ফুলবাড়ীতে জিপিএ-৫ পাওয়া অতি দরিদ্র তিন শিক্ষার্থীর পড়াশুনা অনিশ্চিত

৪:২৪ অপরাহ্ণ | সোমবার, মে ১৩, ২০১৯ দেশের খবর, রংপুর

অনিল চন্দ্র রায়, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি- কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে অতিদরিদ্র পরিবারের তিন শিক্ষার্থী এস এস সি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েও অর্থের অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারবে কি না সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত নয়।

প্রদীপ পাল:
এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি হতে পারবে কি-না দরিদ্র পরিবারের সন্তান ও চা বিক্রিতা মেধাবী ছাত্র প্রদীপ পাল। মা মলি রানী পাল গৃহিনী। বাবা শ্যামল চন্দ্র পাল একজন ক্ষুদ্র চা বিক্রিতা।

শ্যামল পাল বালারহাট বাজারে ছোট একটি দোকান ভাড়া নিয়ে দুই ছেলেসহ চা বিক্রি করে কোন রকমেই চলে তাদের সংসার। দারিদ্রতার সীমাহীনতা তাকে আটকাতে পারেনি পড়ালেখা থেকে দুরে রাখতে। বড় ছেলে মলয় পাল ও ছোট ছেলে প্রদীপ পাল চা বিক্রির পাশাপাশি নিয়মিত স্কুলে যেত। বড় ছেলে মলয় পাল ২০১৭ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৩ পয়েন্ট পেয়েছেন।

সে বর্তমানে চলতি এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছোট ছেলে প্রদীপ পাল ২০১৬ সালে জেএসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন এবং বালারহাট আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সে এবারও এসএসসিতে জিপি এ-৫ পেয়ে গরীব বাবা-মার মূখে হাসি ফুটিয়েছন। তার বাড়ী কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেষা বালাতাড়ি গ্রামে শ্যামল পালের দ্বিতীয় ছেলে প্রদীপ পাল।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় বাবা-মা দুজনেই ছেলেকে কোন কলেজে ভর্তি করাবেন তা নিয়ে হতাশায় ভুগছেন। এরপরেও নেই তাদের টাকা পয়সা।

বাবা শ্যামল পাল জানান, আমরা বাপ-ছেলে মিলে চায়ের দোকানে চা বিক্রি করে কোনরকমে খেয়ে না খেয়ে দুই ছেলের পড়ালেখায় ছিলাম সচেতন। তাদের মাঝে মাঝে বলতাম, আমাদের অভাব সংসার। নেই জমিজমা। চা বিক্রি করেই আমাদের চলতে হয়। কলেজে ভর্তির জন্য মেধাবী প্রদীপ এর পরিবারের অর্থ না থাকায় উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইচ্ছা থাকলেও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে বসেছে মেধাবী প্রদীপ পালের।

সাবিনা ইয়াছমিন নিথী:
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বালারহাট আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ গোল্ডেন-৫ পেয়েছে সাবিনা ইয়াছমিন নিথী। নিথি ২০১৩ সালের পিএসসি ও ২০১৬ জেএসেিত জিপিএ-৫ পেয়ে গরীব বাবা-মার সুনাম অর্জনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানেরও সুনাম অর্জন করেছে। নিথী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেষা কৃষ্ণানন্দবকসি গ্রামের দিন মজুর ইউসুফ আলীর মেয়ে।

দিনমজুর ইউসুফ আলী এলাকায় দিনমজুর কাজের পাশাপাশি মেয়ে-ছেলের পড়ালেখার খরচ জোগাতে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। স্বল্প আয়ে মেয়ে নিথী ও ছোট ছেলে লুৎফর রহমানের স্কুলের পড়ালেখার খরচ জোগাতে হয় তাকেও। মা আদরী বেগম নিজ বাড়ীতে গৃহীনির কাজ শেষে আবার কোন কোন দিন অন্যের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করেন। অভাবের সংসারে কিভাবে মেয়ের পড়ালেখার কাজ চালাবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না নিথীর বাবা-মা। একমাত্র সম্পদ ভিটেবাড়ির পাঁচশতক জমি।

