচ্ছে গরু ব্যবসায়ীরা। বকেয়া টাকার কারণে কসাইরাও কিছু বলতে পারেনা বলে জানান তিনি।’

এদিকে মাংস কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে ক্রেতাদের। পুরাতন ব্রীজঘাট বটগাছ তলা বাজারের কয়েকজন মাংস বিক্রেতার সঙ্গে দর কষাকষির পর খালি হাতে ফিরতে দেখা যায়। অনেকে বলেন, ভেবেছিলাম সামনে রমজান মাংসের দাম কিছুটা কমবে কিন্তু বাজারের চিত্র ভিন্ন, কমার পরিবর্তে দাম আরও বেড়েছে। এমন চলতে থাকলে মাংস খাওয়াই বাদ দিতে হবে।

এদিকে পাশের কাঁচাবাজারে সবজির দোকান গুলোতে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও কমছে না নিত্য প্রয়োজনীয় কাঁচা পণ্যের দাম। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাড়তি দামেই স্থিতিশীল রয়েছে সব ধরনের সবজির দাম। বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ওপারে সদরঘাট কাঁচাবাজার ও কর্ণফুলী উপজেলার বাজারগুলো থেকে কেজি প্রতি তরকারিতে ১০ টাকা ব্যবধান। যা অসম্ভব একটি পার্থক্য বলে জানান ক্রেতারা।

অন্যদিকে মুদি পণ্যের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্য প্রয়োজনীয় মুদি পণ্যের দামে তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে মুদি পণ্যও। বাজার মনিটরিং ও মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমান আদালত না থাকায় দিনদিন লাগামহীন হচ্ছে কর্ণফুলী উপজেলার প্রতিটি বাজার এমনটি ধারণা সাধারণ মানুষের। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলেন, খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইতে দাম বেশি হলে আমরা কি করব।

এবিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ জানান, রমজানের আগে আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্যই ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করবো। পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন’কে রমজান মাসে কর্ণফুলীতে সেবা দিতে বলা হয়েছে।’