‘ঘুম’ নিয়ে রাশিয়ান বৈজ্ঞানিকদের অবাক করা গবেষণা

১১:১৭ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, মে ২৬, ২০১৯ লাইফস্টাইল

লাইফস্টাইল ডেস্ক- শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিকঠাক রাখতে পর্যাপ্ত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু কম ঘুমানোর মতোই বেশি ঘুমানোটাও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আবার শৈশবে, কৈশোরে, তারুণ্যে, যৌবনে আর বার্ধক্যে ঘুমের চাহিদাও আলাদা আলাদা।

ঘুম যদি ঠিকঠাক না হয়, তা হলে শরীর, মন, কোনওটাই ভাল থাকে না। নানা রকম রোগেরও সৃষ্টি হয়। এর ফলে কাজ করার ইচ্ছাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কিন্তু এই অত্যাধুনিক জগতে মানুষের ঘুমের সময় কমে গিয়েছে। সব কাজের সময় থাকে, কিন্তু ঘুমের সময়টাই যেন বড্ড কম।

ফলে তারা নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হন। তবে যদি কোনো মানুষকে জোর করে বা কোনো ওষুধ প্রয়োগ করে দিনের পর দিন ঘুমুতে না দেয়া হয় তাহলে? রাশিয়ার কিছু গবেষক এমনই করেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে। যা ‘রাশিয়ান স্লিপ এক্সপেরিমেন্ট’ নামে পরিচিত।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পরাশক্তিগুলো মত্ত হয়েছিল নতুন অস্ত্র, নতুন সব যুদ্ধকৌশল এবং নতুন সব সামরিক সরঞ্জাম তৈরির গবেষণায়। এর মধ্যে কিছু কিছু গবেষণা ফল দিলেও বেশিরভাগই ভয়ানক পর্যায়ে পৌছায়। এমনই একটি ব্যর্থ গবেষণা ছিল ‘দ্য স্লিপ এক্সপেরিমেন্ট’। রাশিয়ান মিলিটারি ও গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি ঘুমহীন সৈন্য তৈরি করার চিন্তা করছিল। তারা সাইবেরিয়ার একটি সিক্রেট মিলিটারি ফ্যাসিলিটিতে এই গবেষণার ব্যবস্থা করেন। গবেষকরা একটি নতুন পরীক্ষামূলক গ্যাস আবিস্কার করে। এই গ্যাসের মাধ্যমে ঘুম নিধন সম্ভব।

এদিকে গ্যাসটি পরীক্ষা করার জন্য সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ পাঁচ জন রাজনৈতিক বন্দীর সঙ্গে মিথ্যা চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী, যদি এই পাঁচজন বন্দী গবেষণায় সকল প্রকার সাহায্য করে এক মাস না ঘুমিয়ে থাকেন তাহলে তাদেরকে চিরতরে মুক্তি দেয়া হবে। পরীক্ষাটি করার জন্য গবেষণাগারে একটি কক্ষ ঠিক করা হয়। ওই কক্ষে বন্দীদের জন্য ৩০ দিনের শুকনো খাবার, পানীয়র ব্যবস্থা করা হয়। এই কক্ষের একটি দরজা ও এর দেয়ালের একটি গবেষকদের পর্যবেক্ষণের জন্য কাচ দেয়া হয়। তাছাড়া কক্ষের ভিতরে ৬টি মাইক্রোফোন ও একটি ক্যামেরা সেট করা হয়। এরপর সাবজেক্টদের ওই কক্ষে বন্দী করে গ্যাস প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু কি ছিল পরিণাম?

গ্যাস প্রয়োগের পরে প্রথম চারদিন বন্দীরা সাধারণ ব্যবহার করছিলেন। তারা নির্ঘুম চারদিন কাটানোর পর ভিন্ন আচরণ শুরু করেন। এই পরিণামের কারণ এবং তাদের অতীতের দূর্ঘটনা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। পঞ্চম দিন থেকে তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। এরপর তারা মাইক্রফোনে অর্থহীন ফিসফিস শুরু করে। এই বন্দীদশা থেকে মুক্তির জন্য গবেষকদের তাদের নেতাদের ধরিয়ে দেয়ার প্রলভন দিতে শুরু করেন। রাশিয়ান গবেষকরা মনে করেছিলেন এটি ছিল গ্যাসের প্রভাব। ধীরে ধীরে বন্দীরা সকল কথাবার্তা বন্ধ করে শুধু মাইক্রফোনে ফিসফিস করতে থাকে।

