দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী টাঙ্গাইলের নৈঋতা হালদার, বড় হয়ে হতে চায় পররাষ্ট্র সচিব

১:২০ অপরাহ্ণ | রবিবার, জুলাই ৭, ২০১৯ ফিচার

মোল্লা তোফাজ্জল, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি- ইংরেজীতে একটি কথা আছে Morning Shows The Day (সকালই দিনের পরিচয়)। একটি দিন কেমন হবে সেটা সকাল দেখেই অনুমান করা যায়। তদ্রুপ একটি শিক্ষার্থীর ধারাবাহিক ফলাফল, কর্ম ও চিন্তা শক্তির মধ্যে ফুটে উঠে তার ভবিষৎ।

পিতামহ শ্রীযুক্তবাবু হেমেন্দ্রনাথ হালদার তার নাতনির নাম রেখেছেন নৈঋতা (শব্দের অর্থ মহীয়সী নারী)। দাদুর রাখা নামের সম্মান রাখতে বদ্ধকর পরিকর টাঙ্গাইলে পুলিশ লাইনস আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেনীর এই অতি মেধাবী ছাত্রী।

নৈঋতা হালদার এবারের জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৯ এ জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীর (বিদ্যালয়) মর্যাদা ছিনিয়ে এনেছে। শুধু তাই নয় এই প্রতিযোগিতায় সে জাতীয়ভাবে তাৎক্ষণিক অভিনয়ে ২য় এবং লোকনৃত্যে ৩য় স্থান অধিকার করেছে। বিষ্ময়কর বিষয় একবর্ষে জাতীয়ভাবে ৩টি পদে পুরষ্কার পাওয়া দেশের একমাত্র শিক্ষার্থী হলো নৈঋতা হালদার।

বাবা অরিন্দম হালদার ও মাতা চিনো রানী বিশ্বাসের একমাত্র মেয়ে নৈঋতার জন্ম ২০০৫ সালের ৪ মে মির্জাপুরের বহনতলী গ্রামে মামার বাড়িতে। পেত্রিক নিবাস গোপালগঞ্জ শহরে। নৈঋতার বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং মা বঙ্গের আলীগড় খ্যাত সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষিকা।

মায়ের চাকরির সুবাদে নৈঋতার বেড়ে ওঠা টাঙ্গাইলেই। সে ২০১৫ সালে কুর্নি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মির্জাপুর উপজেলায় প্রথমস্থান অধিকার করে এবং ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। এরপর টাঙ্গাইল পুলিশ লাইনস আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্ত হয়।

ধরাবাঁধা কোন নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন একবারেই অপছন্দ নৈঋতার। কিন্তু সময়ের মূল্য অক্ষরে অক্ষরে দিতে অভ্যস্ত। বিদ্যালয়ের পড়া শেষ না করে বসে পরলো ছবি আঁকতে, আবার ছবি আকাঁ শেষ না করেই মগ্ন হয়ে যায় গান-নৃত্যে। বড়ই মন খুশি মেয়ে।

সে প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০১৪ সালে জাতীয়ভাবে অভিনয়ে ১ম, ২০১৫ সালে উপস্থিত বক্তব্যে ২য় এবং আবৃতিতে ২য় স্থান লাভ করে। এছাড়া ২০১৮ সালে শাপলা কাপ অ্যাওয়ার্ড এবং তাৎক্ষণিক অভিনয়ে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পায়।

এদিয়ে নৈঋতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে ৪ বার করে পুরষ্কার গ্রহণ করেছে। ২০১৯ সালের সৃজনশীল মেধা অন্বেশন প্রতিযোগিতায় ভাষা ও সাহিত্যে টাঙ্গাইল জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করে। এছাড়া জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পেয়েছে অসংখ্য পদক-পুরষ্কার।