সাবিনা ইয়াছমিন নিথী জানান, আমার গরীব বাবা-মা কিভাবে আমাকে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি করাবে ভেবেই পাচ্ছি না। তার উপর সামনের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার সাধনা যেন তার পূর্ন হয় সে জন্য সকলের কাছে আর্শীবাদ চান। সাবিনা ইয়াছমিন নিথী স্বপ্ন সে ডাক্তার হয়ে সমাজের গরীব দু:খীদের পাশে দ্বাড়াতে চায়।

মা আদরী বেগম জানান, ছেলে-মেয়েক পড়ালেখা করায় আরো দুশ্চিতায় পড়া নাগে বেশি। এলা ছোঁয়া মোর ভাল ফল করছে এরচেয়ে আনন্দ যেমন তার চেয়ে বাবা-মা হিসেবে কষ্ট অনেক বেশি। মেয়েটা হামার ডাক্তার হবার চায়। কটে ভর্তি হবে, টাকা কোটে পামো। বাড়িভিটা পাঁচ শতক জমি ছাড়া আর কিছুই নাই হামার। এরপরেও ঘরে থাকেনা খাবার থাকেনা টাকা পয়সা। ছোট ছেলেটি দশম শ্রেণীতে পড়ছে। সামনের দিনে ছেলে ও মেয়ের লেখা পড়ার খচর কি ভাবে মিটাবে ভেবেই পাচ্ছেন না তার পরিবার। এ নিয়ে নিঘুম পার করছে পরিবারের সবাই।

শাহারিয়া হোসাইন:
জিপিএ-৫ পেয়ে অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি হতে পারবে কিনা তা নিয়ে শংকা পড়েছে শাহারিয়া হোসাইন ও তার দরিদ্র পরিবার। উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তি গোরকমন্ডপ গ্রামে দিনমজুর মমিনুল হকের ছেলে। মমিনুল হকের দুই ছেলে এক মেয়ে। শাহারিয়া হোসাইন সবার বড়। ছোট ছেলে তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ে। মেয়েটা সবার ছোট। পরিবারের অভাবঅনটন থাকায় ছোট বেলা থেকে বালাতাড়ি গ্রামে নানা বাড়ীতে থাকেন শাহারিয়া হোসাইন। নানা বাড়ীতে থেকে টিউশনি ও দিনমজুরের কাজ-কাম করে এবারে বালারহাট আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। অভাবের তাড়নায় ইচ্ছা থাকলেও ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে বসেছে শাহারিয়া হোসাইন ।

শাহারিয়া হোসাইন জানান, নানা বাড়ীতে থাকলেও সে নিজে কোন সময় টিউশনি ও এমনকি দিনমজুরীর কাজ করে পড়ালেখার খরচ যোগার করেছে। শিক্ষক আর বন্ধুদের সহযোগিতায় এসেছে এতদূর। অর্থাভাব আর বাবা-মায়ের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় ডাক্তার হবার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকায় করছে শাহারিয়া হোসাইন। এখন সমাজের বৃত্তবানদের সহযোগিতাই পারে তার স্বপ্ন পূরণ করতে।

বাবা দিনমজুর মমিনুল হক জানান, অভাবের সংসারে ৫জন সদস্য। যে দিন কাজ জোটে সেদিন ভাল মন্দে মুখে ভাত উঠে। আর কাজ না জুটলে তিনবেলা খাবার থাকেনা। ধারদেনা করে কোন রকমে সংসার চলে। মা শাহানাজ বেগমও অন্যের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে। মেধা দেখে দিন মজুরীর কাজ-কাম করে ছেলেকে জুগিয়েছেন পড়ালেখার খরচ। পড়ালেখার খরচ যোগাড় করতে শাহারিয়া হোসাইনের অবসর সময় দিনমজুরের কাজ করে আজ এতদূর আসতে পেরেছে। আগামীতে কিভাবে ওর পড়াশুনা চলবে তা নিয়ে দুশ্চিতায় কাটছে পরিবারের সবার।