এই বড় ভাইয়ের নির্দেশে খুন, তাও ভুল জনকে!

২:৪৬ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, মে ১৭, ২০১৯ আলোচিত

সময়ের কণ্ঠস্বর, চট্টগ্রাম :: গত মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ হাজি পাড়ায় রাজু আহমেদ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে এক কিশোর গ্যাং গ্রুপ। নির্মম খুনের শিকার রাজু আহমেদ হাজি পাড়ার আল আমীন কলোনীর বাসিন্দা। পেশায় রিকশা চালক রাজু এলাকায় নৈশ প্রহরীর কাজও করতেন।

এ খুনের ঘটনায় জড়িত ৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলো- শিমুল দাশ (২০), তানভির হোসেন সিফাত (১৮), মোঃ সুজন ওরফে মধু (১৮), রাকিব হোসেন ওরফে শাহ রাকিব (১৮), নুর নবী (১৮), মেহেদী হাসান রুবেল (১৮), মাদক ব্যবসায়ী ছাগিরের পুত্র ওসমান দায়দার কিরণ (১৮) ও স্ত্রী সেলিনা আক্তার সেলি (৩০)।

বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে তাদের আটকের অভিযানের বর্ণনা দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম। তিনি বলেন, এরা ভয়ঙ্কর কিশোর গ্রুপের সদস্য। কারাবন্দি ‘বড় ভাই’য়ের নির্দেশে গত মঙ্গলবার ভোরে রাজু আহমেদ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে তারা।

তাদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে আমেনা বেগম বলেন, কিশোর গ্রুপের গডফাদার এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ছাগির হোসেন ওরফে ছোট ছাগিরকে গত ২৭ এপ্রিল অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেফতার করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পেছনে আরেক মাদক বিক্রেতা মফিজুর রহমানের হাত আছে বলে সন্দেহ করে সে। তার ধারণা মফিজুর রহমানই গোপনে তথ্য দিয়ে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছে। এর প্রতিশোধ নিতে জেলে বসে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে ছাগির।

আর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সে কিশোর গ্যাংয়ের সহযোগিতা নেয়। খুনের একদিন আগেসহ বেশ কয়েক দফা এই কিশোর গ্রুপের কয়েকজন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে ছাগিরের সাথে দেখা করে। তার নির্দেশে এবং তার স্ত্রী সেলিনা আক্তার সেলি ও ছেলে ওসমান হায়দার কিরণের সহযোগিতায় তারা হত্যাকান্ড ঘটায়। তবে মফিজুর রহমানকে খুন করতে গিয়ে তারা ভুলে পাশের বাসায় থাকা নিরপরাধ রাজুকে কুপিয়ে হত্যা করে। মাত্র এক হাজার টাকার বিনিময়ে তারা এ খুন করে। গ্রেফতার কিশোরেরা ইয়াবা আসক্ত বলেও জানান আমেনা বেগম।

হত্যার পটভূমি প্রসঙ্গে এই পুলিশ কর্মকর্তা আরো জানান, ২ মে সগিরের স্ত্রী সেলিনা আক্তার তার সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে যান। সেদিন ছগির তার স্ত্রীকে শিমুল, শুক্কুরসহ চার জনকে জেলগেটে ডেকে নিয়ে যেতে বলে। তারা গেলে সগির মফিজকে হত্যার নির্দেশ দেয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৩ মে খুনের খরচ বাবদ ছগিরের স্ত্রী সেলিনা আক্তার শুক্কুরকে এক হাজার টাকা ও ছগিরের ছেলে ওসমান হায়দার কিরন একটি কিরিচ দেয়। পরের দিন (১৪ মে) সবাই হাড্ডি কোম্পানির মোড়ে রুবেলের টং দোকানের সামনে জড়ো হয়ে খুনের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৪ মে ফজরের নামাজের পর মফিজের ভাড়া ঘরে যায় শিমুল, শুক্কুর, রাকিব, সিফাত ও সুজন। এ সময় বাইরে থেকে পাহারা দেয় নুরনবী ও রুবেল। হত্যার সময় যাতে আশপাশের ঘরগুলোর কেউ বাধা দিতে না পারে এ জন্য পাশের সব ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয় তারা। কিন্তু এ সময় তারা মফিজের ঘরে প্রবেশ করার পরিবর্তে ভুল করে ওই ঘরের পার্শ্ববর্তী রাজুর ঘরে প্রবেশ করে। এরপর রাজুকে কুপিয়ে জখম করে ফেলে রেখে যায়।

আমেনা বেগম বলেন, ছাগির এলাকায় তার মাদক ব্যবসার প্রভাব বিস্তারে এই কিশোরদের সহযোগিতা নিতেন। গ্রেফতার শিমুল, সিফাত ও মধুর জবাব- ‘আমরা টাকার জন্য খুন করিনি। ভাই আমাদের বিনা পয়সায় ইয়াবা দিতেন। কারাগারে দেখা করার সময় ভাই আফসোস করে বলছিলেন অনেক শখ ছিলো এবার ঈদে তোদের সবাইকে নতুন কাপড় দেব, তা আর হলো না। ভাইয়ের এমন মন খারাপ দেখে আমরা ভাইয়ের কথা মতো কাজ করেছি। তবে আসল টার্গেট মিস করেছি। তখন জানতে পারলে তাকেও খুন করতাম’।

কিশোরদের এমন ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগজনক উল্লেখ করে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আমেন বেগম বলেন, খুনের পরিনতি কী হতে পারে না বুঝেই তারা খুনের মতো ভয়ানক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মহানগরীর অনেক এলাকায় এমন ভয়ঙ্কর কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের লাগাম টেনে ধরতে পুলিশী তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। রাত ৮টার পর কোথাও কোন কিশোর গ্রæপের আড্ডা দেখলে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব গ্যাংয়ের পেছনে বড় ভাই ও গডফাদার যারা তাদেরও ছাড়া হবে না বলে হুঁশিয়ারী দেন তিনি।