জামালপুরে ফসলী জমিসহ বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলিন, হুমকির মুখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

৩:৫৩ অপরাহ্ণ | সোমবার, জুলাই ৮, ২০১৯ দেশের খবর, ময়মনসিংহ

আবদুল লতিফ লায়ন, জামালপুর প্রতিনিধি- জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানী ইউনিয়নে যমুনা নদীর পূর্বপাড়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে ওই ইউনিয়নের বড়খাল গ্রামের ৪৫টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন এবং খোলাবাড়ী গুচ্ছগ্রামের প্রায় ৩০টি পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদ, একটি নৌ-থানাসহ বিস্তীর্ণ জনবসতি ও আবাদি জমি।

সোমবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, যমুনা নদীর পূর্বপাড়ের চিকাজানী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বড়খাল গ্রাম থেকে চরডাকাতিয়া ও খোলাবাড়ী গ্রাম পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলতি বর্ষার শুরুতেই ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এক সপ্তাহের ভাঙনে বড়খাল গ্রামের বড়খালের ৪০টি পরিবারের মধ্যে ৩০টি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিলেও তাদের ফসলী জমিজমা যমুনা নদীতে তলিয়ে গেছে। সেখানে ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে আরও পাঁচটি পরিবার। খোলাবাড়ী গুচ্ছগ্রাম এলাকায় গত বছর থেকে ভাঙন দেখা দেয়।

এবার সেখানে ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙন কবলিত গুচ্ছগ্রামের ১১০টি দরিদ্র পরিবারের মধ্যে অন্তত: ৩০টি পরিবার গুচ্ছগ্রাম থেকে সরে গিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন বাঁধ, রাস্তা ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। চিকাজানী ইউনিয়নের চর খোলাবাড়ী এলাকাতেও তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই নদীপাড়ের আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে জনবসতি এলাকা ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।

ভাঙনের তীব্রতায় চর খোলাবাড়ী বাজার, বাজার সংলগ্ন প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন পুলিশ বিভাগের নৌ-থানা, খোলাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রসা, মসজিদসহ বিস্তীর্ণ জনবসতি এলাকা হুমকিতে রয়েছে। যমুনার ভাঙনে বেশ কিছু পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্থানীয় প্রশাসন থেকে তারা কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

বড়খাল গ্রামের নদী ভাঙনের শিকার মজনু মিয়া (৩২) মাছ ধরে স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান নিয়ে সংসার। ঘরবাড়ি সরিয়ে নতুন করে ঘর নির্মাণ করছেন। তিনি বললেন, ‘নদীয়ে ঘরদিয়ার ভাইঙ্গা নিয়া যায়। এক সপ্তাহের মধ্যে মেলা ঘর, জমিজমা নদীতে গেছেগা। আমগরে কত সমস্যা। এইহানে পাইলিং করা দরকার। না করলে ভাঙতেই থাকবো। এই এলাকার মাইনষের মেলা কষ্ট। সরকার তনেও আমরা কোনো সায্য পাইতাছি না।’

স্থানীয় গৃহিনী আখি নূর (৩২) বললেন, ‘সুমানে ভাঙবের নাগছে। আমগরে ঘরও সরান নাগবো। নদী আইয়া পড়তাছে পরাই। আমরা কই যামু। সরকার তো কিছুই করতাছে না। সরকার ব্যবস্থা না নিলে পরে পুরা এলাকাই নদীত যাবো গা। আমরা এই গেরামের সবাই মেলা ভয়ে ভয়ে থাহি।’

খোলাবাড়ী গুচ্ছগ্রামের বিধবা সাহারা খাতুন জানান. ‘বাবা আমাগো আর ঠাই নাই, একদিনেই সাহার আলীর দুইটা ঘর, নবী হোসেনের দুইটা ঘর, কুহিল উদ্দিনের দুইটা ঘর, মামুনের দুইটা ঘর যমুনার পেটে গেছে। আমরা এহন কই যামু। যাবার কোন জায়গা নাই’।

চিকাজানী ইউপি চেয়ারম্যান মো. মমতাজ উদ্দিন আহাম্মেদ জানান. ‘আমাদের এদিকে নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কোনো কাজ হয় নাই। ফলে যমুনা নদী এ ইউনিয়নের জনবসতি এলাকায় ঢুকে পড়ছে। ইউনিয়নের ৩৫ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত:পক্ষে ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ নদীভাঙনের আতঙ্কে রয়েছেন। এবারের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তরা এখনও পর্যন্ত সরকারি কোনো সাহায্য সহযোগিতা পায় নাই। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করছি।’

উপজেলা চেয়ারম্যান সোলায়মান হোসেন জানান, নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য পরিকল্পনা মন্ত্রনালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে কথাবলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী নব কুমার চৌধুরী জানান, ‘চিকাজানী ইউনিয়নে যমুনা নদীর পূর্বপাড়ের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে বড়খাল গ্রামে প্রায় ১৫ মিটার একেবারেই ভেঙে গেছে। সেখানে বালির বস্তার ডাম্পিং করেও কোনো লাভ হবে না। স্থানীয় পোল্লাকান্দি সেতু থেকে সরিষাবাড়ী পর্যন্ত যমুনার পূর্বপাড় দিয়ে নতুন করে ৮০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। সেই প্রকল্পের মধ্যে চিকাজানি ও বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইতিমধ্যে এখানকার চার কিলোমিটার নদীপাড় জরিপ করা হয়েছে।’

Loading...