ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণা করে ইসলাম

৫:৪৯ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, জুলাই ২, ২০১৯ ইসলাম

ইসলাম ডেস্ক- হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) মিম্বরের ওপর উপবিষ্ট হয়ে জাকাত ও দানখয়রাত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা এবং উপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম হওয়ার কথা বললেন। উপরের হাত হলো খরচকারী-দাতা এবং নিচের হাত যাচ্ঞাকারী-গ্রহীতা

আমরা বিশ্বাস করি ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম। এ পূর্ণতা শুধু চিন্তা, বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগিতেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষ এ পার্থিব জীবনে কী করে পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বসবাস করতে পারে তার পরিপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। তাই একজন সক্ষম-সামর্থবান মানুষ তার মতো আরেকজন মানুষের সামনে হাত পাতবে, নিজেকে ছোট করবেÑ এটা মেনে নেয়নি ইসলাম।

এক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা কত উজ্জ্বল দেখুন হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, জিবরিল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলেছেন, মোমিনের মর্যাদা রাতজাগরণে (তাহাজ্জুদ) আর তার সম্মান মানুষ থেকে অমুখাপেক্ষিতার মধ্যে নিহিত।’ (মুসতাদরাকে হাকিম : ৪/৩৬০)।

সুতরাং মানুষ মানুষের কাছে নিজেকে মুখাপেক্ষী করে পেশ করবে না। কারও সামনে নিজেকে ভিখারি বানাবে না। কারও কাছে হাত পাতা ইসলাম কতটা অপছন্দ করে, এ মর্মে একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি আবু আদরুর রহমান আওফ ইবনে মালিক (রা.) বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দরবারে তখন নয়জন, আটজন কিংবা সাতজন ছিলাম। তখন তিনি আমাদের বললেন, তোমরা কি আল্লাহর রাসুলের হাতে বায়াত গ্রহণ করবে না? অথচ আমরা মাত্রই আকাবায় বায়াত গ্রহণ করেছি। তাই বললামÑ ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা তো আপনার হাতে বায়াত গ্রহণ করেছি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আবার বললেন, তোমরা কি আল্লাহর রাসুলের হাতে বায়াত গ্রহণ করবে না? আমরা তখন হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, হে রাসুল! আমরা তো বায়াত গ্রহণ করেছি। এখন আবার কীসের বায়াত গ্রহণ করব? বললেন এই মর্মে শপথ নাও শুধু আল্লাহর ইবাদত করবে, আমিরের কথা মেনে চলবে। তারপর নিচু স্বরে একটি গোপন কথা বললেন ‘আর মানুষের কাছে কিছুই চাইবে না।’ হাদিস বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাদের কাউকে কাউকে দেখেছি হাতের ছড়িটি পড়ে গেলেও কাউকে তুলে দেওয়ার জন্য বলতেন না। (রিয়াযুস সালেহিন : ৫২৯)।

আরেকটি হাদিস বলি। এর চেয়েও ঈমানজাগানিয়া। হজরত সাওবান (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেনÑ কে আমার জন্য এই মর্মে দায়িত্ব নেবে যেÑ মানুষের কাছে কিছু চাইবে না, আর আমি তার জন্য বেহেশতের দায়িত্ব নেব! বললাম, আমি! তারপর থেকে সাওবান (রা.) কারও কাছে কিছুই চাইতেন না। (রিয়াযুস সালেহিন : ১৬৪৩)।

কী সম্মানজনক জীবনশিক্ষা! সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মানবতার মুক্তির দূত তাঁর সম্মানিত সঙ্গী থেকে এই মর্মে শপথ নিচ্ছেন কখনও কোনো মানুষের কাছে কিছু চাইবে না। এমনকি হাত থেকে পড়ে যাওয়া লাঠিটিও নয়। কারও কাছে কখনও হাত না পাতার প্রতিদান কীÑ কেউ হয়তো ভাবতে পারে। রাসুল্লাল্লাহ (সা.) তারও জবাব দিয়ে গেছেন আমাদের। অসামান্য প্রতিদান। বেহেশতের গ্যারান্টি!

কথা হলো জীবন যতদিন আছে, ততদিন তো জীবিকা চাই, জীবনোপকরণ চাই। বেহেশতের আশায়, মর্যাদার প্রত্যাশায় হাত পাতব না বলে তো আর চাহিদা হারিয়ে যাবে না। তাহলে সমাধান কী? সমাধান সহজ। নিজ হাতে উপার্জন করো!

ভিক্ষাবৃত্তি করার চেয়ে নিজে কাজ করার গুরুত্ব সম্পর্কে আরও কয়েকটি হাদিস পেশ করা হলো আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, আনসারদের কিছু লোক রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে কিছু সাহায্য চাইল। তিনি তাদের কিছু দিলেন। তারা ফের এসে চাইল। তিনি বারবার তাদের দান করতে থাকায় তাঁর সম্পদ শেষ হয়ে যায়। তখন তিনি বলেন, আমার কাছে গচ্ছিত আর কোনো সম্পদ নেই। আর যে ব্যক্তি অন্যের কাছে চাওয়া থেকে বিরত থাকবে, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে পবিত্র করবেন। আর যে অমুখাপেক্ষী হবে আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ধৈর্য কামনা করবে, আল্লাহ তাকে তা দান করবেন। বস্তুত ধৈর্যের চেয়ে উত্তম জিনিস কাউকে দান করা হয়নি। (সুনানে আবু দাউদ : ১৬৪৪)।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দারিদ্র্যপীড়িত হয়ে মানুষের কাছে প্রকাশ করে, আল্লাহ তার দারিদ্র্য দূর করেন না। অপর দিকে কেউ যদি দরিদ্রতা আল্লাহর কাছে পেশ করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে অমুখাপেক্ষী করেনÑ হয়তো দ্রুত মৃত্যুর মাধ্যমে অথবা তাকে সম্পদশালী করার দ্বারা।

হজরত ইবনুল ফিরাসি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি মানুষের কাছে কিছু প্রার্থনা করব? তিনি তাকে বললেন, না। আর একান্তই যদি তোমাকে কিছু চাইতেই হয় তাহলে পুণ্যবান লোকদের কাছে চাইবে।

ইবনুস সাঈদি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আমাকে জাকাত আদায়ের কাজে নিয়োগ করেন। আমি জাকাত আদায়ের পর তাঁর কাছে জমা দেওয়ার পর তিনি আমাকে ওই কাজের বিনিময় গ্রহণের নির্দেশ দেন। তখন আমি বলি, আমি তো ওই কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেছি। অতএব আমার বিনিময় আল্লাহর কাছে। তিনি বলেন, আমি তোমাকে যা প্রদান করছি, তা গ্রহণ করো। কেননা আমিও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর যুগে জাকাত আদায়ের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলাম। আর আমিও তোমার মতোই বলেছিলাম। তখন তিনি আমাকে বলেন, তোমার চাওয়া ছাড়া যা দেওয়া হয় তুমি তা দিয়ে যা খুশি করো অথবা দান খয়রাত করে দাও। (মুসলিম)।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) মিম্বরের ওপর উপবিষ্ট হয়ে জাকাত ও দানখয়রাত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা এবং উপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম হওয়ার কথা বললেন। উপরের হাত হলো খরচকারী-দাতা এবং নিচের হাত যাচ্ঞাকারী-গ্রহীতা।

Loading...