নবম দিন হঠাৎ এক বন্দী চিৎকার করতে শুরু করেন। সে তার ভোকাল কর্ড ছিড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত চিৎকার করতে থাকে। অস্বাভাবিকভাবে বাকি চার বন্দী এতে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখায় না। তারা নিরবভাবে মুখ থেকে বইয়ের পাতা ছিড়ে সেগুলো দেয়ালের কাচে ও ক্যামেরায় লাগিয়ে দেন। ফলে গবেষকরা আর বন্দীদের দেখতে পান না। এরপর তারা পুরোপুরি নিঃশব্দ হয়ে যান।

এভাবে তিন দিন কাটার পর গবেষকরা মাইক্রফোন ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করল। রুমের অক্সিজেন সাপ্লাই ও চেক করলেন এবং নিশ্চিত হলেন যে বন্দীরা সবাই জীবিত। কোনো উপায় না পেয়ে গবেষকরা ইন্টারকমে বন্দীদের সঙ্গে কথা বলার চেস্টা করে বললেন, তারা কক্ষে প্রবেশ করবে এবং বন্দীরা যদি কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করে তবে একজন বন্ধীকে মুক্তি দেয়া হবে।

একজন বন্দী ভয়ানক স্বরে উত্তর দিলেন, তারা মুক্তি চান না। এরপর থেকে বন্দীরা আবার কথা বলা বন্ধ করে দেন। শেষমেষ কোনো উপায় না পেয়ে ১৫তম দিন গবেষকরা ঠিক করলেন তারা কক্ষে প্রবেশ করবেন। এজন্য তারা রাশিয়ান স্পেশাল ফোর্সকে তলব করলেন। রাশিয়ান স্পেশাল ফোর্স কক্ষে প্রবেশের পূর্বে তার ওই পরীক্ষামূলক গ্যাসের সাপ্লাই বন্ধ করে দিলেন এবং কক্ষে সাধারণ বায়ু প্রবেশ করালেন। এতে সকল বন্দী চিৎকার শুরু করলেন। তারা বারবার ওই গ্যাস পুনরায় চালুর জন্য আকুতি করতে থাকলেন। এই পরিস্থীতিতে রাশিয়ান সৈন্যরা কক্ষে প্রবেশ করলেন। সৈন্যরা কক্ষে প্রবেশ করে বন্দীদের পরিস্থিতি দেখে ঘাবড়ে গেলেন।

বন্দীদের শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে মাংস খুলে পড়ছিল। তাদের হাড়গোড় বের হয়ে আসছিল। পাঁচ বন্দীর মধ্যে চারজন জীবিত ছিলেন। জীবিত বন্দীরা গ্যাসে জন্য আকুতি করতে থাকেন এবং কক্ষ থেকে বের হতে অস্বীকৃতি জানান। তাদেরকে কক্ষ থেকে বের করার প্রক্রিয়ায় দুই সৈন্য প্রাণ হারান এবং একজন আহত হন। বন্দীদের কক্ষ থেকে বের করার পর গবেষকরা কক্ষে প্রবেশ করে রীতিমত থমকে গেলেন। মজুদ খাবারের কিছুই বন্দীরা ধরেননি এবং তারা নিজেরদের শরীর থেকেই মাংস খাচ্ছিলেন।

এছাড়াও মৃত বন্দীর শরীরের বিভিন্ন অংশও জীবিতরা খেয়ে ফেলেছিল। হতোচকিত গবেষকরা জীবিত বন্দীদের পরীক্ষার জন্য অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করে অবশ করার চেস্টা করলে বন্ধীরা অস্বীকৃতি জানায়। জোর করে একজনকে অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ করলে তার হার্ট বন্ধ হয়ে যায় ও মৃত্যুবরণ করেন। জীবিত তিন বন্দীর পরীক্ষা করার জন্য অ্যানেস্থেসিয়া ব্যবহার না করেই পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা পরীক্ষা করে জানতে পারেন এই গ্যাসটিতে অতিমাত্রায় আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাছাড়াও এই গ্যাসের প্রভাবে বন্দীদের সকল ব্যথাবোধ ও অন্যান্য আবেগ বিলুপ্ত হয়েছিল। গ্যাসটি তাদের শারীরিক শক্তিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

গ্যাসটির প্রভাব সম্ভাবণা হিসেবে দেখে একজন রাশিয়ান জেনারেল এই পরীক্ষা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গবেষকরা রাজী ছিলেন না। এরপর গবেষক বা জীবিত বন্দীদের সঙ্গে কী হয়েছিল তা সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয় ১৯৪৫ সালের পরে ওই মিলিটারি গবেষণাগার পুরোপুরি সিল করে দেয়া হয়। এই সকল পরীক্ষা সম্পর্কেও সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল না যতদিন পর্যন্ত না ২০০৯ সালে রাশিয়ান কিছু নথি হ্যাক করে প্রকাশ করা হয়।