• আজ ৩রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পার্লামেন্টে মোদির বক্তব্যে মুসলিমদের শঙ্কা বেড়েছে

২:৫৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, মে ২৭, ২০১৯ আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা অব্যাহত ভারত জুড়েই। শনিবার দিনভর এবং গতকাল রবিবারেও বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মুসলিমদের টুপি খুলে, পাঞ্জাবী খুলে ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য করা হচ্ছে।

আগেই গোয়েন্দারা সতর্ক করেছিলেন, সংঘর্ষের ঘটনা আরও বাড়বে। অন্য দিকে দফায় দফায় কেন্দ্রীয় বাহিনী ফিরতে শুরু করেছে। শনিবারই নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক বিবেক দুবে জানিয়ে দেন, নির্বাচনের কাজ শেষ। এবার কেন্দ্রীয় বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে। কট্টর হিন্দুবাদী বিজেপি সরকার দেশটিতে দ্বিতীয় মেয়াদে আসায় সেখানে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে আছেন সংখ্যালঘু মুসলিমরা।

মুসলিম অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনীতিবিদরাও বলছেন, এই ভয় আদৌ অমূলক নয়, আর মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি যে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা নিয়ে চলছে তাতে আগামী পাঁচ বছরে অন্যরকম কিছু হবে বলে ভাবাও যাচ্ছে না। খবর এনডিটিভির।

গতকাল রোববার বর্ধমানের কাঁকসা থানার জাজগড়িয়া এলাকায় শেখ সালাউদ্দিন নামে এক বিজেপি কর্মী আক্রান্ত হল। তার অভিযোগ, সম্প্রতি তিনি তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় শেখ সফিকুল নামে এক তৃণমূল কর্মী তাকে মারধর করেন। সংঘর্ষে যোগ থাকার অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পুলিশ জগন্নাথ দাস নামে এক বিজেপি-র স্থানীয় নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

ভোট গণনার আগের রাতেও মধ্যপ্রদেশের সিওনি জেলায় বিফ বা গরুর মাংস বহন করা হচ্ছে, এই সন্দেহে জনতা একজন মহিলাসহ তিন ব্যক্তিকে আটকে বেদম মারধর করে। আক্রান্তরা হলেন দিলীপ, মালভিয়া, তৌফিক ও আনজুম শামা। খবর পেয়ে প্রথমেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গ্রেপ্তার করে আক্রান্ত ব্যক্তিদের, আর মাংসের নমুনা পাঠানো হয় হায়দ্রাবাদে পরীক্ষার জন্য।

এর দু’দিন বাদে শনিবার পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, মুসলিমদের এতকাল মিথ্যে ভয় দেখিয়ে আসা হয়েছে। তার কথায়, ‘এতদিন দেশের সংখ্যালঘুদের ভুল বুঝিয়ে আসা হয়েছে। ভাল হত যদি তাদের শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করা হত, যদি সমাজজীবনের বিভিন্ন স্তরে ওই সমাজ থেকে নেতারা উঠে আসতেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু তা না-করে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির জন্য তাদের সামনে একটা কাল্পনিক বাতাবরণ তৈরি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে দূরেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, দাবিয়েও রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র ভোটে তাদের কাজে লাগানোর এই ছল এবার বন্ধ হবে, এটাই ২০১৯-এ এসে আমার কামনা।’

কিন্তু মোদির এই বক্তব্যে কতটা ভরসা করতে পারছেন না ভারতের মুসলিমরা। কারণ এই প্রধানমন্ত্রীর আমলেই গত পাঁচ বছরে দেশের নানা প্রান্তে মুসলিমরা আক্রান্ত হয়েছেন, আর তার দলের নির্বাচনী প্রচারেও বড় অংশ জুড়ে ছিল হিন্দুত্বর জিগির।

প্রধানমন্ত্রীর কথায় কোনও আশার আলো দেখছেন জানিয়ে অ্যাক্টিভিস্ট ফারাহ নাকভি বলেন, ‘দেখুন আগামীতে কী ঘটবে সেই পূর্বাভাস করতে পারব না – তবে এটুকু বলতে পারি বিজেপির এবারের জয় আসলে হিন্দুত্বর ও হিন্দু রাষ্ট্রের চেতনার জয়, যেটা মৌলিকভাবেই সংখ্যালঘু-বিরোধী। এই হিন্দু রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ছাড়া কিছুই নয়।

এখন প্রশ্ন হল, প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে যে কথা বলেছেন সেটা কি সংখ্যালঘু প্রশ্নে বিদেশি গণমাধ্যমকে সন্তুষ্ট করার জন্য বললেন, না কি যে দক্ষিণপন্থী ক্যাডাররা গত পাঁচ বছর ধরে যে সহিংসতা আর গণপিটুনি চালাচ্ছে তাদের উদ্দেশে কোনও বার্তা দিতে চাইলেন?’

প্রধানমন্ত্রী সংখ্যালঘুদের যে ভয়কে অমূলক বলছেন, সেটাও একেবারেই মানতে রাজি নন ফারাহ নাকভি। তিনি বলেন, ‘হামলার ঘটনাগুলো তো সত্যি সত্যি ঘটেছে, আমাদের অভিজ্ঞতায় সেটা আছে – কাজেই ভয়টা কেন কাল্পনিক হবে? বরং তারা তাদের কাজে প্রমাণ দিন যে সত্যিই মুসলিমদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

হায়দ্রাবাদের এমপি ও ভারতের মুসলিম সমাজের প্রথম সারির নেতা আসাদউদ্দিন ওয়াইসি আবার বিশ্বাস করেন, হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার আড়ালে লুকিয়ে নরেন্দ্র মোদি এবার কিন্তু আর পার পাবেন না। তিনি বলেন, ‘গত টার্মের তুলনায় এবারে ফারাক একটাই হবে বলে আমার ধারণা, হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আর অকর্মণ্যতা বিজেপি আর ঢাকতে পারবে না।

কাজেই হিন্দুত্বর অ্যাজেন্ডা তাদের কিছুটা চাপা দিতেই হবে। নইলে যে হিন্দুস্তানের জনতা মোদিকে আকাশে তুলেছে, তারাই আবার একদিন জমিতে ফেলবে, ইন্দিরা গান্ধীর কথা নিশ্চয় সকলেরই মনে আছে।’

অর্থাৎ যে ধর্মীয় বিচারধারার ভিত্তিতে নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী সাফল্য এসেছে, দেশের শাসক হিসেবে তিনি তা থেকে উত্তীর্ণ হতে পারবেন কি না এই সংশয় ভারতের মুসলিম সমাজের ভেতর কিন্তু রয়েই যাচ্ছে।