সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ৩০শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আঙ্কেল থেকে যেভাবে বিবাহিত বিদিশার প্রেমিক এরশাদ

৩:২৩ অপরাহ্ণ | সোমবার, জুলাই ১৫, ২০১৯ তথ্য জাদুঘর, ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ- বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অদ্ভুত রহস্যময় চরিত্র, অনেকক্ষেত্রে ঘৃণিতও। রাজনীতির মতো সিরিয়াস একটি ফিল্ডে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে এত হাস্যরসাত্মক কৌতুকের সৃষ্টি এর আগে বাংলাদেশে কখনো হয়েছে বলে জানা নেই। এরশাদ মানেই যেন হাসির পাত্র! অথচ তাঁর ছিল দীর্ঘ এক বর্ণাঢ্য জীবন।

সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত…রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো অলঙ্কিত না কলঙ্কিত করেছিলেন এরশাদ, সেসব বিচার-বিশ্লেষণ হয়তো তাঁর মৃত্যুর পর খুব নগণ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

তবে ব্যক্তিজীবনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন ভীষণ রোমাঞ্চপ্রিয়। রাজনীতির মতো তার ব্যক্তিজীবনও ছিল রহস্যময়। সামরিক শাসনকালে তো বটেই, এর পরও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিক প্রেম ও বিয়ের খবর শোনা গেছে। বিশেষ করে ক্ষমতায় থাকাকালে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে তার সম্পর্কও ছিল আলোচনায়। এ নিয়ে এরশাদের ভাষ্য ছিল, তিনি নারীদের কাছে যান না; নারীরাই তার কাছে আসেন।

এরশাদ চারজনকে বিয়ে করেছিলেন বলে বিভিন্ন সময় জানা গেলেও জীবনকালে তার দুটি বিয়ে প্রকাশ্যে এসেছে। প্রথম স্ত্রীর নাম রওশন এরশাদ এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম বিদিশা এরশাদ। এরশাদের সাথে বিদিশা ইসলামের প্রথম দেখা হয় ১৯৯৮ সালের ১৪ জুলাই। সেদিন ছিল ফ্রান্সের জাতীয় দিবস। ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের বাসায় ডিনার পার্টিতে গিয়েছিলেন বিদিশা। এরশাদের সাথে সে সময় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত র‌্যানে পরিচয় করিয়ে দেন বিদিশাকে। সেটাই ছিল তাদের প্রথম দেখা ও পরিচয়।

বিদিশার সঙ্গে এরশাদের দ্বিতীয়বার দেখা হয় ঢাকার ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূতের বাড়ির ডিনারে। সেদিন এরশাদ নিজেই ফোন নম্বর চেয়ে নেন। তারপর এরশাদ প্রতিদিন ভোরে ফোন করতেন বিদিশাকে। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সাথে বিদিশার যখন পরিচয় হয়, তখন বিদিশা ছিলেন বিবাহিতা। তার স্বামী ছিল। সন্তানও ছিলো। তবে সেটা থাকলেও এরশাদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হয়। এক পর্যায়ে প্রথম স্বামী পিটার উইসনের সাথে বিচ্ছেদও ঘটে। তারপর গোপনে এরশাদের সাথে বিদিশার বিয়ে হয় লন্ডনে।

নিজের বিয়ের বিষয়ে বিদিশা এরশাদ তার আলোচিত বই ‘শত্রুর সাথে বসবাস’ এ লিখেছেন, ‘আমার স্বামী ভাগ্যটা এমনই যে, দু’বার বিয়ে করেছি। কিন্তু যে দু’বারই এমন ব্যক্তিকে বিয়ে করেছি, যাকে শুরুতে আঙ্কেল ডেকেছি। বিষয়গুলো এখন চিন্তা করতে বিস্ময়কর লাগলেও তখন কিন্তু সে রকম কিছু মনে হয়নি।’ প্রথম স্বামী পিটার উইসনের সঙ্গে বিদিশার বয়সের পার্থক্য ছিল ১৪ বছর। পিটারের বয়স ২৮। আর বিদিশার বয়স ছিল তখন ১৪ বছর।

