কুড়িগ্রামের খেয়াঘাট গুলোতে ইজারাদারের কাছে জিম্মি সাধারণ মানুষ

৫:৩০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, জুলাই ২, ২০১৯ রংপুর

ফয়সাল শামীম,ষ্টাফ রিপোর্টার: কুড়িগ্রামের প্রায় সব কয়টি খেয়াঘাটে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। জেলা পরিষদ থেকে বছর বছর ইজারা দেয়া হলেও সুনির্দিষ্ট করে ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া হয় না। এ সুযোগে ইজারাদাররা যাত্রীদের কাছ থেকে অযৌক্তিক হারে ভাড়া আদায় করে। ইজারার বিধান অনুযায়ী ঘাটে ভাড়ার তালিকা ঝুলানোর কথা থাকলেও কোনো ঘাটেই তা মানা হচ্ছে না।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ নদীতে ঘাট থেকে ঘাটের দূরত্ব গড়ে দেড় কিলোমিটার। আর ব্রহ্মপুত্রে এ দূরত্ব গড়ে ছয় কিলোমিটার। যাত্রী ও হালকা মালপত্র পরিবহনে এসব ঘাটে ব্যবহার করা হয় ডিজেল ইঞ্জিনচালিত নৌকা।

সম্প্রতি কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে রৌমারী যাওয়ার জন্য ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, দেড় শতাধিক নৌকা অপো করছে। মোটরসাইকেল নিয়ে নৌকায় উঠতে গিয়েই গুনতে হলো ৫০ টাকা। দু-তিনজন লোক মোটরসাইকেলটি নৌকায় তুলে দিয়ে এ টাকা দাবি করে। যদিও এ কাজটি ইজারাদারের নিয়োগকৃত লোকদের বিনা পয়সায় করার কথা।
যাত্রী বোঝাই করে ব্রহ্মপুত্রের মাঝামাঝি এসে ভাড়া আদায় শুরু করেন মাঝি। যাত্রীপ্রতি ৭০ টাকা।

আবার সঙ্গে মোটরসাইকেল থাকলে আরো ৭০ টাকা। প্রায় দেড় ঘণ্টার যাত্রা শেষে যখন নৌকাটি রৌমারী ঘাটে ভিড়ল, তখন অপো করতে হলো মোটরসাইকেলের জন্য। পরে কুলিরা এসে বাঁধন খুলে নৌকা থেকে মোটরসাইকেল নামিয়ে এনে আবার ৫০ টাকা আদায় করল। ফলে সব মিলিয়ে চিলমারী ঘাট থেকে রৌমারী ঘাট পর্যন্ত আসতে ব্যয় হলো ২৪০ টাকা।

পদে পদে এভাবে টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে মাঝি বহুলুল ও মতিন জানান, ঘাটে দেড় শতাধিক নৌকা থাকে। কিন্তু দৈনিক চলে মাত্র চারটি। ফলে সিরিয়াল পেতে ১০ থেকে ১২ দিন লেগে যায়। অর্থাৎ একটা ট্রিপ দিয়ে এতদিন অপো করতে হয়। তাছাড়া ডিজেলের দাম বেশি। ইজারাদারকেও আগের চেয়ে বেশি দিতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্রে চিলমারী ঘাটসংশ্লিষ্ট রৌমারী, রাজীবপুর, কোদালকাটি, বনগ্রাম ও কর্তিমারী ঘাট নিয়ে একটি লট। কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদ থেকে গত বছর এ লটটির ডাক হয়েছে ৫৬ লাখ টাকা। চিলমারী উপজেলার জোড়গাছ এলাকার জনৈক আজিজ বেপারির নামে লটটি ইজারা নেয়া হলেও অংশীদার মূলত ১০ জন। এর মধ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাও রয়েছেন।

জানা যায়, লটটি ইজারা নেয়ার পর আলাদাভাবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। রৌমারী ঘাট ২২ লাখ টাকায়, রাজীবপুর ঘাট ২৮ লাখ টাকায়, বনগ্রাম ঘাট ৬ লাখে, কর্তিমারী ১ লাখে এবং কোদালকাটি ১ লাখ টাকায় ভাড়া দেয়া হয়েছে। শুধু চিলমারী ঘাটটি ইজারাদারের কাছেই আছে।

এ ছয়টি ঘাট থেকে প্রতিদিন চারটি করে নৌকা যাত্রী নিয়ে যাওয়া-আসা করে। প্রতিটি নৌকায় গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন যাত্রী থাকে। মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুলিদের চাঁদা বাদে ট্রিপপ্রতি মাঝির আয় হয় প্রায় ৭ হাজার ৭০০ টাকা। সেখান থেকে ইজারাদারদের সিরিয়াল পেতে দিতে হয় ২০০ টাকা, যাত্রীপ্রতি ৫ টাকা ও মোটর সাইকেল প্রতি ১০ টাকা।

কুড়িগ্রামের নয়টি উপজেলার মধ্যে রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলা ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন। ফলে জেলা শহরে আসতে-যেতে নদীপথ ছাড়া উপায় নেই দুই উপজেলার মানুষের।

বেশি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে চিলমারী ও রৌমারী ঘাটের টোল আদায়কারী মোসলেম, লিপু ও রফিকুল এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে উল্লেখ করেন।

কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামে জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ১৬টি নদ-নদী। ফলে নয় উপজেলা মিলিয়ে ছোট-বড় খেয়াঘাট আছে ৫৩টি। এগুলো জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয়। প্রতি বছর ইজারা দেয় তারা। তবে দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া হয় না।

ব্রহ্মপুত্র নদের ছয়টি বড় ঘাটের মতো ছোট ঘাটগুলোতেও ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করা হয়। সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের ধরলা নদীতে ছাটকালুয়া খেয়াঘাটটি ইজারা দেয়া হয়েছে ৫ লাখ টাকায়। রহিম মন্ডল নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির নামে ঘাটটি ইজারা নেয়া হলেও সেখানে অংশীদার রয়েছে ৮ থেকে ১০ জন। প্রায় দেড় কিলোমিটার নদী পারাপারে এ ঘাটে ইজারাদারকে জনপ্রতি দিতে হয় ৫ টাকা, নৌকার ভাড়া ৫ টাকা। বাইসাইকেল থাকলে ৮ টাকা করে। আর মোটরসাইকেল থাকলে ১০ টাকা করে। আবার মোটরসাইকেল নৌকায় ওঠানো ১০ টাকা, নামানো ১০ টাকা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম আলেয়া খাতুন বলেন, আমরা প্রতিটি ঘাটে ভাড়ার চার্ট করে দিয়েছি। আমরা যখন যাই তখন তো চার্ট টাঙানো থাকে! তবে ভাড়ার চার্টটি তিনি দেখাতে রাজি হননি।