সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের কাছে হারার পর সমর্থকদের সঙ্গে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি রশিদ-নবীদের! (ভিডিও) | পটুয়াখালীতে নিখোঁজের দুইদিন পর ছাত্রলীগ নেতার লাশ উদ্ধার | লাগেজ নিচ্ছেন স্ত্রী, ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটছেন মাহমুদউল্লাহ! | পুলিশে নিয়োগ পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২, আহত ১০ | স্কুলছাত্রীকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণের চেষ্টা, পুলিশের এএসআই ক্লোজড | গভীর রাতে ঢাবির টিএসসির কক্ষ থেকে ছাত্র-ছাত্রী আটক | কীভাবে বুঝবেন সংসার টিকছে না? | যে শহরে মসজিদ নিষিদ্ধ, মসজিদ নির্মাণ করতে চাইলেই দিতে হবে প্রাণ! | আবেদন করলে সংসদ সদস্যরা ফ্ল্যাট পাবেন: পূর্তমন্ত্রী | রূপগঞ্জে সকালে হাঁটতে গিয়ে নারী ইউপি সদস্য খুন |
  • আজ ১২ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপের ঢেউয়ে মেতেছে ক্রিকেট ব্যাটের গ্রাম যশোরের নরেন্দ্রপুর

১১:৩৪ অপরাহ্ণ | বুধবার, জুন ১২, ২০১৯ খুলনা

জাহিদ হাসান, যশোর প্রতিনিধি :: ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বিশ্বকাপের ঢেউ যশোরের ক্রিকেট ব্যাটের গ্রাম খ্যাত নরেন্দ্রপুরের মিস্ত্রিপাড়ায়ও লেগেছে। মিস্ত্রিপাড়ার ব্যাটের কারিগররা এখন আন্তর্জাতিকমানের ব্যাট বানাতে চান। তাদের দাবি, ‘উইলো’ কাঠ পেলে তারা কাঠের বলে ক্রিকেট খেলার ব্যাটও তৈরি করতে পারবেন। সেই ব্যাট নিয়ে তামিম, সাকিবরা মাঠ মাতাতে পারবেন।

শুধু তাই নয়, দেশে যারা ক্রিকেটার হিসেবে কাঠের বলে খেলে তাদের জন্যও সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যাট তৈরি করে দিতে পারবেন। এতে দেশে যেমন একটি আন্তর্জাতিক মানের কাজের প্রতিষ্ঠা পাবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রাও বাঁচবে।

যশোর শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর গ্রাম। এই গ্রামের কারিগরপাড়া এখন ক্রিকেট ব্যাটের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রায় ২৫ বছর ধরে এই গ্রামের কারিগররা ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করছেন। তাদের তৈরি ব্যাট দিয়ে সারা দেশের খুদে ক্রিকেটাররা টেনিস বলে মাঠ মাতাচ্ছে।

এখন এই কারিগররা বিশ্বমানের ক্রিকেট ব্যাট তৈরির স্বপ্ন দেখছেন। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও ব্যাট তৈরি প্রধান উপকরণ ‘উইলো কাঠ’ আমদানি করতে পারলে সৌম্য, সাকিব, তামিমদের খেলার ব্যাট তৈরি সম্ভব বলে জানিয়েছেন মিস্ত্রীপাড়ার কারিগরা।

নরেন্দ্রপুর মিস্ত্রিপাড়ায় ২৫ বছর ধরে ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করছেন সুবল মজুমদার। ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের তৈরি ব্যাট সারাদেশে সাড়া ফেলেছে। তবে আক্ষেপ একটাই মুশফিক সাকিব, তামিমদের খেলার ব্যাট তারা তৈরি করতে পারেননি। উন্নতমানের কাঠে অভাবে তারা তৈরি করতে পারছে না।

সুবল মজুমদার বলেন, বিশ্বমানের ক্রিকেট ব্যাট তৈরিতে যে কাঠ দরকার, সেটি আমাদের দেশে নেই। বিদেশ থেকে আমদানি করতে পারলে আমরা ‘আন্তর্জাতিক মানের ব্যাট’ তৈরি করে দিতে পারবো।

একই সুরে বললেন আরেক কারিগর তরিকুল ইসলাম। তার মতে, কাঠের অভাবেই আমরা বিশ্বমানের ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করতে পারি না। ‘উইলো কাঠ’ আমদানি হলে উন্নতমানের ব্যাট তৈরি কোন ব্যাপার না। সুবল মজুমদার কিংবা তরিকুল ইসলাম নয়, আরও অনেকেই বললেন একই কথা।

