‘ইসলামকে ১০০ ভাগ মেনে চলা মুসলমানদের পক্ষেও সম্ভব নয়’- তসলিমা

৩:০২ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, জুলাই ৫, ২০১৯ ফিচার
TOSLIMA

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্কঃ বরাবরই নারী স্বাধীনতা নিয়ে সরব লেখিকা তসলিমা নাসরিন। যদিও অনেকের দাবি, জাইরা ওয়াসিম বলিউড ছেড়েছেন তাঁর নিজের ইচ্ছেয়। তবে তসলিমার দাবি, আসলে ইসলামি কট্টরপন্থীদের চাপেই অভিনয় ছাড়তে হয়েছে জাইরার। ঠিক যে কারণে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছে তসলিমাকে।

বৃহস্পতিবার ফেসবুকে জাইরার ইস্যুতে একটি লেখা পোস্ট করেছেন তসলিমা। সেখানে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ধর্ম করতে হলে কি কর্ম ত্যাগ করতে হয়?’ জাইরা যেহেতু বলেছেন যে ধর্মে সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের পথে বাধা তৈরি করছিল তাঁর কাজ, তাই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে তাঁকে।

এছাড়া তসলিমা দাবি করেন, ইসলামকে ১০০ ভাগ মেনে চলা মুসলমানদের পক্ষেও সম্ভব নয়। তাই তারা বেছে নিয়েছে কী মানবে, কতটুকু মানবে। যেটুকু মানলে খুব একটা অসুবিধে হয় না, সেটুকুই মানছে।

সময়ের কণ্ঠস্বরের পাঠকদের জন্য তসলিমা নাসরিনের পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

কাশ্মীরী কিশোরী জায়রা ওয়াসিম ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে অত্যন্ত ভাগ্যবতী অভিনেত্রী। তার অভিনীত প্রথম ছবি দংগল অসাধারণ ছবি। সিক্রেট সুপারস্টার, দ্বিতীয় ছবিটিও অসাধারণ । দুটো ছবিই হিট। দুটো ছবির জন্যই জায়রা পুরস্কার পেয়েছে। এলাম, দেখলাম, জয় করলামের মতো জায়রা বলিউডে এলো, অভিনয় করলো, দর্শকের মন জয় করলো। কিন্তু সবাইকে তাজ্জব করে দিয়ে সেদিন সে ঘোষণা দিয়েছে, সে অভিনয় ছেড়ে দেবে, কারণ চলচ্চিত্র জগতে থেকে তার ঈমান নষ্ট হচ্ছে। কোরানের প্রচুর সুরা উদ্ধৃত করে সে ফেসবুকে লিখেছে, সে তার ধর্মে ফিরে যাবে। প্রশ্ন হলো, ধর্ম করতে হলে কি কর্ম ত্যাগ করতে হয়? কত লক্ষ কোটি পেশাজীবি লোক নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন করছে। কারও তো সমস্যা হচ্ছে না!

এক সময় শর্তই ছিল বিয়ের পর মেয়েদের চাকরি করা চলবে না। সময় বদলেছে, অনেক পরিবারই মেয়েদের উপার্জিত টাকা সংসারে খরচ হোক চায়। কিন্তু এখনও এমন পরিবার ভুরি ভুরি, যারা মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়াই পছন্দ করে না। তারা বিশ্বাস করে, স্বামী সংসার সন্তানের সেবা করার জন্যই মেয়েদের জন্ম। আপিস কাছারি পুরুষেরা করবে। সংসার পালন করতে হলে মেয়েদের পেশা ত্যাগ করতে হয় শুনেছি, কিন্তু ধর্ম পালন করতে হলে পেশা ত্যাগ করতে হয় — এটি নতুন উপদ্রপ।

