এরশাদের দাফন নিয়েও চলছে নাটকীয়তা!

১২:২৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, জুলাই ১৬, ২০১৯ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- বর্ণময় চরিত্রের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতির আলোচিত-সমালোচিত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দাফন নিয়েও চলছে নাটকীয়তা। রাজনীতির রীতিনীতি ছুঁয়েছে মৃত্যুকেও। আর তাইতো এরশাদের একটি অধ্যায়ের শেষ হলেও, নিস্তার নেই টানাটানি থেকে। বিতর্ক চলছে কোথায় হবে দাফন, আর কিইবা তার এপিটাফ।

পরিবারের চাওয়া ঢাকার সামরিক কবরস্থান, আর রংপুর জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের দাবি, নিজভূমিতে হতে হবে এরশাদের দাফন। রংপুরে দাফনের দাবিতে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা দিয়ে রেখেছেন আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও।

এদিকে প্রিয় নেতার লাশ জীবন দিয়ে হলেও রংপুর থেকে ঢাকায় আনা ঠেকানো হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন উত্তরবঙ্গ জাতীয় পার্টি (রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ)। রংপুর নগরীর পল্লী নিবাসে খোঁড়া হয়েছে কবরও।

ইতিমধ্যে চতুর্থ জানাজা ও এলাকাবাসীকে একনজর দেখাতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আজ রংপুরে নেওয়া হয়েছে। তার মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টারটি ১১টা ৫০ মিনিটে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে অবতরণ করেছে। এরইমধ্যে এরশাদের জানাজায় অংশ নিতে তার ভক্ত, সমর্থক, নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেছেন ঈদগাহ মাঠে।

মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) সকাল ৯টা থেকে জানাজা মাঠে আসতে শুরু করেন তারা। নেতাকর্মীরা জানান, রংপুরের পাশের জেলাগুলো থেকে একযোগে বাস, ট্রাক ও মাইক্রোবাসে করে রওয়ানা হয়েছেন অনেকে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে এরশাদকে দেখতে আসা মানুষ বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে উপস্থিত হয়েছেন।

মাঠের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা যায়, ঈদগাহের ইমামের জায়গার সামনে এরশাদের মরদেহ রাখার জন্য একটি টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। টেবিলের পশ্চিম পাশের একটি গলির মতো করা হয়েছে। এই গলির একদিকে প্রবেশ করে মরদেহ একনজর দেখে আরেক দিক দিয়ে বের হয়ে যাবেন সাধারণ মানুষ।

জাতীয় পার্টির নেতা আসিফুর রহমান বলেন, গতকাল রাতভর ঢাকায় বৈঠক হয়েছে। সেই বৈঠকে মরদেহ দাফনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কোথায় দাফন করা হবে তা নিয়ে আজও বৈঠক চলছে।

তিনি বলেন, গতকাল পল্লী নিবাসের লিচু বাগানে যখন কবর খোঁড়া হচ্ছিল তখন মেয়র মোস্তফাকে ফোন করেন মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি ফোনে বলেন, কার অর্ডারে কবর খোঁড়া হচ্ছে, তখন মেয়র উত্তরে বলেন, রংপুরের জনগনের সেন্টিমেন্ট তো আপনি বোঝেন। অতএব সেই বিষয়টা ভালো করে ভাবেন।

এদিকে মঙ্গলবারও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, এরশাদকে রংপুরে মাটি না দেওয়ার সিদ্ধান্তকারীদের আজীবনের জন্য বয়কট করা হোক। কোনোভাবেই আজ এরশাদের মরদেহ নিয়ে যেতে দেওয়া হবে না।

যদিও এরশাদের মরদেহ সমাহিত করার কথা রয়েছে ঢাকার বনানী সামরিক কবরস্থানে। এজন্য সেখানেও একটি কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে নেতাকর্মীদের যেকোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জানাজা স্থল ও তার আশেপাশের সব জায়গাতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

উল্লেখ্য, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র স্বৈরশাসক যিনি ক্ষমতা থেকে প্রবল জনরোষের মুখে বিদায় নিলেও আবার মানুষের ভোটেই সংসদে এসেছেন বারংবার। তাকে বহু মানুষ ঘৃণা করেন তার স্বৈরাচারী শাসনের জন্য, অনেকে ঈর্ষা করেন তার নারী প্রীতির জন্য, অনেকে আবার গালিগালাজ করে তার রাজনৈতিক চতুরতার জন্য।

ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে কারো কাছে তিনি ছিলেন হাস্যরসের পাত্র, কারো কাছে সুবিধাবাদী রাজনীতিক, আবার কারোর কাছে ‘পল্লীবন্ধু’। ১৯৯০ এর গণআন্দোলনের সময় এরশাদকে নিয়েই ‘বিশ্ব বেহায়া’ শিরোনামে বিখ্যাত চিত্রকর্মটি এঁকেছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান।

এরকম নানা অভিধায় মানুষ তাকে মনে রেখেছে। নয় বছর দেশ চালিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি প্রায় ছয় বছর জেলে থাকেন এবং জেলে থেকেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচটি আসনে দাঁড়িয়ে পাঁচটিতেই জিতে প্রমাণ করেন যে তিনি উত্তরবঙ্গের একচ্ছত্র আধিপত্যবাদী নেতা।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মানে মোহাম্মদ এরশাদ হোসেন ১৯৩০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন কুচবিহার জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মোহাম্মদ মকবুল হোসেন। ভারতভাগের পর কোচবিহারের দিনহাটা থেকে মোহাম্মদ মকবুল হোসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রংপুর শহরের সেনপাড়ায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মোহাম্মদ এরশাদ হোসেন পরে তার সেনা বিভাগের কমিশন লাভের সময় নাম পরিবর্তন করে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ করেন।

Loading...