নরেন্দ্রপুরের ব্যাটের কারিগররা জানালেন, শিশু থেকে শুরু করে কিশোর-যুবদের টেনিস বলে খেলার জন্য সাত ধরণের ব্যাট তৈরি করেন তারা। ফি বছর এই গ্রাম থেকে প্রায় ৪ লাখ পিস ক্রিকেট ব্যাট তৈরি হয়। সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়ে এ ব্যাট। তবে এর সবচেয়ে বড় বাজার উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে। এখান থেকে প্রতিটি ব্যাট ২০ টাকা থেকে ২শ’ টাকা পর্যন্ত পাইকারি দরে বিক্রি করা হয়। সারা বছর ব্যাট তৈরি হলেও মূলত চারমাস এর জমজমাট ব্যবসা হয়। অগ্রহায়নে পাকা ধান উঠে যাওয়ার পর শুষ্ক মৌসুম শুরু হলে শুরু হয় গ্রাম-গঞ্জের মাঠেঘাটে ক্রিকেট খেলা। ফলে পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র-এই চারমাস থাকে ক্রিকেট ব্যাটের চাহিদা। এই ভরা মৌসুমে ৩০-৩৫টি কারখানায় চলে পুরো দমে ব্যাট তৈরির কাজ। বছরের বাকীটা সময় ১২-১৫টি কারখানায় ব্যাট তৈরি ও মজুদ করা হয়।

নরেন্দ্রপুর মোহাজেরপাড়ায় ক্রিকেট ব্যাটের কারখানা রয়েছে তরিকুল ইসলামের। তিনি জানালেন, এবছর তার কারখানায় প্রায় ১৬ হাজার ব্যাট তৈরি হয়েছে। মানভেদে এইসব ব্যাট ২০-২০০টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়।

কারিগররা জানান, ভাল মানের ব্যাট তৈরি করতে ৭০-৭৫ টাকার কাঠ, মজুরী ৫০ টাকা, হাতল ১০ টাকা, গ্রিপ, স্টিকার, পলিথিন মিলে আরও ২০টাকা খরচ হয়। এছাড়াও আনুষাঙ্গিক খরচও আছে।

ব্যাট তৈরিতে কদম, জীবন, নিম, গুল্টে (পিটুলি), পুয়ো, ছাতিয়ান, ডেওয়া কাঠ ব্যবহার করা হয়। ভাল মানের ব্যাট তৈরিতে নিম ও জীবন কাঠ বেশি ব্যবহৃত হয়।
শরিফুল ইসলাম নামে আরেক কারিগর বলেন, ব্যাট বেচাকেনার মৌসুম চারমাস। বছরের বাকী সময় ব্যাট তৈরি করে মজুদ করা হয়। পাইকারদের চাহিদা অনুযায়ী বিক্রি করা হয়।

ব্যাট কারখানার শ্রমিক সঞ্জয় বিশ্বাস বলেন, এখানে কাজ করেই সংসার চালাই। প্রায় ২৫ বছর ধরে ব্যাট তৈরির কাজ করি। বড় সাইজের ব্যাট প্রতি ১০ টাকা ও ছোট সাইজের ব্যাট প্রতি ৬টাকা হারে মজুরি পায়। সেই হিসেবে দিনে ৩৫০-৪০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়।

একই কথা জানান কৃষ্ণচন্দ্র দাস। তিনি জানালেন, ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কাজেই চলে তার সংসারের চাকা।

সমস্যা, সঙ্কটের ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্যাটের কারিগর সুবল মজুমদার ও তরিকুল ইসলাম জানালেন, বড় সমস্যা ছিল বিদ্যুৎ। চার বছর আগেও তাদের হাত করাত দিয়ে ব্যাট তৈরি করতে হতো। কিন্তু এখন সবাই বিদ্যুতসংযোগ পেয়েছেন। এখন ইলেক্ট্রিক করাতে তারা কাজ করেন। এতে কাজের গতি এসেছে, উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণ, অথচ পরিশ্রম বাড়েনি। এখন বড় সমস্যা নগদ টাকা। কাঠসহ উপকরণ কিনতে গেলে টাকায় টান পড়ে। সেইভাবে ব্যাংকঋণও পাওয়া যায়না। ফলে এনজিওর ক্ষুদ্র ঋণই ভরসা। আর সমস্যা মিস্ত্রিপাড়ার রাস্তাটি। ইটের সোলিং আর কাঁচা এই রাস্তায় বৃষ্টি হলে পায়ে হাটাই দুস্কর হয়ে পড়ে। সেখানে কাঠের গাড়ি বা ব্যাটের গাড়ি আনা নেয়া করতে তাদের গলদঘর্ম হতে হয়।

এখনাকার বাসিন্দাদের দাবি, রাস্তাটি পাকা করে দিলে যোগাযোগ সহজ হবে। সম্ভাবনার শিল্পটিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।