জায়রার পোশাক আশাক, চলা ফেরা, কথাবার্তা যতটা দেখেছি এবং শুনেছি, তাকে স্মার্ট এক কিশোরী বলেই মনে হয়েছে। হঠাৎ করে অতুল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে পায়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে কেন সে? কেন সে অভিনয় জগত থেকে নির্বাসন চাইছে? এটি কি তার নিজের ইচ্ছেয়? কোরান সে এমনই মুখস্ত করেছে যে ফেসবুকে লিখতে গিয়ে এক এক করে তার কোরানের আয়াতগুলো মনে পড়ে গেছে? আমার কিন্তু মনে হয় জায়রার লেখাটি একেবারেই জায়রার লেখা নয়। লেখাটি অন্য কেউ লিখে দিয়েছে, এই অন্য কেউটি কোনও কট্টর ইসলামী মৌলবাদি, যে মৌলবাদি যে কোনও মূহুর্তে ইসলামী সন্ত্রাসী বনে যেতে পারে, যে ইসলামের নামে মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করে না। জায়রাকে হয়তো সেভাবেই ভয় দেখিয়ে চলচ্চিত্র জগত থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যেভাবে গানের জগত থেকে প্রাগাস নামে কাশ্মীরী মেয়েদের গানের দলটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিল কয়েক বছর আগে। গ্র্যান্ড মুফতি ফতোয়া দিয়েছিলো মেয়েদের গান গাওয়ার বিরুদ্ধে। মেয়েরা মৃত্যুর হুমকি এত পেয়েছিল যে দল বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল। কাশ্মিরে কিন্তু পুরুষদেরও গানের দল আছে, তাদের বিরুদ্ধে কিন্তু এভাবে ফতোয়া জারি হয় না। কাশ্মীরের পুরুষও চলচ্চিত্রে অভিনয় করছে, তাদের কিন্তু হুমকি দেওয়া হচ্ছে না বা অভিনয় ছাড়তে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে না।

জায়রা আর কোনও ছবির কন্ট্রাক্টে সই না করে অভিনয় জগত থেকে সরে যেতে পারতো, কিন্তু সে যে চুপচাপ সরে না গিয়ে সরবে জানিয়ে গেল যে অভিনয় করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহ অখুশি হন,ইসলামের অবমাননা হয়, এই বিবৃতিটিই ক্ষতিকর, এবং এই বিবৃতিটিই রাজনৈতিক, এর নাম ইসলাম নয়, এর নাম ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’, যে ইসলাম জগত জুড়ে সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে। এই বিবৃতির মাধ্যমে সারা দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম মেয়েদের জানিয়ে দেওয়া হলো, সাবধান, অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিও না, শুধু অভিনয় জগত নয়, গানের জগত, শিল্প সাহিত্যের জগত, ঘরের বাইরের যে কোনও জগতই মেয়েদের জন্য নিষিদ্ধ। স্বনির্ভরতা মেয়েদের জন্য হারাম। মেয়েরা ঘরে বসে কোরান হাদিস পড়বে, নামাজ রোজা করবে, ঘরের বাইরে যদি যেতেই হয় যাবে বোরখা পরে, কোনও পরপুরুষ যেন তাদের শরীরের কোনও অংশ না দেখতে পায়। মেয়েরা ঘরে থাকবে, স্বামীর সহায় সম্পত্তির দেখভাল করবে, স্বামীসেবা করবে, সন্তান উৎপাদন করবে, সন্তানদের পরহেজগার বানাবে — মেয়েদের জন্য এসব ছাড়া আর কোনও কাজের অনুমোদন ইসলাম দেয়নি।

জায়রার মাধ্যমে ইসলামের কঠোর কঠিন নারীবিরোধী নির্দেশ বিশ্বকে আরও একবার জানিয়ে দিয়েছে ইসলামি কট্টরপন্থীরা । সন্ত্রাসী আইসিসরা বিশ্বাস করে — মুসলিম পুরুষের সেবাদাসি আর যৌনদাসি হওয়া ছাড়া মুসলিম নারীদের আর কোনও ভূমিকা থাকতে পারে না। মুসলিম নারী মুসলিম পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এই সম্পত্তির নিজস্ব কোনও জগত এবং জীবন থাকতে নেই। স্বাধীনতা বা অধিকার তাদের জন্য নিষিদ্ধ। জায়রার চিঠির লেখক অথবা লেখকবৃন্দ সেই কথাটিই জানিয়েছে, এবং জায়রাকে অভিনয় জগত থেকে সরিয়ে নিয়ে প্রমাণ করেছে, তারা এখনও শক্তিশালী। চিঠিটি শুধু চিঠি নয়, চিঠিটি মুসলিম নারী-শিল্পীদের জন্য মৃত্যুর হুমকিও।