এই বয়সে বাংলা ইংরেজীর পাশাপাশি সে বুঝতে পারে আরো কয়েকটি ভাষা। কার্টুন দেখে শিখেছে হিন্দি, উর্দু আর জাপানী। বই পড়ে কিছুটা কোরিয়ান ভাষাও বলতে পারে। অবসরে কবিতা গল্প লিখতে পছন্দ। ২০১৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে নৈঋতার লেখা ময়না আমার বাবুই সোনা নামের একটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। টাঙ্গাইলের জেলা শিল্পকলা একাডেমী, সিডিসি ক্লাব এবং জেলা শিশু নাট্য দলের তত্ত্বাবধায়নে নিয়মিত গান, নাচ ও অভিনয় চর্চা করে থাকে। খাবারের প্রতি নেই তেমনটা আগ্রহ, প্রিয় রং ধূসর। ভোরে ঘুম থেকে উঠা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

টাঙ্গাইলের পুলিশস লাইনস আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দুল কাদের বলেন, নৈঋতার মতো অল সাইডে এতো মেধাবী শিক্ষার্থী আমাদের স্কুলে কখনও আসেনি। আমার জানামতে এতাগুলো জাতীয় পুরষ্কার পাওয়া দেশের একমাত্র ছাত্রী ওই। আমার বিশ্বাস মেধা ও কর্ম দ্বারা একদিন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে নৈঋতার সুনাম সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হবে। জাতীয় প্রতিযোগিতায় ১১ টি বিষয়ে যাচাই বাছাই শেষে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী নির্বাচিত করা হয়। আমরা ওর জন্য গর্বিত।

টাঙ্গাইল জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা খানম বলেন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, নৈঋতা ও ওর মায়ের সার্বিক প্রচেষ্টার ফলে এই শ্রেষ্ঠত্ব এসেছে। অর্জন ধরে রেখে আগামীতে আরো ভাল করবে এবং একজন ভাল মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে এই প্রত্যাশা করি।

নৈঋতার গর্বিত মা চিনো রানী বিশ্বাস আবেগময় কন্ঠে বলেন, ওর চিন্তা-ভাবনা সব সময় প্রগতিশীল এবং ছোটবেলায় থেকেই একটু বেশি পরিপক্ক মানসিকতার। একজন মা সন্তানের সাফল্যেই প্রকৃত সুখ পান। আমি চাকরি সংসার সেরে ওর জন্য অনেক কষ্ট করি। দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হওয়ায় আমি মহা আনন্দিত। আমি অবাক হই নৈঋতা যখন টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে জমা রাখে ওর স্বপ্নের বৃদ্ধাশ্রম ও এতিমখানার জন্যে। ও যেন একজন ভাল মানুষ হয়ে দেশ ও দশের সেবা করতে পারে তার জন্য সকলের আশির্বাদ চাই।

দেশশেরা ছাত্রী নৈঋতা হালদার বলে, এই প্রাপ্তিতে আমি খুবই খুশি। আর এই প্রাপ্তির কৃতিত্ব আমার মা। যিনি আমাকে বন্ধুর মতো সব কিছুতেই আগলে রাখেন। নিজের স্বপ্ন নিয়ে নৈঋতা দৃঢ় কন্ঠে বলে আমি বড় হয়ে পররাষ্ট্র সচিব হতে চাই। কারণ আমার প্রিয় বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। বিশ্বের সাথে আমাদের কুটনৈতিক সম্পর্ক যত শক্তিশালী এবং পারস্পারিক বিনিময় তরান্বিত হবে এদেশ ততই উন্নত হবে। আমি সেই কাজে অংশ নিতে চাই। আর আমি একই ক্যাম্পাসে বৃদ্ধাশ্রম ও এতিমখানা বানাবো। যাতে অসহায় মানুষ নিজেদের একাকিত্ব ভুলে হাসিভরে নিঃশ্বাস নিতে পারেন।

অন্য ছাত্রছাত্রীদের উদেশ্যে নৈঋতা বলে, আমি কখনও সময় অপচয় করি না। প্রকৃতিকে ভালোবাসি প্রকৃতিকে নিয়ে লিখি। এতে মন উদার হয়।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম বলেন, দেশের অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের পেছনে ফেলে টাঙ্গাইলের মেয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হওয়ায় অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। এ অর্জন পুরো টাঙ্গাইলবাসীর। এ সাফল্যে টাঙ্গাইলের অন্য ছাত্রছাত্রীরা অনুপ্রাণিত হবে এবং আমরা নৈঋতা হালদারকে আরো উৎসাহ দিবো।