মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ)-এ আলোকিত শাহজাদপুর !

৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, জুলাই ১২, ২০১৯ রাজশাহী

রাজিব আহমেদ, শাহজাদপুর প্রতিনিধিঃ সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরের করতোয়া নদীর তীরে স্ব-মহিমায় এখনও দাঁড়িয়ে আছে মুসলিম স্থাপত্যের দৃষ্টিনন্দন মখদুমিয়া জামে মসজিদ ও মাজারের স্থাপনা। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে মাজার প্রাঙ্গণ। আগত পর্যটকরাও ইসলামি প্রত্নতত্ত্ব পরিদর্শন করে আত্মতৃপ্তি নিয়ে ফিরে যান।

ধর্মীয় সংস্কৃতি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা আসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) এর মসজিদ ও মাজারে। শুধু মুসলমানই না অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রদর্শনের জন্য এখানে আসে। শাহজাদপুরে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্যেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। অনেকেই মনে করেন হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) এই ভূমিতে এসেছেন এবং এখানেই চির নিদ্রায় শায়িত আছেন বলেই মহান আল্লাহ তাআলার বরকত শাহজাদপুরের জন্য একটু বেশিই প্রবাহিত।

অনেক মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে মানত পূরণের আশায় এখানে এসে সিন্নি করে বিতরণ করে। যেনো আল্লাহ্ তাআলা তাদের বিশ্বাস ও ভক্তিতে খুশি হয়ে তাদের মনোবাসনা পূরণ করেন ও সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করেন। এই বিতরণকৃত সিন্নির স্বাদ গ্রহণের জন্যেও এখানে আসেন।

হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) এর মসজিদ ও মাজার সম্পর্কে মূল ফটকের সামনে কিছু ইতিবৃত্ত দেওয়া আছে। যেখানে এই মসজিদ ও মাজার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়।

শাহজাদপুর উপজেলার নামকরণ হয়েছে ইয়ামেন দেশের শাহাজাদা হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) এর নামানুসারে। বিভিন্ন কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, একবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে শাহী আমলে এই সজিদটি নির্মীত হয়। জানা যায়, ১১৯৩-১১৯৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে কোন এক সময় তৎকালীন ইয়ামেন দেশের শাসক হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর বিশ্বস্ত সাহাবী হযরত মোয়াজ- ইবনে জবল (রঃ) এর বংশধর হযরত মখদুম শাহদৌলা ইসলাম প্রচারের জন্য যাত্রা করে বোখারা শহরে আগমন করেন।

বোখারা শহরে হযরত জালাল উদ্দিন বোখারী দরবার শরীফে তা সাথে কিছু সময় অতিবাহিত করে বাংলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে এই অঞ্চলে আগমন করেন। আগমনের পূর্বে জালাল উদ্দিন বোখারী শাহ মখদুম (রঃ) কে পথ প্রদর্শনের জন্য এক জোড়া কবুতর উপহার দেন যাহা জালালী কবুতর নামে পরিচিত।

বাংলায় পদার্পণ করে ইসলাম প্রচার শুরু করলে তৎকালীন সুবা বিহারের অমুসলিম অধিপতি “রাজা বিক্রম কেশরী” মখদুম শাহদৌলার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে। কিন্তু সৈন্যবাহিনী যুদ্ধে পরাস্ত হয় ফিরে যায়। রাজা বিক্রম কেশরী পরপর কয়েকবার সৈন্য প্রেরণ করে পরাজিত হয়। ইতিমধ্যে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) শাহজাদপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় ইসলাম প্রচার করেন। তার আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা এই অঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করেন।

শেষ যুদ্ধে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) এবং তার বহু যোদ্ধা ও সঙ্গী শহীদ হন, এই যুদ্ধে শহীদ হওয়ার কারণে তিনি হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) নামে পরিচিতি পান। কথিত আছে যে, পূর্ববর্তী যুদ্ধে বন্দী সৈন্যদের একজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেন এবং তার নৈকট্য লাভ করেন। শেষ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আছরের নামাজ আদায়ের সময় সেজদাহরত অবস্থায় হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) এর দেহ থেকে মাথা দ্বিখন্ডত করে সবা-এ-বিহারের রাজধানী মঙ্গলকোট মতান্তরে মহলকোটে নিয়ে হাজির হয়।

পর্দা সরিয়ে দেখা যায় যে অলৌকিকভাবে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) এর উষ্ঠাধর হতে সুবহানা-রাব্বিয়াল-আলা ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে রাজা বিক্রম কেশরী ভয়ে সন্ত্রস্ত হয় এবং তার প্রধান সেনাপতি ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। পরে রাজা স্থানীয় মুসলমানদের ডেকে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) এর মস্তক সমাহিত করতে বলে, মস্তক সমাহিত করার স্থানটিকে আজও ছের-এ মোকাম বলা হয়। তার দেহ মোবারক মসজিদের দশরশি দক্ষিণে সমাহিত করা হয়।

পরবর্তী হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) বিশ্বস্ত সঙ্গী হযরত ইউসুফ শাহ (রঃ) এতদ্ব অঞ্চলের শাসনকর্তা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। এখানে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) ছাড়াও তার ভাগ্নে হযরত খাজানুর (রঃ), তার সঙ্গী ইউসুফ শাহ (রঃ) এবং হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রঃ) এর ওস্তাদ হযরত শাহ শামসুদ্দিন তাবরেজী (রঃ) এর মাজার অবস্থিত। এই মসজিদের পূর্ব দক্ষিণ পাশে কিছু দুরে করতোয়া নদীর অপর প্রান্তে তার আরো একজন সঙ্গী হযরত শাহ হাবিবুল্লাহ (রঃ) এর মাজার অবস্থিত যা বাদলবাড়ি নামে পরিচিত। এছাড়াও মসজিদের পাশে আরো অগণিত শহীদের গণকবর রয়েছে।