এ সময় বলিউডের তো বটেই, পুরো দেশের সচেতন মানুষের উচিত ধর্মের নামে প্রতিভাময়ী এক অভিনেত্রীকে বোরখার অন্ধকারে ঠেলে পাঠানোর সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়া্নো। কিন্তু মুশকিল হলো, নারীবিরোধী ইসলামী মৌলবাদিদের বিরুদ্ধে কিছু কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী ছাড়া খুব বেশি কেউ দাঁড়ায় না। কোথায় নারীবাদি, মানবাধিকার সংগ্রামী, কোথায় সচেতন বুদ্ধিজীবি, কোথায় শিল্পী সাহিত্যিক? চুপ কেন সবাই? যদি কেউ মুখ খোলে, বলে, অভিনয় জগত ছাড়ার ইচ্ছে জায়রার নিজের, তার ইচ্ছেকে সম্মান করা উচিত। মাথায় এক ছটাকও বুদ্ধি আছে যাদের, তাদেরই এ কথা বোঝার কথা যে জায়রার চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জায়রার নয়। জায়রা বাধ্য হচ্ছে চলচ্চিত্র জগত ত্যাগ করতে। আমি বাধ্য হয়েছি আমার নিজের দেশ ত্যাগ করতে, আমাকে বাধ্য করা হয়েছে আমার দ্বিতীয় বাসভূমি পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগ করতে। আরও কত মেয়েকে গান ছাড়তে, নাচ ছাড়তে, ছবি আঁকা ছাড়তে, লেখা ছাড়তে, খেলা ছাড়তে, পড়াশুনো ছাড়তে, চাকরি ছাড়তে,ব্যবসা ছাড়তে, ভিন্নমত প্রকাশ করা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। মেয়েদের কোনও স্বপ্ন থাকতে পারে না। মেয়েদের কোনও স্বাধীনতা থাকতে পারে না। তাই জায়রারও কোনও স্বাধীন ইচ্ছে থাকতে পারে না। তার ইচ্ছেকে নিয়ন্ত্রণ করছে ধর্মের রক্ষকেরা। ইসলামের নামে নারীর প্রতিভাকে আর কত কুপিয়ে মারা হবে, প্রতিভার আর কত মৃত্যু আমাদের দেখতে হবে?আমরা যদি আজ জায়রাকে রক্ষা করতে না পারি, আগামী দিনে আমাদের দেখতে হবে আরও প্রতিভাময়ী মুসলিম নারীকে , যারা বাধ্য হবে প্রতিভা বিসর্জন দিয়ে ঘরবন্দি হতে।

ইসলামকে ১০০ ভাগ মেনে চলা মুসলমানদের পক্ষেও সম্ভব নয়। তাই তারা বেছে নিয়েছে কী মানবে, কতটুকু মানবে। যেটুকু মানলে খুব একটা অসুবিধে হয় না, সেটুকুই মানছে। ইসলামে চুরি করলে হাত কাটার কথা বলা হয়েছে। তাই বলে মুসলমানরা কি চুরি করছে না? দুর্নীতিতে ভেসে যাচ্ছে মুসলিম দেশগুলো। চোরদের হাত কাটা হচ্ছে না। বিধর্মীকে মেরে ফেলার কথা বলা হয়েছে ইসলামে। অথচ লক্ষ লক্ষ মুসলমান নিজের দেশ ত্যাগ করে বিধর্মীদের দেশে গিয়ে বাস করছে। বিধর্মীদের করুণায় বেঁচে আছে। বেশির ভাগ মুসলিম শাসক বাণিজ্যের কারণে বিধর্মী শাসকদের সংগে মধুর সম্পর্ক বজায় রাখে। সৌদি আরবের সংগে প্রতিবেশি মুসলিম দেশগুলোর যে সম্পর্ক তার চেয়ে ভালো সম্পর্ক ইউরোপ আমেরিকার অমুসলিম দেশগুলোর সংগে। ইসলাম সত্যিকার মেনে চলছে না পুরুষেরা। কিন্তু মেয়েদের ওপর ইসলাম চাপিয়ে যাচ্ছে, কারণ মেয়েদের ওপর ইসলাম চাপানো সহজ।

