ধান ফলায় কৃষক, মুনাফা লুটে মজুতদার ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা!

১০:২০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫, ২০১৯ সিলেট
dhan

মঈনুল হাসান রতন, হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ হবিগঞ্জে বানিয়াচঙ্গে পুরোদমে চলছে বোরো ধান কাটা। ফলনও হয়েছে ভালো। এতে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। কিন্তু বাজারে গিয়ে কৃষকের সেই হাসিমাখা আর থাকছে না। কারণ, বাজারে ধানের দাম কম। হাওর অঞ্চলের ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না কৃষক। এই নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশার অন্ত নেই। মিলার-আড়তদার ও ফড়িয়াদের ইচ্ছের উপরই নির্ধারণ হচ্ছে ধানের মূল্যে। কৃষকদের বাধ্য হয়ে এ মূল্যেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।

অনেকের মতে বাজার মূল্য নিন্ত্রয়ণে হাওর অঞ্চলে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় বেপারী ও আড়ৎদাররা ফড়িয়াদের মাধ্যমে ধান ক্রয় করে ট্রাক যোগে ধান চালের ক্রয় কেন্দ্র ভৈরব, নারায়নগঞ্জ, আশুগঞ্জ, বি-বাড়িয়া, কুমিল্লা, সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ বঙ্গের কয়েকটি জেলায় ধান প্রেরণ করে থাকেন।

স্থানীয় বেপারী ও আড়ৎদাররা ওই সব এলাকার মিলার ও আড়ৎদারদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে সেখানকার মূল্যের ওপর ভিত্তি করে পড়তা অনুয়ায়ী কৃষকদের নিকট থেকে ধান ক্রয় করে থাকেন। ফড়িয়ারা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিকট থেকে ধান ক্রয় করে স্থানীয় আড়ৎ ও বেপারীদের কাছে মণ প্রতি ১৫/২০ টাকা মুনাফায় সরবরাহ করে থাকেন। বৈশাখ মাসে ধান কাটা শুরুর সাথে সাথে হাওরে কৃষকদের ধানের খলা থেকে প্রতিমণ ভেজা ধান বিক্রি হয়েছে ৪৮০ টাকা ও শেষ দিকে ৪৫০ টাকা। এসব ধান শুকিয়ে মণ প্রতি ৩০ থেকে ৩২ কেজি টিকেছে বলে স্থানীয় আড়ৎদাররা জানান। বর্তমানে মোটা ধান ৪৫০ ও শুরু ধান ৪৯০ টাকা মণ ধরে কেনা-বেচা হচ্ছে।

কৃষকরা জানিয়েছেন এবার বাম্পার ফলন হলেও মাঝ পথে শিলা বৃষ্টি ও প্রচন্ড ঝড়ে কৃষকের স্বপ্নভরা আশা গুড়ে বালি। যাও হয়েছে তাও আবার সংরক্ষণ ও গোলার অভাবে বিপুল পরিমান ধানই বিক্রি করে দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। এছাড়া ঋণ শোধ ও সাংসারিক খরচ মেটাতে কৃষকরা অহরহ ধান বিক্রি করছেন। স্থানীয় বাজারগূলোতে চাল বেচা কেনার সুযোগ না থাকায় ক্ষুদ্র কৃষকরা কিছু বাড়তি মূল্য পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। মিলারদের সরবরাহকৃত প্যাকেটজাত চালাই বাজার দখল করে আছে। স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এবার বানিয়াচং উপজেলায় উৎপাদনের ল্যমাত্রা ছিল জমি ৩৫ হাজার ৫শ হেক্টর। তন্মধ্যে অর্জিত হয়েছে ৩৫ হাজার ৫শ২০ হেক্টর। অনুকূল প্রকৃতি ও পরিবেশে চাষাবাদ ল্যমাত্রা বৃদ্ধি ও বাম্পার ফলনে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বানিয়াচং উপজেলায় হাইব্রীড ৮৩ হাজার ১৬৬ মেট্রিকটন, উফশী ৬৫ হাজার ৮০৪ মেট্রিক টন ও স্থানীয় জাত ৮০ মেট্রিক টন। কৃষকরা বছরের খোরাকী রেখে ধান বিক্রি অব্যাহত রেখেছেন।

বানিয়াচংয়ের কৃষক আব্দুল খালেক জানালেন, সংরক্ষণের অভাবে ধান মাড়াইয়ের সাথে সাথে হাওর থেকেই প্রতিমণ ধান ৪৫০ টাকা থেকে ৪৯০ টাকা মূল্যে কয়েক দফায় ৫শ মণ ধান বিক্রি করেছেন। কৃষক ইলিয়াছ মিয়া বললেন, শুকনা ধান বিক্রির জন্য বিভিন্ন আড়ৎ ও ফড়িয়াদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছি। সরু ধান ৫শ টাকার উপরে মূল্য বলছে না। তিনি আক্ষেপের সুরে বললেন কৃষকদের গোলায় ধান থাকলেই মূল্য কম। আর গোলা খালি হলেই মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে যায়।

কৃষক হেলিম মিয়া ক্ষোভের সাথে বললেন, আড়ৎদার ও মিলাররা কৃষকদের নিকট থেকে সস্তা ধরে লক্ষ লক্ষ মণ ধান মুজদে নিয়ে নিচ্ছে। কিছু দিন পরে এ ধান-ই তারা বিক্রি করবে ৯০০ ও ১০০০ টাকা মণ ধরে। বানিয়াচং উপজেলার সুজাপুর ইউনিয়নের বাল্লা হরিপুর গ্রামের কৃষক জয় কুমার চৌধুরী জানান, তিনি একুশ কানি (সাত একর) জমিতে বোরো চাষ করেছেন। উৎপাদনও ভালো হয়েছে। প্রতি মণ (৪০ কেজি) ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ৭০০ টাকা। কিন্তু বাজারে ধান বিক্রি করেছেন প্রতি মণ ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। ধান ফলায় কৃষক আর মুনাফা লুটে মুজতদার ও মধ্যস্বত্ত্বভোগী শ্রেণী।

কৃষকেরা জানান, উৎপাদন খরচ থেকেও কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। এ বিষয়ে বানিয়াচং উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ দুলাল উদ্দিন এর সাথে আলাপকালে তিনি জানান, বর্তমান বাজার মূল্যে ধান বিক্রয় করে কৃষক অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, সরকারিভাবে এখনো ধান না কেনায় তাঁরা বিপাকে পড়েছেন। কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সরকারীভাবে দ্রুত ধান ক্রয় করতে সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন হাওর অঞ্চলের হাজারো কৃষক।