বিদিশার সাথে এরশাদের পরিচয়ের পর এরশাদ নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলেই পরিচয় দিতেন। যদিও তিনি ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট। সে কারণেই পরিচয়ের প্রথম দিনেই বিদিশা সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট পরিচয় দেন কেন? আপনিতো আর প্রেসিডেন্ট নন। তবে এরশাদ বলেছিলেন, ‘ওয়ান্স এ প্রেসিডেন্ট অলওয়েজ প্রেসিডেন্ট’।

বিদিশা তার বইয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের শারীরিক বর্ণনাও দিয়েছেন, ‘লম্বা একহারা গড়নের বয়স্ক লোক। কত হবে বয়স? ৫০-ও হতে পারে। আবার ৭০-ও হতে পারে। তবে প্রথম দর্শনেই মনে হলো নিজেকে নিয়ে খুবই সচেতন তিনি। এই সচেতনতা নিজের শরীর নিয়ে যেমন, তেমনি পোশাক নিয়েও। বেশ দামি পোশাক, জুতা, ঘড়ি ছিল তার পরনে।’

বিদিশা এরশাদের বিষয়ে লিখেছেন, ‘উনি মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতেন। প্রশংসা করতেন আমার পোশাকের। আমার রুচির। আমার বুদ্ধিমত্তার। আমার খুশি দেখে বিরক্ত হতো আমার বন্ধুরা। এরশাদের কথার মধ্যে, শব্দ চয়নে, শব্দ উচ্চারণে, প্রসঙ্গ নির্বাচনে এক ধরনের আভিজাত্যের ছাপ থাকতো। শুনতে আমার ভালো লাগতো।’

বিদিশার একটি ফ্যাশন হাউজ ছিল। সেটি ছিল গুলশানে। তার নাম ইজবেল হাউস। সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ এক সকালে ইজবেল ফ্যাশন হাউসে মিষ্টি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। এরশাদের বিষয়ে বিদিশা লিখেছেন, ‘আমার জীবনে নতুন পুরুষ। একজন সংবেদনশীল মানুষ। বৃদ্ধ কিন্তু সক্ষম। জীবনে প্রথম ভালোবাসা পেলাম। এক সময় মনে হলো -আই অ্যাম ইন লাভ উইথ এরশাদ। আমি এরশাদের প্রেমে পড়ে গেছি।’

বিদিশার সাথে এরশাদের প্রথমে বিয়ে হয় লন্ডনে। তবে সে বিয়ের কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। পরে ২০০২ সালের ২৭ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এরশাদ-বিদিশার বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় বিচ্ছেদও হয়। এমনকি এরশাদ বিদিশার বিরুদ্ধে চুরির মামলাও দিয়েছিলেন। তবে এরশাদের মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্তও বিদিশা তাকে ভুলতে পারেননি। বিদিশা তার প্রাক্তন স্বামীকে নিয়ে মন্তব্য করেছেন,‘এরশাদই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রেমিক।’

প্রসঙ্গত, দেড় দশক আগে বিদিশার সঙ্গে এরশাদের বিয়ে ছিল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ঘটনা। এরশাদ-বিদিশা দম্পতির একমাত্র ছেলে শাহতা জারাব (এরিক এরশাদ)। পরবর্তীতে, ২০০৫ সালে বিচ্ছেদের পর এরিককে নিয়ে এরশাদ ও বিদিশার লড়াই আদালত পর্যন্ত গড়ায়। পরে আদালতের আদেশে এরিকের দায়িত্ব পান এরশাদ। এরশাদের ঘনিষ্ঠ একজন বলেন, জীবন সায়াহ্নে সাবেক সেনাশাসকের ভাবনা ছিল শুধু এরিককে নিয়ে।

বিদিশার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রওশনই ছিলেন এরশাদের স্ত্রী। তবে দীর্ঘদিন ধরে (জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত) দুজন দুই বাসায় থাকতেন। একান্ত প্রয়োজন বা রাজনৈতিক যোগাযোগ ছাড়া তাদের মধ্যে তেমন কোনো আলাপচারিতা ছিল না। এমনকি মৃত্যুর আগে এরশাদ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতাল ও বাড়িতে থাকলেও রওশন তাকে দেখতে যাননি। অবস্থা সংকটাপন্ন হলে মৃত্যুর আগে তিন দিন এরশাদকে দেখতে হাসপাতালে যান রওশন।