যেহেতু সমাজের পুরুষতন্ত্র মেয়েদের কাবু করে রেখেছে বহুকাল, ইসলাম নিজেই যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক, তাই ইসলাম ব্যবহার করে ইতিমধ্যে কাবু হওয়া মেয়েদের আরও কাবু করছে তারা। ইসলামের ভয়াবহতা দেখতে হলে তাই মুসলিম মেয়েদের দেখতে হয়। আমরা দেখি, কত মুসলিম মেয়ে ইসলামকে অস্বীকার করে বাইরে বেরিয়েছে, শিক্ষিত হচ্ছে, আলোকিত হচ্ছে, নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। আমরা দেখিনা কত মেয়ে অন্ধকারে পড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে , প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও মুখ বুজে পড়ে আছে ইসলামী নৃশংসতার শিকার হয়ে।

ইসলামের নিষেধ সত্ত্বেও বাংলাদেশ পাকিস্তান ইরান মিশর জর্ডান লেবানন এরকম কত মুসলিম দেশ চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে। চলচ্চিত্র নির্মাতারা মুসলিম, অভিনেতা অভিনেত্রীরা মুসলিম। চলচ্চিত্রে অভিনয় করার জন্য কারও ধর্ম বিশ্বাসে কোনও সমস্যা হয়নি! জায়রার কেন সমস্যা ? সমস্যা, মনে হচ্ছে জায়রার নয়, সমস্যা জায়রাকে যে বা যারা অভিনয় ছাড়তে বাধ্য করছে, তাদের। অথবা জায়রা যদি ইসলাম দ্বারা মগজধোলাই হয়ে থাকে, তবেও সমস্যা তাদেরই , যারা জায়রাকে মগজধোলাই করেছে । এত বড় শক্তিশালী বলিউড থেকে এত বড় এক সফল জনপ্রিয় অভিনেত্রীকে ধর্মের দোহাই দিয়ে ভ্যানিস করে দেওয়া হবে, আর মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল চুষবে, এ কি মেনে নেওয়া যায়? কিন্তু এর প্রতিবাদ করতে গেলে মুসলিম মৌলবাদিরা ক্ষুব্ধ হবে, তাহলে ‘সেকুলার’ লেবেলটা হারিয়ে যেতে পারে, এদেশি বুদ্ধিজীবিদের ভয়টা সেখানেই। অন্যান্য ধর্মীয় মৌলবাদিদের কীর্তি কলাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে, কেবল মুসলিম মৌলবাদীরা যা কিছুই করুক, কুলুপ এঁটে বসে থাকতে হবে। এই হলো এদেশি সেকুলার এবং উদারপন্থী নামধারীদের নকশা । সংখ্যালঘুদের মধ্যে যতই নারীবিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা , বর্বরতা থাকুক না কেন, যতই অপরাধ তারা করুক না কেন, তাদের ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। হিপোক্রেসিতে যখন বুদ্ধিজীবী সমাজ আক্রান্ত, তখন সত্যিই সমাজের বড় দুরবস্থা। এঁদের হিপোক্রেসির কারণেই মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদীদের আজ ভারতবর্ষে এত জয় জয়কার।

একবিংশ শতাব্দিতে এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এর চেয়ে ভয়াবহ প্রস্থান দৃশ্য আর কী হতে পারে! ইসলামের রিফর্ম ঘটুক, ইসলাম থেকে বর্বরতা অমানবিকতা হিংস্রতা হিংসে ঘৃণা ইত্যাদিকে বিদেয় করে মানবিক এবং উদার করা হোক। অথবা সচেতন মানুষ, বিশেষ করে মেয়েরা, ইসলাম ত্যাগ করুক। ইসলামের কারণে সবচেয়ে বেশি মেয়েরাই তো ভুগছে। এ ছাড়া আমি আর কোনও সমাধান দেখছি না। সরকারের ওপর ভরসা নেই। ফতোয়াবাজ মোল্লাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনও ব্যবস্থা আগেও নেয়নি। এখন নেবে না।